অর্থনৈতিক নীতি | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

অর্থনৈতিক নীতি | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি,  মদিনায় হিজরত করার বিষয়টি নবি করিমের (সা) জন্য শুধু একটি নতুন ভৌগোলিক স্থানে বসতি স্থাপন নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনা, যেখানে সবকিছুই নতুন ও আলাদা। নবিজি (সা) সেখানে বেশ কয়েকটি নতুন নীতিমালার প্রচলন করেন, যা তাঁর পক্ষে মক্কায় বাস্তবায়ন করা অসম্ভব ছিল। এই পর্বে আমরা এরকম তিনটি নীতিমালা নিয়ে আলোচনা করব:

 

অর্থনৈতিক নীতি | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

অর্থনৈতিক নীতি | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

অর্থনৈতিক নীতি

মক্কায় নবিজি (সা) ও মুসলিমরা ছিলেন সংখ্যালঘু। তাঁদের একটি স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি থাকার সুযোগ ছিল না। কিন্তু মদিনায় তাঁরা এখন সার্বভৌম, স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত। নবিজি (সা) মদিনায় প্রথম যে কাজগুলো করেন তার একটি ছিল সেখানকার ‘সুক’ (বাজার বা ব্যবসা-বাণিজ্যের স্থান) পরিদর্শন করা। সেই সময়ে মদিনার আরবরা মূলত চাষাবাদের কাজ করত। ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে মূলত জড়িত ছিল ইহুদিরা। তাদের বেশিরভাগ হাটবাজার ছিল শহরের বাইরে, তাদের শিবিরগুলোর আশেপাশে। আরবদের ব্যবসার প্রয়োজন হলে ইহুদিদের কাছে যেত।

সুনান ইবনে মাজাহর বর্ণনা অনুসারে, নবিজি (সা) ইহুদিদের বাজার পরিদর্শনে গিয়ে ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার চর্চা দেখতে পান। তিনি মুসলিমদের বলেন, “এই বাজার তোমাদের উপযোগী নয়।” তিনি ফিরে গিয়ে মসজিদুন নববির পশ্চিম দিকে নিজের পা দিয়ে বালিতে একটি সীমারেখা টেনে বলেন, “এখন থেকে এটিই তোমাদের বাজার। এটি চালু থাকবে। এখানে কেউ যেন কাউকে করের বোঝা চাপিয়ে না দেয়।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

নবিজি (সা) বাজারের জন্য দৃটি সহজ নিয়ম চালু করেন:

১. সমস্ত ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বাজার হিসেবে এই নির্ধারিত সীমানার মধ্যেই করতে হবে (উদাহরণস্বরূপ, কেউ পণ্য বেচাকেনা বাড়িঘরের ভেতর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারবে না);

২. এখানে বেচাকেনা করার জন্য কাউকে কোনো কর কিংবা অতিরিক্ত খরচ দিতে হবে না।

অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য মহানবির (সা) প্রবর্তিত নীতিমালা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা । এ কথা মোটেও সত্য নয় যে, ইসলাম পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সমর্থন করে। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে আমরা পৃথিবীতে তিনটি প্রধান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেখতে পাই: সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ এবং পুঁজিবাদ। যদি তুলনা করতেই হয় তাহলে নিঃসন্দেহে বলতে হবে যে, ইসলামি ব্যবস্থা পুঁজিবাদের কাছাকাছি। তবে এ দুয়ের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। সত্যিকার অর্থে এটি একটি স্বতন্ত্র ব্যবস্থা।

নবিজি (সা) সম্পূর্ণ নতুন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সূচনা করেছিলেন যা সেই সময়ে ছিল নজিরবিহীন। এ বিষয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে। যদিও সিরাহের এই বর্ণনায় অর্থনীতির ওপর বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ নেই, তবু কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করতে হয়। নবিজি (সা) ‘রিবা’ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছিলেন। এ ছাড়া, তিনি কেনাবেচা বা ব্যবসা-বাণিজ্যকে ধার্মিকতা ও আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তিনি সততার প্রশংসা করেছিলেন এবং অসততার সমালোচনা করেছিলেন। তিনি প্রতারণা, মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা শপথ করা এবং (ব্যবসায়িক পণ্যের) ত্রুটি গোপন করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ন্যায়পরায়ণ ব্যবসায়ীকে কেয়ামতের দিন পুরষ্কৃত করা হবে।”

 

অর্থনৈতিক নীতি | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

নীতি-নৈতিকতাবর্জিত মানুষ যা খুশি তা-ই করতে পারে। শুধু বিবেকবোধই পারে তাকে ক্ষমতা ও সম্পদের অপব্যবহার করা থেকে বিরত রাখতে। নবিজি (সা) ব্যবসার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট আচরণবিধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বাজারের ওপর নজরদারি করতেন। সহিহ বুখারির একটি বিখ্যাত হাদিস অনুসারে, তিনি একবার এক খেজুর বিক্রেতাকে দেখতে পেলেন যে তার ব্যাগের উপরের অংশে ভালো মানের খেজুর আর নিচের অংশে পচা খেজুর রেখে দিয়েছিল। এ দেখে নবিজি (সা) তাকে বললেন, “যারা প্রতারণা করে এবং মিথ্যা বলে তারা আমাদের (মুসলিমদের) কেউ নয়।”

এ ছাড়া নবিজি (সা) মদিনায় বসবাসকারী মুসলিমদের কোনো বেদুইনের ‘এজেন্ট’ বা ক্রয়বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে নিষেধ করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, বেদুইনরা বাজারে গিয়ে নিজেরাই কেনাবেচা করুক। কারণ, শহরের অভ্যন্তরে বসবাসকারী এজেন্টদের পক্ষে চালাকি করে পণ্যের দাম উঠানামা করানো খুবই সহজ। নবিজি (সা) ভালো করেই জানতেন, এই মধ্যস্বত্বভোগীরা সব সময় মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নেয়।

আধুনিক অর্থনীতিতে ব্যবসার লাভের একটি বড় অংশ এমন কিছু লোকের হাতে যায় যারা তেমন কোনো কাজ করে না, কিন্তু তারা স্বভাবে চালাক-চতুর । সুতরাং নবিজি (সা) ব্যবসার ক্ষেত্রে কোনোরকম চতুরতা করতে নিষেধ করেছিলেন।

ইহুদিদের বাজারের পাশাপাশি অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও মুসলিমদের নিজস্ব বাজারও দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। পরবর্তী সময়ে ইহুদি উপজাতিগুলো মদিনা থেকে একে একে বিতাড়িত হওয়ার ফলে তাদের বাজারগুলো বন্ধ হয়ে যায়; কিন্তু তাতে মুসলিমদের অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি, কারণ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তখন সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment