আদ্দাসের সাথে কথোপকথন | তায়েফের ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আদ্দাসের সাথে কথোপকথন | তায়েফের ঘটনা, নবিজি (সা) যখন একটি প্রাচীরের পাশে গাছের নিচে বসে দোয়াটি করছিলেন। তখন সেই বাগানের মালিকষয়, উত্তরা ও শায়বা নামের তারই দূর সম্পর্কের দুই চাচা, ঘটনাটি দূর থেকে দেখছিল। তারা আগেই লক্ষ করেছিল কীভাবে নবিজিকে (সা) তায়েফের লোকেরা পাথর ছুড়ে শহর থেকে বের করে দিয়েছে। তারা নবিজিকে (সা) এই দুরবস্থায় দেখতে পেয়ে তাঁর প্রতি এক ধরনের করুণা অনুভব করল। সেই সঙ্গে তাদের মধ্যে গোত্রপ্রীতিও জেগে উঠল। তারা ভাবল, “আমাদের নিজ গোত্রের একজনের সঙ্গে এখানকার লোকজন এরকম নিষ্ঠুর আচরণ করছে।’ এই ভাবনা থেকে তারা আদ্দাস নামের তাদের এক ভূত্যে মাধ্যমে নবিজির (সা) কাছে এক বাটি আঙুর পাঠিয়ে দিল। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, আদ্দাস ছিলেন একজন ইরাকি খ্রিষ্টান।

আদ্দাসের সাথে কথোপকথন | তায়েফের ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আদ্দাসের সাথে কথোপকথন | তায়েফের ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ফলগুলো নবিজির (সা) মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দিল। এ যেন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে তাঁর রসুলের জন্য সময়োপযোগী উপহার। তিনি উপহারটি গ্রহণ করলেন এবং “বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে) বলে খাওয়া শুরু করলেন। নবিজির (সা) মুখে ‘বিসমিল্লাহ’ শুনে আদ্দাস তো অবাক। এরকম কথা ওই অঞ্চলের মানুষদের মুখে আগে তিনি কখনো শোনেননি। তিনি ভাবলেন, স্থানীয় আরবরা তো এই জাতীয় কথা বলে না।

আন্দাস: এই কথাটা কী?

নবিজি (সা): এটা আমার প্রতিপালক আমাকে শিখিয়েছেন। তুমি কোথায় থাক?

আন্দাস: আমি নিনেভেহ থেকে এসেছি। নবিজি (সা): ইউনুস ইবনে মাত্তার (ম্যাথিউর পুত্র জোনাহের) জনপদ? আদ্দাস (অবাক হয়ে): ইউনুস ইবনে মাত্তার কথা আপনি কীভাবে জানলেন? এই পুরো অঞ্চলের কেউ কখনো তাঁর কথা শোনেনি। নবিজি (সা) তিনি আমার ভাই, আমি তাঁর ভাই। আমরা দুজনই আল্লাহর নবি।

একথা শুনে আন্দাস নবিজির (সা) দিকে ঝুঁকে তাঁর হাত ও পায়ে চুম্বন দিলেন। নবিজি (সা) যে ইউনুস (আ) ও তাঁর কাহিনি জানেন তা একটি অলৌকিক বিষয়। এই কাহিনির সঙ্গে আরবদের কোনো সম্পর্ক নেই, নবিজির (সা) তা মোটেই জানার কথা নয়। ওই অঞ্চলে আদ্দাসই ছিলেন একমাত্র খ্রিষ্টান। এখানে তিনি এমন এক ব্যক্তির দেখা পেয়েছেন যিনি জানেন যে নিনেভেহ কী এবং ইউনুস কে। তাই খ্রিষ্টানরা যেভাবে তাঁদের গুরুজন ও পুরোহিতদের শ্রদ্ধা জানায়, সেভাবে আন্দাস নবিজির (সা) হাত-পায়ে চুম্বন করলেন। তখনই তিনি নবিজির (সা) ওপর বিশ্বাস স্থাপন করলেন। ওদিকে উত্তরা ও শায়বা অবাক হয়ে দূর থেকে আদ্দাসের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছিল। আদ্দাস ফিরে এলে তাঁর মনিবরা (উতবা ও শায়বা) তাঁকে জিজ্ঞেস করল: ধিক তোমাকে। তুমি তার হাত-পায়ে চুমু দিলে?

আদ্দাস: হে আমার মনিবগণ। এই পৃথিবীতে তাঁর চেয়ে উত্তম মানুষ আর কেউ নেই। তিনি আমাকে এমন কিছু বলেছেন, যা শুধু একজন নবি ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয় ।

মনিবরা: হে আদাস। ওই ব্যক্তি তোমাকে বিভ্রান্ত করেছে। তোমার ধর্ম তার ধর্ম থেকে উত্তম। পরবর্তীকালে বদরের যুদ্ধে এই দুই ভাই আদ্দাসকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আদ্দাস নিজের মনিবদের আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানান। উল্লেখ্য, তাঁর মনিবরা দুজনেই বদরের যুদ্ধে মারা যায়।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

মালাক আল-জিবাল

এই ঘটনা নিয়ে সহিহ বুখারিতে বর্ণনা রয়েছে। নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি যখন কারান আল-মানাজিলের কাছে পৌঁছলাম, তখন তাকিয়ে দেখলাম, একখও মেঘ আমাকে ছায়া দিচ্ছে। মেঘের ভেতরে আমি জিব্রাইলকে (আ) দেখতে পেলাম। তিনি আমাকে বললেন, ‘হে মুহাম্মদ! আপনার লোকেরা আপনাকে যা বলেছে এবং তারা যে আপনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সবই আপনার প্রতিপালক দেখেছেন। আপনার সাহায্যার্থে তিনি একজন ‘মালাক আল-জিবাল’ (পাহাড়ের ফেরেশতা) সহযোগে আমাকে প্রেরণ করেছেন।”

সেই সময় নবিজি (সা) শুনতে পেলেন: “আমি মালাক আল-জিবাল। বলুন আপনি কী চান? আমি আপনার সাহায্যার্থে মোতায়েন আছি। আপনি যদি চান তবে আমি দুই পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত এই শহর পিষে ফেলতে পারি।” কিন্তু নবিজি (সা) জবাব দিলেন, “না। বরং আমি আশা করব, আল্লাহ তাদের বংশধরদের পথ দেখাবেন যাতে তারা কোনো অংশীদার ছাড়া আল্লাহর ইবাদত করে।”

ভায়েফের ঘটনা থেকে শিক্ষণীয়

১) নবি করিমকে (সা) জীবনে অনেক কঠোর পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে এই দুনিয়ায় ও পরকালে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। একই সঙ্গে আল্লাহ আমাদের জানিয়ে দিচ্ছেন যে, আমাদের জীবনের মূল উদ্দেশ্য এই দুনিয়ার সুখস্বাচ্ছন্দ্য নয়।

২) নবিজির (সা) দোয়াটি ভালোভাবে লক্ষ করলে আমরা দেখতে পাই, তাঁর প্রধান উদ্বেগের কারণ, তায়েফে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় তাঁর কোনো ভুলের কারণে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শাস্তি দিচ্ছেন কি না। তিনি যদি কোনো ভুল না করে থাকেন, তাহলে তাতেই তিনি সন্তুষ্ট। তবে আল্লাহ তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্য দিলে তিনি আরও পরিতৃপ্ত হতেন। অন্য কথায়, তাঁর প্রধান উদ্বেগ ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নিয়ে, তাঁর শারীরিক কষ্ট নিয়ে নয়। এটিই তওহিদের পরিপূর্ণ রূপ ।

৩) নবিজি (সা) তওহিদের প্রতি দৃঢ় থাকার দৃষ্টান্ত রেখেছেন। আদ্দাসের কাছে তিনি নিজের পরিচয় গোপন করেননি। আঙুর খাওয়ার আগে তিনি বলেছিলেন ‘বিসমিল্লাহ। এই সাধারণ ব্যাপারটিই আদ্দাসের ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামের অনুশাসন মেনে চললে দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের কল্যাণ আসবে। মুসলিম হিসেবে গর্ব বোধ করে। এবং ধর্মচর্চার মধ্য দিয়েই আমরা সম্মানিত হতে পারি।

 

আদ্দাসের সাথে কথোপকথন | তায়েফের ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

৪) লক্ষ করুন, আল্লাহ তায়ালা কীভাবে নবিজির (সা) আন্তরিক দোয়ার জবাব বা প্রতিদান দিচ্ছেন। তিনি প্রথমে নবিজির (সা) কাছে এমন একজনকে পাঠালেন যিনি এসেছেন ইরাক থেকে। এখানে নবিজির (সা) জন্য একটি প্রতীকী ব্যাপার রয়েছে: ‘হে আল্লাহর রসুল! জেনে রাখুন যে আপনি সত্যের পথে আছেন। এমনকি অনেক দূরদেশের একজন অপরিচিত ব্যক্তিও আপনার প্রচারিত সত্যকে স্বীকৃতি দিচ্ছেন।

কাছের লোকেরা আপনাকে এখন প্রত্যাখ্যান করলেও খুব শীঘ্রই দূরের লোকেরা আপনাকে গ্রহণ করবে।’ আরও লক্ষ করুন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর রসুলের দোয়ার জবাব তাৎক্ষণিকভাবে শারীরিক ও আধ্যাত্মিক দুভাবেই দিয়েছেন: (১) শারীরিকভাবে খাবার হিসেবে আঙুর প্রেরণ করে এবং তাঁকে মেঘের ছায়া দিয়ে; এবং (২) আধ্যাত্মিকভাবে তাঁকে ফেরেশতা জিব্রাইলের (আ) মাধ্যমে বিভিন্ন সাহায্যের আশ্বাস দেওয়ার মধ্য দিয়ে।

৫) নবিজি (সা) এত কষ্ট ও অপমান সহ্য করার পরও তায়েফবাসীর জন্য মনেপ্রাণে রহমত ও মঙ্গল কামনা করেছেন। এ থেকে আমরা তাঁর ‘রহমাতাল্লিল আলামিন’ [২১:১০৭/° এবং ‘মহৎ চরিত্রের’ [৬৮:৪]* প্রমাণ পাই। কেউ আমাদের এমন অপমান করলে আমরা তা বছরের পর বছর ধরে মনে রাখি। কিন্তু নবিজি (সা) এত কষ্ট পেয়েও তায়েফবাসীকে ক্ষমা করে দিলেন, এবং দোয়া করলেন। যেন একদিন তায়েফ একটি মুসলিম জনপদে পরিণত হয়।

[প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, এই ঘটনার মাত্র ১০ বছরের মধ্যে নবিজি (সা) হুনায়েনের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তায়েফ জয় করেছিলেন। তাঁকে যে জায়গাটিতে পাথর ছোড়া হয়েছিল, সেখানে একটি মসজিদ বানানো হয়েছে। এখন পুরো তায়েফ শহরটিই মসজিদে পরিপূর্ণ, যেখানে দিনরাত আল্লাহর ইবাদত করা হয়। অথচ নবিজি (সা) চাইলে তায়েফ ধ্বংস হয়ে যেত।] ৬) আবেগের বশে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত নয়। নবিজি (সা) যেমন ওই রকম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্ত মেজাজে, যৌক্তিকভাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি চিন্তাভাবনা করে কাজ করেছেন, আমাদেরও তেমনটি করা উচিত।

৭) জীবনের প্রতিটি সমস্যা (কোথাও প্রত্যাখ্যাত হওয়া, ইসলাম-বিদ্বেষের শিকার হওয়া ইত্যাদি) মোকাবিলার জন্য নবিজিই (সা) আমাদের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত । আল্লাহ কোরানে বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে বেশি করে স্মরণ করে, তাদের জন্য আল্লাহর রসুলের মধ্যে এক উত্তম আদর্শ রয়েছে।” [সুরা আহজাব, ৩০:২১ )

এটা ঠিক যে, নবি করিম (সা) তায়েফে ‘রাজনৈতিকভাবে সফল হতে পারেননি। কিন্তু এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আদ্দাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। একজন ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণও, বিশেষ করে সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে, সফলতার বিচারে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নবিজি (সা) একটি হাদিসে বলেছেন: “আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজনকে হলেও সঠিক পথ দেখান, তাহলে তা হবে তোমার জন্য লাল উটের একটা পুরো বছরের চেয়েও উত্তম।”

আরো পরূনঃ

Leave a Comment