আবিসিনিয়ায় প্রথম অভিবাসন | আল্লাহ কেন মুমিনদের পরীক্ষা করেন? | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সিরাহের পরবর্তী বড় ঘটনাটি হলো আবিসিনিয়ায় প্রথম অভিবাসন। কুরাইশদের দিক থেকে অত্যাচার-নিপীড়ন অব্যাহত থাকলে এক সময় নবি করিম (সা) সাহাবিদেরকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। “এই দেশে থাকা আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সুতরাং তোমরা যারা চাও, পাশের দেশ আবিসিনিয়ায় অভিবাসী হয়ে যেতে পার। সেখানে একজন খ্রিষ্টান রাজা আছেন। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। তিনি তোমাদের ইবাদতে কোনো হস্তক্ষেপ করবেন না।”

আবিসিনিয়ায় প্রথম অভিবাসন | আল্লাহ কেন মুমিনদের পরীক্ষা করেন? | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আবিসিনিয়ায় প্রথম অভিবাসন | আল্লাহ কেন মুমিনদের পরীক্ষা করেন? | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

নবিজি (সা) দাওয়াতের ৫ম বছরের রজব মাসে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। মনে করে দেখুন, প্রকাশ্যে দাওয়াত শুরু হয়েছিল নবুয়তের তিন বছর পর। সেখান থেকে দেড় বছর পরেই নবিজির (সা) এই ঘোষণাটি এসেছিল। অনুমান করা যায়, যেসব নির্যাতনের বর্ণনা আমরা দিয়েছি সেগুলো এই দেড় বছরের মধ্যেই ঘটেছিল।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, আমাদের সময়ের মানুষেরা এক স্থান থেকে আরেক স্থানে অভিবাসী হয়ে চলে যাওয়ার কষ্ট বুঝতে পারে না, কারণ এখন বেশিরভাগই মানুষই জীবনে একাধিক শহরে বাস করে। কিন্তু জাহিলি যুগের মক্কায় নিজ স্থান ছেড়ে পুরোপুরিভাবে অন্যত্র অভিবাসী হওয়ার বিষয়ে কেউ শোনেনি।

আপনি যদি একজন কুরাইশ হন তাহলে অবশ্যই আপনাকে মক্কার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। অন্য কোথাও গেলে আপনার সম্মান বা সুরক্ষা থাকবে না। সেই যুগে আইন, সরকারব্যবস্থা বা সভ্যতার কোনো বালাই ছিল না। নিজ গোত্রের এলাকার বাইরে আপনি যেখানেই যান, সেখানেই আপনি দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক।

তদুপরি ছিল সম্পত্তি স্থানান্তর করার সমস্যা। যেখানে যাচ্ছেন সেখানে তো এখনকার মতো ব্যাংক নেই। আপনি আপনার সম্পত্তি বিক্রিও করতে পারবেন না, কারণ আপনি যে চলে যাচ্ছেন তা কাউকে বলতে পারছেন না। তা ছাড়া সোনা-রুপা সঙ্গে নিয়ে যাওয়াও খুব বিপজ্জনক। পরবর্তীকালে মুসলিমরা যখন মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তখন সাহাবিদের প্রচুর আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল। তাঁরা কোনো অর্থসম্পদ সঙ্গে নিয়ে যেতে পারেননি।

হিজরত করার অর্থ আপনি এমন অপরিচিত দেশে যাচ্ছেন যেখানে আপনার কোনো সম্মান ও সুরক্ষা নেই; সেখানে আপনাকে আশপাশের লোকদের করুণার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে। তা ছাড়া আবিসিনিয়ার ক্ষেত্রে আপনি এমন এক ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে যাচ্ছেন, যেখানকার অধিবাসীরা এমনকি আরবিও বলতে পারে না। আমরা অনুমান করতে পারি, মুসলিমদের জন্য মক্কায় থাকা কতটা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল যে, তাদেরকে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছিল।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

সর্বসাকল্যে ১৫ জন মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন ছিলেন পুরুষ, ৪ জন নারী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

  • উসমান ইবনে আফফান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়া (নবিজির (সা) কন্যা)
  • আবদুল রহমান ইবনে আওফ
  • উসমান ইবনে মাজউন
  • জুবায়ের ইবনুল আওয়াম
  • মুসআব ইবনে উমায়ের

আমির ইবনে রাবিয়া ও তাঁর স্ত্রী লায়লা আবু সালামা ও তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামা তাঁরা সবাই গোপনে দেশত্যাগ করেছিলেন, না সবার গোচরেই করেছিলেন, তা স্পষ্ট নয়। কিছু বর্ণনা থেকে মনে হয় তাঁরা গোপনে চলে গিয়েছিলেন। তাঁরা প্রথমে জুন্দায় (বর্তমানে জেন্দা) গিয়েছিলেন। সেখান থেকে একটি জাহাজে চড়ে আবিসিনিয়ায় চলে যান।

বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, মুসলিমদের চলে যাওয়ার খবরটি কুরাইশদের কাছে আগেই পৌঁছেছিল। আসলে ওই সময়ের প্রেক্ষাপটে কুরাইশদের জন্য তাঁদের দেশত্যাগে বাধা দেওয়ার কোনো কারণ ছিল না। আল-তাবারানির লেখা ‘মুজাম’ নামক হাদিসের বইয়ে একটি কাহিনি বর্ণিত আছে, যা থেকে ধারণা করা যায়, মুসলিমদের চলে যাওয়ার খবরটি মক্কার সবার আগে থেকেই জানা ছিল।

 কাহিনিটি আমির ইবনে রাবিয়া ও তাঁর স্ত্রী লায়লাকে নিয়ে। বর্ণিত আছে, লায়লা তাঁর জিনিসপত্র থলিতে ভরে উটের পিঠে চাপাচ্ছিলেন। উমর (রা), যিনি তখনও মুসলিম হননি, সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের যাত্রার প্রস্তুতির বিষয়টি খেয়াল করলেন। তিনি লায়লাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কোথায় সফরে যাচ্ছ?” সময়টা “রিহলাত আশ-শিতাই ওয়া আস-সাইফ’ (শীতকাল এবং গ্রীষ্মকালীন সফরের মৌসুম) ছিল না।

উমরের (রা) কথায় কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে লায়লা বললেন, “সব কিছুই হচ্ছে এজন্য যে, তোমরা আমাদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন করছ কেবল আমরা আল্লাহর ইবাদত করতে চাই বলে! তোমাদের কারণে আমাদের অন্য কোথাও চলে যেতে হচ্ছে। আমাদের এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করতে হবে যেখানে আমরা নিরাপদে আল্লাহর ইবাদত করতে পারি!”

লায়লার এমন সরাসরি জবাবে উমরের (রা) রাগ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু উল্টো তাঁর মনে সহানুভুতির উদ্রেক হলো। তিনি বললেন, “বিষয়টি কি সেই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে? আল্লাহ তোমাদের সঙ্গে থাকুন।” এ কথা বলে উমর (রা) সেখান থেকে চলে গেলেন। লায়লা তাঁর স্বামী বাড়িতে আসার সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে ঘটনাটি খুলে বললেন। তাঁর স্বামী উমরের (রা) এই নরম ব্যবহারের কথা বিশ্বাস করতে পেরে বললেন, “তুমি কি সত্যিই মনে কর যে, তিনি আমাদের প্রতি দয়াশীল হবেন এবং ইসলাম গ্রহণ করবেন? তাঁর বাবার বাড়ির গাধাগুলোও এর আগে ইসলাম গ্রহণ করবে।”

 

আবিসিনিয়ায় প্রথম অভিবাসন | আল্লাহ কেন মুমিনদের পরীক্ষা করেন? | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

লক্ষণীয়, যেসব মুসলিম সেই সময় আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন, তাঁরা সবাই ছিলেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী কুরাইশ। নিম্ন বংশমর্যাদার মানুষেরা তখন হিজরত করতে পারেনি। কারণ ক্রীতদাস, মাওলা ও ভৃত্য শ্রেণির কারও দেশত্যাগ করার সুযোগ ছিল না। ফলে, যাদের দেশত্যাগের প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশি (বেলাল, খাবাব, ইবনে মাসউদ, আম্মার প্রমুখ), তাঁরাই তা করতে পারেননি।

অন্যদিকে উসমান ইবনে আফফানের (রা) মতো সম্ভ্রান্ত মুসলিমরা হিজরত করেছিলেন, যাঁরা জানতেন যে কুরাইশরা তাঁদেরকে অতটা ঘাঁটাবে না। তবুও ওই মুসলিমরা হিজরত করেছিলেন, কারণ তাঁরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এখান থেকে শিক্ষণীয় এই যে, আমাদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অবস্থান থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে, যেমনটি পবিত্র কোরানের সুরা মায়েদায় আল্লাহ বলেছেন, “হে মুমিনগণ! তোমাদের দায়িত্ব তোমাদেরই ওপর।” [5:105] সম্ভ্রান্ত মুসলিমরা অন্যদের চেয়ে কম নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তবু তাঁদের জন্য মক্কায় অবস্থান করে কষ্ট সহ্য করার কোনো মানে ছিল না। তাই তাঁরা হিজরতের সুযোগ কাজে লাগিয়েছিলেন। এতে ইসলামবিরোধী কিছু নেই।

আরো পড়ূনঃ

Leave a Comment