আল ইসরা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আল ইসরা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-১, আল ইসরা: বক্ষ উন্মুক্তকরণ এর পরের ঘটনা নবি করিমের (সা) বক্ষ উন্মুক্তকরণ। নবিজি (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) হাতিমে আমার বক্ষ উন্মুক্ত করেন । তিনি স্বর্ণের তৈরি একটি বাটি নিয়ে আসেন যা জমজমের পানি দ্বারা পূর্ণ ছিল। তিনি আমার হৃৎপিণ্ড বের করে। এনে তা ধুয়ে আবার একই জায়গায় স্থাপন করেন।” আরেকটি ভাষ্য অনুসারে, বাটিটি ইমান দ্বারা পূর্ণ ছিল। এখানে কোনো বৈপরীত্য নেই, কারণ বাটিতে জমজমের পানি থাকলেও তা তাঁর ইমান বৃদ্ধি করেছে।

 

আল ইসরা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আল ইসরা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

লক্ষ করুন, এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নবিজির (সা) বক্ষ উন্মুক্ত করার ঘটনা ঘটল। প্রথমবার ঘটেছিল তাঁর চার-পাঁচ বছর বয়সে। সেবার তাঁর হৃৎপিণ্ডে একটি কালো দাগ ছিল, সেটা ধুয়ে মুছে ফেলা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার কোনো কালো দাগ ছিল না, কারণ আগেই তা দূর করে ফেলা হয়েছে। এবার নবিজির (সা) হৃৎপিণ্ড ধোয়ার উদ্দেশ্য ছিল, তিনি ইসরা ও মিরাজে যা দেখতে যাচ্ছিলেন তার জন্য তাকে প্রস্তুত করা। ইবনে হাজম বলেছেন, তিনি যা দেখেছিলেন তার একটি অংশও যদি অন্য কোনো মানুষ দেখতে পেতেন, তবে তিনি পাগল হয়ে যেতেন। আল্লাহ তায়ালা সুরা নাজমে বলেছেন: “তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি।” [23:19] প্রকৃতপক্ষে, ইসরা ও মিরাজের যাত্রায় নবিজি (সা) একটি ভিন্ন জগতে প্রবেশ করেছিলেন।

আল ইসরা: বোরাকে আরোহণ

নবি করিম (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) আমার জন্য একটি প্রাণী নিয়ে এসেছিলেন। সেটি ছিল আকারে খচ্চরের চেয়ে ছোট কিন্তু গাধার চেয়ে বড়। প্রাণীটি ছিল বিশুদ্ধ সাদা রঙের, নাম আল বোরাক (আরবি মূল ধাতুরূপের অর্থ হচ্ছে বিদ্যুৎ)। চলার সময় সে তার খুর দেখতে পেত।” বোরাকের আকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে অনেক গল্প-কাহিনি প্রচলিত আছে। আমরা ডানাওয়ালা বোরাকের বহুল প্রচলিত যে ছবিটি দেখতে পাই তা মোটেও সত্য নয়। হাদিসে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে, বোরাক রক্ত-মাংসের তৈরি একটি সত্যিকারের দেহবিশিষ্ট প্রাণী, যা একটি সাধারণ ঘোড়ার চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে চলতে পারে। এত দ্রুত চলতে পারে যে, যতদূর চোখ যায় এক লাফেই সেখানে পৌঁছতে সক্ষম।

তিরমিজিতে বর্ণিত এক হাদিসে আছে, বোরাকের একটি লাগাম (হারনেস) এবং তার পিঠে জিন (স্যাডল) ছিল। জিব্রাইল (আ) লাগাম চেপে ধরলে রসুল (সা) বোরাকে আরোহণ করেন। আরও বর্ণিত আছে, বোরাক প্রথমে কিছুটা লাফিয়ে উঠেছিল। এতে জিব্রাইল (আ) লাগাম শক্ত করে চেপে ধরে বোরাককে বলেন, “আফসোস তোমার জন্য! তুমি কি লজ্জা পাও না? আল্লাহর কসম, তোমার বর্তমান আরোহীর চেয়ে আল্লাহর দৃষ্টিতে অধিক সম্মানীয় আর কেউ কখনও তোমার ওপর সওয়ার হয়নি।”

এ থেকে ধারণা করা যায়:

(ক) অন্য কোনো সৃষ্টি কিংবা আরোহী ইতিপূর্বে বোরাকটিতে সওয়ার হয়েছিল।

(খ) বোরাক একটি দেহবিশিষ্ট প্রাণী, কারণ সেটি যে কোনো সাধারণ প্রাণীর মতোই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

(গ) আল্লাহ আমাদের জানার বাইরেও অনেক জিনিস সৃষ্টি করেছেন। তিনি পবিত্র কোরানে বলেছেন, “তোমাদের আরোহণের জন্য ও শোভার জন্য তিনি সৃষ্টি করেছেন ঘোড়া, খচ্চর ও গাধা। আর তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু যা তোমরা অবগত নও।” [সুরা নাহল, ১৬:৮] আমরা এর আগের পর্বে উল্লেখ করেছি, জিনদেরও প্রাণী আছে যা আমাদের এই পৃথিবীতেই বিরাজমান। তবু তাদের সম্পর্কে আমাদের তেমন কোনো ধারণা নেই। বোরাকও হয়তো অন্য পৃথিবীতে বসবাসকারী একটি দেহবিশিষ্ট প্রাণী যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না! সম্ভবত ইসরার জন্যই, এবং সম্ভবত একবারের জন্যই, বোরাকটিকে এই পৃথিবীতে আনা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমরা কখনোই পুরোপুরি জানতে পারব না। এটি ইলমুল গায়েব বা অদৃশ্যের জ্ঞান।

নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি তার ওপর চড়ে বসার পর সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল যতক্ষণ না আমরা বায়তুল মাকদিসে পৌঁছাই।” এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, সেই সময়ে বায়তুল মাকদিসে কোনো কাঠামো (মসজিদ, সিনাগগ, টেম্পল ইত্যাদি) ছিল না। জেরুসালেম তখন রোমানদের অধীনে ছিল এবং রোমান সম্রাটের আদেশে এই পবিত্র টেম্পলের দর্শনীয় স্থানটি আবর্জনার স্তূপে পরিণত করা হয়েছিল। খ্রিষ্টানরা ইহুদিদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের প্রতি বিন্দুমাত্র সম্মান দেখাতে চায়নি। ঐতিহাসিকভাবেই খ্রিষ্টানরা ইহুদি-বিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিল। নবিজি (সা) এখানে এসে বায়তুল মাকদিসকে মূল অবস্থায় দেখতে পেয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সম্ভবত সেখানে সুলায়মানের (আ) মূল টেম্পলটি’ অথবা অন্য কিছু আনার ব্যবস্থা করেছিলেন, যেখানে নবিজি (সা) নামাজ পড়েন।

নবিজি (সা) বলেন, “অন্যান্য নবি যেখানে প্রাণীদের বেঁধে রাখত, আমি সেখানে বোরাককে বেঁধে রাখলাম।” এ থেকে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, নবিজি (সা) সেখানে এমন একটি কাঠামো দেখেছেন যা এখনকার মানুষরা দেখতে পায় না। কারণ সুলায়মান (আ) যে খুঁটি ব্যবহার করেছিলেন তা ৩০০ বছর পরে আর দেখতে পাওয়ার কথা নয়। আল্লাহ এভাবেই তাঁর রসুলকে (সা) সশরীরে মূল বায়তুল মাকদিসই দেখিয়েছেন। এটি আল্লাহর ক্ষমতার বিষয়, যা আমাদের বোধের বাইরে।

আল ইসরা: পূর্ববর্তী সকল নবির সঙ্গে নামাজ আদায়

নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমি বায়তুল মাকদিসের ভেতরে ঢুকে দুই রাকাত নামাজ পড়লাম।” এটা মুসলিমদের জন্য ‘তাহিয়াতুল মসজিদ” সম্পর্কিত বিধান * আসার আগে। এ থেকে বোঝা যায়, নবিজি (সা) ইবাদতের ক্ষেত্রে এমন কিছু চর্চা করতেন যা উম্মতের জন্য তখন পর্যন্ত বিধান হিসেবে আসেনি। ঘটনার পরবর্তী বর্ণনায় আমরা কিছুটা পার্থক্য দেখতে পাই: একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, নবিজি (সা) দুই রাকাত নামাজ পড়ার পর যখন ঘুরে দাঁড়ালেন তখন দেখতে পেলেন যে, সব নবি তাঁর পেছনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। এই বর্ণনা থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, তাঁর পেছনে নবিগণ যে দাঁড়িয়ে ছিলেন তা নবিজি (সা) জানতেন না ।

অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি নিজেকে অন্য নবিদের সঙ্গে দেখতে পেলাম। সেখানে মুসা (আ) নামাজ পড়ছিলেন। তিনি শানুহ গোত্রের মানুষদের মতো লম্বা, বলবান, পেশিযুক্ত ও বাদামি বর্ণের মানুষ ছিলেন। আমি ইসা ইবনে মরিয়মকে (আ) দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখলাম; আর যাঁর সঙ্গে ইসার (আ) সবচেয়ে বেশি মিল আছে তিনি উরওয়া ইবনে মাসউদ আল-সাকাফি।”

এখানে আমরা দেখছি, নবিজি (সা) তাঁর সাহাবিদের কাছে তাঁদের বোধগম্য ভাষায় অন্য নবিদের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, ইসা (আ) ফর্সা রঙের ছিলেন, যার অর্থ তিনি দেখতে ককেশিয়ানদের মতো ছিলেন (এখানে আরবিতে ‘লাল’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে, কারণ আরবরা সাদা মানুষদেরকে ‘লাল’ এবং কখনও কখনও ‘হলুদ’ বলে অভিহিত করত)। নবিজি (সা) আরও বলেছেন, “তাঁর চুল এমনভাবে জ্বলজ্বল করছিল যে মনে হচ্ছিল তিনি সদ্য স্নান সেরে এসেছেন। তিনি মুসার (আ) তুলনায় কিছুটা খাটো ছিলেন।” তারপর তিনি বলেছেন, “আমি ইব্রাহিমকে (আ) দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে দেখলাম। আর তাঁর সঙ্গে দেখতে যাঁর সবচেয়ে বেশি মিল। তিনি তোমাদেরই সাথী (অর্থাৎ নবিজি (সা) নিজেই)। “

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

[অন্য একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি নিজের চেয়ে ইব্রাহিমের (আ) সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখতে পাইনি এবং ইব্রাহিমের (আ) চেয়ে বেশি আর কাউকে আমার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাইনি।” অর্থাৎ ইব্রাহিম (আ) এবং মহানবি মুহাম্মদ (সা) শারীরিকভাবে ছিলেন একে অপরের “আয়নার প্রতিবিম্ব’ দেখতে হুবহু একই রকম।

নবিজি (সা) আরও বর্ণনা করছেন, “এরপরে নামাজের সময় উপস্থিত হলে আমাকে তাঁদের ইমাম করা হলো।” অতএব এই ভাষ্য অনুসারে, সেখানে ঠিক কী হচ্ছিল নবিজি (সা) তা ভালো করেই জানতেন । ওপরে উল্লিখিত দুটি ভাষ্যের সমন্বয় করা কঠিন। আল্লাহ ভালো জানেন। তবে মূল কথা হচ্ছে, মহানবি মুহাম্মদ (সা) নামাজে নবিদের নেতৃত্ব

মৃত্যুর পরেও নবিগণ নামাজ পড়ছেন। এ থেকে আমরা নামাজের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। নবিজি (সা) বলেছেন, “আল ইসরায় যাওয়ার পথে যখন আমি মুসার (আ) কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি তাঁকে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে দেখলাম।” নামাজের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য এটুকুই যথেষ্ট। [এখানে লক্ষণীয়, নবিজি (সা) ইসরা ও মিরাজের সময় মুসার (আ) সঙ্গে তিনবার সাক্ষাৎ করেন। তিনি ইসরার সময় দুবার সাক্ষাৎ করেছিলেন; একবার তাঁর কবরে, আরেকবার বায়তুল মাকদিসে। তারপর তৃতীয়বার সাক্ষাৎ করেছিলেন মিরাজের সময় ষষ্ঠ আকাশে। অর্থাৎ নবিজি (সা) মুসাকে (সা) কবরে দেখার পরে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁকে (মুসাকে) বায়তুল মাকদিসে নিয়ে গিয়েছিলেন, এবং আরও পরে ষষ্ঠ আকাশে নিয়ে গিয়েছিলেন। মুসার (আ) বোরাকের প্রয়োজন ছিল না, কারণ তিনি ইতিমধ্যে পারলৌকিক জগতে আত্মিক অবস্থায় ছিলেন। এ বিষয়ে পরে আরও আলোচনা আছে ।]

নবি করিমের (সা) সকল নবির ইমাম হওয়ার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাঁকে যে সম্মান দান করেছেন তার তুলনীয় আর কিছুই নেই। তিনি শুধু ‘সাইয়িদ আল-আনবিয়া” (নবিগণের নেতা) এবং ‘ইমামুল মুরসালিন’ই (রসুলদের ইমাম/নেতা) নন, তিনি সমগ্র উম্মতের নেতাও বটে। কারণ, প্রত্যেক নবিই নিজ নিজ উম্মতদের নেতা ছিলেন, এবং ইসরায় মহানবি মুহাম্মদ (সা) সব উম্মতের নেতাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আরেকটি হাদিস অনুসারে, তিনি বলেছেন, “কেয়ামতের দিন আমি সকল আদম সন্তানের ‘সাইয়্যিদ’ বা নেতা হিসেবে থাকব; আমি অহংকার করার জন্য এ কথা বলছি না।”

আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, নবিরা সবাই এক সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। যেহেতু তাঁরা পারলৌকিক জগতে আত্মিক রূপে ছিলেন, তাই তাঁদের মধ্যে শারিরীক দূরত্বের কোনো বিষয় ছিল না। আক্ষরিক অর্থেই তাঁরা (১ লাখ ২০ হাজার নবি এবং ৩১০ জনের বেশি রসুল) সেখানে এক দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

এ থেকে এই বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, সব নবিই এক রকম, যেমনটি কোরানে উল্লেখ করা হয়েছে: “আমরা তাঁর রসুলদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না।” [২:২৮৫] আবার কোরানের আরেকটি আয়াতে আছে: “এই রসুলদের মধ্যেও কাউকে কারও ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [২:২৫৩] আমরা এই দুটি আয়াতকে এভাবে সমন্বয় করতে পারি: সব নবিই এক প্রতিপালকের ইবাদত করেন, মানবজাতির জন্য তাঁদের সবার বার্তা একই, তবে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর কাছে মর্যাদার বিচারে একে অন্যের চেয়ে উত্তম, এবং মহানবি মুহাম্মদ (সা) তাঁদের মধ্যে সেরা।

আল ইসরা সুখ বনাম মন

তারপর নবি করিম (সা) বলেছেন, “জিব্রাইল (আ) আমাকে দুটি পাত্র এনে দিলেন। একটিতে ছিল দুধ, অন্যটিতে ছিল মন।” (আনুষঙ্গিক দ্রষ্টব্য:

১. আগেই উল্লেখ করেছি, এখানে দুটি সঠিক বর্ণনার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে। একটি ভাষ্যে জিব্রাইল (আ) বায়তুল মাকদিসেই নবিজিকে (সা) পার দুটি দিয়েছিল: অন্য ভাষ্যে জিব্রাইল (আ) উর্ধ্বলোকে যাওয়ার সময় এটা করেছিলেন।

২. সেই সময় পর্যন্ত মদ হারাম করা হয়নি।

জিব্রাইল (আ) নবিজির (সা) সামনে দুটি পাত্র তুলে ধরে বললেন, “বেছে নিন, এবং আপনার উম্মতের জন্য বেছে নিন।” অর্থাৎ দুধ আর মদের মধ্যে বেছে নেওয়ার বিষয়টি শুধু নবিজির (সা) জন্য নয়, তাঁর উম্মতদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। নবিজি (সা) দুয়ের মধ্যে দুধ বেছে নিলেন। তখন জিব্রাইল (আ) বললেন, “আপনি “ফিতরা” বেছে নিয়েছেন।” এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বিষয় আছে। সুধ ও মদের মধ্যে পার্থক্য খুবই স্পষ্ট।

প্রাণী থেকে দুধ খাঁটি হয়ে নিঃসরিত হয়, যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তাদের পেটের আঁতের ও রক্তের মধ্য থেকে পরিষ্কার দুধ বের করে আমি তোমাদেরকে পান করাই, যা যারা পান করে তাদের জন্য বিশুদ্ধ ও সুস্বাদু।” [সুরা নাহল, ১৬:৬৬] একটি হাদিসে আছে, “খাবার ও পানীয়র ক্ষেত্রে দুধের কোনো বিকল্প নেই।” সুতরাং দুধ পুষ্টিকর ও বরকতময় খাবার যা আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেছেন। নবিজিও (সা) দুধ খেতে ভালোবাসতেন।

অন্যদিকে মদ গাঁজনের মধ্য দিয়ে তৈরি একটি দূষিত, নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানীয়। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমিত করার মাধ্যমে মদ প্রস্তুত করা হয়। তা কী কাজে লাগে? মদ কি পুষ্টিকর? স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী? মোটেই না। মদ আপনাকে কলুষিত করে, আপনাকে বোকা বানায় । দুধ আর মদের মধ্যে নবিজি (সা) সেটাই বেছে নিয়েছেন যা বিশুদ্ধ, যা বিশুদ্ধ উৎস থেকে এসেছে এবং যা আমাদের বিশুদ্ধতা বজায় রাখে। এর বিপরীতে মদ কলুষিত, এবং তা দেহকে কলুষিত করে। তাই জিব্রাইল (আ) বলেছেন, “এটা আপনার উম্মতের জন্য।” (অর্থাৎ আপনার উম্মতও বিশুদ্ধ হবে, ফিতরার ওপর থাকবে)।

 

আল ইসরা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

[আনুষঙ্গিক বিষয়: একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “প্রতিটি শিশুই ফিতরার ওপরে জন্মগ্রহণ করে।” অর্থাৎ প্রতিটি শিশুই বিশুদ্ধ হিসেবে জন্য। নেয়, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ভালো প্রবণতা, মন্দ নয়।]

আল মিরাজ:

আকাশের প্রবেশদ্বার দিয়ে আরোহণ এরপর নবিজি (সা) বলেছেন যে, জিব্রাইল (আ) আকাশের প্রবেশদ্বার খোলার জন্য দ্বাররক্ষীকে অনুরোধ করলেন।

দ্বাররক্ষী: আপনি কে?

জিব্রাইল (আ): আমি জিব্রাইল।

দ্বাররক্ষী: আপনার সঙ্গে কি আর কেউ আছে?

জিব্রাইল (আ): হ্যাঁ, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ (সা) আছেন।

দ্বাররক্ষী: তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে (অর্থাৎ তাঁর কি অতিক্রম করার অনুমতি আছে)?

জিব্রাইল (আ) : হ্যাঁ।

তারপর দরজা খুলে দেওয়া হলো। একইভাবে সাতটি আকাশের প্রতিটির দ্বাররক্ষীর সঙ্গে জিব্রাইলের (আ) একই কথোপকথন হয়েছিল। এ থেকে বোঝা যায়, আকাশসমূহের প্রবেশদ্বার রয়েছে এবং প্রতিটি প্রবেশদ্বারে একজন করে দ্বাররক্ষী রয়েছেন। দ্বাররক্ষীকে অনুমতিপত্র না দেখাতে পারলে কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। যেহেতু তাঁরা সবাই ফেরেশতা এবং মিথ্যা বলতে পারেন না, তাই ঢোকার জন্য কোনো বিশেষ সংকেতেরও প্রয়োজন নেই । জিব্রাইল (আ) শুধু হ্যাঁ বলছেন, আর দ্বারগুলো খুলে যাচ্ছে। আমরা এখন আল মিরাজের বর্ণনায় আছি। লক্ষ করুন, বোরাক এখনও খুঁটিতে বাঁধা আছে, যাতে মিরাজের পরে নবিজি (সা) মক্কায় ফিরে যেতে পারেন।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment