আহলে আল-সুফ | কেবলা পরিবর্তন ও কোরানের আয়াত রহিতকরণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আহলে আল-সুফ | কেবলা পরিবর্তন ও কোরানের আয়াত রহিতকরণ, সিরাহর গ্রন্থগুলোতে সুফ্ফার লোকদের বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো গ্রন্থে তাদের ওপর পুরো একটি অধ্যায়ই বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ তাঁরা অনেক বিবেচনাতেই ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে অনুকরণীয় ইমানের অধিকারী। তাঁরা সত্যিকার অর্থেই সবকিছু ত্যাগ করে মসজিদুন নববির গণআশ্রয়স্থলে বাস করতেন।

 

আহলে আল-সুফ | কেবলা পরিবর্তন ও কোরানের আয়াত রহিতকরণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আহলে আল-সুফ | কেবলা পরিবর্তন ও কোরানের আয়াত রহিতকরণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সম্ভবত রমজানের কাছাকাছি কোনো একটা সময়ে সুফ্ফা নির্মিত হয়েছিল। বদরের যুদ্ধের পর থেকে কিছু সাহাবি সুফফাতে বসবাস করতে শুরু করেন। রমজানের আগ পর্যন্ত আনসারদের বাড়িগুলোই ছিল তাঁদের অতিথিশালা। সুফ্ফার লোকেরা অনেক সমস্যা ও প্রতিকূলতার মধ্যে দিনাতিপাত করতেন: এ সম্পর্কে অনেক বর্ণনা রয়েছে। তাঁরা এতই দরিদ্র ছিলেন যে অনেক সময় নিজেদের পরনের কাপড়েরও ভালো সংস্থান করতে পারতেন না।

অবস্থা এমন ছিল যে নবিজি (সা) নামাজরত নারীদের জন্য এই সাধারণ নির্দেশ দিয়েছিলেন: “হে নারীরা! তোমরা কিছু সময় পার না হওয়া পর্যন্ত সেজদা থেকে মাথা উঠাবে না।” কারণ সুফ্ফার লোকেরা সেজদায় গেলে তাঁদের ‘আওরা’র কিছু অংশ কাপড়ের স্বল্পতার জন্য উন্মুক্ত হয়ে পড়তে পারে। এই হাদিসটি কিছুটা বিব্রতকর হলেও এ থেকে ধারণা করা যায়, সুফ্ফার লোকেরা কত দরিদ্র ছিলেন।

সুফ্ফার লোকদের দেখভালের ওপর নবিজি (সা) বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে অনেক হাদিস আছে। ‘হাসান (রা) জন্মগ্রহণ করার পর নবিজি (সা) ফাতেমাকে (রা) সুফ্ফার লোকদেরকে কিছু সাদাকা দিতে বলেছিলেন।’ অন্য একদিন ফাতেমা (রা) নবিজির (সা) কাছে এসে অভিযোগ জানিয়ে বলেন, “বাবা, আমাকে বাড়ির এত কাজ করতে হয়! আমাকে কি যুদ্ধবন্দিদের মধ্য থেকে একজনকে দাস দিতে পারেন?” জবাবে নবিজি (সা) বলেছিলেন, “যখন সুফ্ফার লোকেরা না খেতে পেয়ে কষ্ট পাচ্ছে, তখন আমি কী করে তোমাকে একজন দাস দেব? তাদের খাওয়ার কিছুই নেই। আল্লাহর কসম, আমি সব দাসকে বিক্রি করে দিয়ে সেই অর্থ সুফ্ফার লোকদের পেছনে খরচ করব।”

এখানে দেখা যাচ্ছে, সুফ্ফার লোকদের কথা সব সময়ই নবিজির (সা) মনে জাগরূক ছিল।

সুফ্ফার লোকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন আবু হুরায়রা (রা)। তাঁর পুরো নাম ছিল আবদুল রহমান ইবনে সাখর। তাঁর সম্পর্কে মজার একটি কাহিনি আছে যা তিনি নিজেই বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছেন, “অনেক সময়ই মসজিদ থেকে কোনো সাহাবি বের হলে আমি তাঁকে কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতাম। আল্লাহর কসম, আমি অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর তাঁর চেয়েও ভালোভাবে জানতাম। তবু জিজ্ঞেস করার একমাত্র কারণ ছিল কথোপকথন চালিয়ে যেতে যেতে তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছা, (এই আশায়) যাতে তিনি আমাকে খাবারের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে পারেন।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

আর আবু হুরায়রা আরও একটি ঘটনার বর্ণনা করেছেন, একবার নবিজি (সা) আমাকে খুব ক্ষুধার্ত অবস্থায় দেখতে পেলেন। আমি ক্ষুধার ক্লান্তিতে দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। এ অবস্থায় তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিমন্ত্রণ জানালেন। বাসায় যাওয়ার পর তিনি আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করলেন, ‘খাওয়া-দাওয়ার কি কিছু আছে?’ আয়েশা (রা) জবাবে বললেন, “হ্যাঁ, আনসারদের মধ্যে একজন এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেছে।”

একথা শুনে আবু হুরায়রা (রা) স্বাভাবিকভাবেই বেশ খুশি হলেন। কিন্তু নবিজি (সা) তাঁকে বললেন, “তুমি সুফ্ফার লোকদের ডেকে নিয়ে এসো।” সেখানে ৩০-৪০ জন লোক ছিল। আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, “আমাকে অবশ্যই আদেশটি মানতে হয়েছিল।” সুতরাং তিনি তাঁদের সকলকে ডেকে নিয়ে এলেন। এবার নবিজি (সা) আবু হুরায়রার (রা) হাতে দুধের পেয়ালাটি হাতে দিয়ে বললেন, “একে একে প্রত্যেকের কাছে গিয়ে পেয়ালাটি তাদের হাতে দাও।” আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করছেন, “সুতরাং আমি তাদের প্রত্যেকের হাতে পেয়ালা তুলে দিচ্ছিলাম আর মনে মনে ভাবছিলাম, ‘আমার জন্য কি কিছু অবশিষ্ট থাকবে?’ অবশেষে আমি আর নবিজি (সা) ছাড়া প্রত্যেকের খাওয়া শেষ হলে তিনি আমাকে বললেন, ‘বসো।’

আমি বসার পরে তিনি আমাকে বললেন, ‘পান করো।’ অতএব আমি পান করলাম।” আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, পেয়ালাটিতে দুধের পরিমাণ প্রথমবার নবিজি (সা) তাঁকে যতটুকু দিয়েছিলেন তার চেয়েও বেশি ছিল (পেয়ালাটি যেন উপচে পড়ছিল)। নবিজি (সা) আবার তাঁকে বললেন, “পান করো।” সুতরাং আবু হুরায়রা (রা) আবার পান করলেন। নবিজি (সা) আরেকবার তাঁকে বললেন, “পান করো।”

এই পর্যায়ে আবু হুরায়রা (রা) বলে উঠলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আল্লাহর কসম, আমার পেটে আর একটুও জায়গা খালি নেই।” [নবিজি (সা) খুব ভালো করেই আবু হুরায়রার (রা) অবস্থা বুঝতে পারছিলেন, কিন্তু তিনি তাঁর সঙ্গে রসিকতা করে ওভাবে বলছিলেন। ৩০-৪০ জন লোক দুধ পান করার পরে নবিজি (সা) সবশেষে পেয়ালাটি নিয়ে নিজে তা থেকে পান করলেন।

অনেক সময় এমন হয়েছে যে, সুফ্ফার বেশিরভাগ সাহাবি টানা দুই দিন অনাহারে থেকেছেন। কখনও কখনও তাঁরা নবিজির (সা) পেছনে জামাতে নামাজ আদায় করার সময় শারীরিক দুর্বলতার কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে পড়ে যেতেন। নবিজিকে (সা) কেউ উপহার হিসেবে খাবার পাঠালে তিনি সুফ্ফার লোকদের আমন্ত্রণ জানাতেন তাঁর সঙ্গে ভাগাভাগি করে তা খাওয়ার জন্য। প্রায়শই তিনি অন্য সাহাবিদের বলতেন, তারা যেন সুফ্ফার লোকদের থেকে কাউকে নিজেদের বাড়িতে খেতে নিয়ে যান এবং সর্বোত্তম আপ্যায়নের ব্যবস্থা করেন। জানা যায়, সাদ ইবনে উবাদা মাঝে মাঝে সুফ্ফার লোকদের থেকে একসঙ্গে আশি জনকে পর্যন্ত নিমন্ত্রণ করতেন।

বর্ণিত আছে, একবার এক সাহাবি প্রস্তাব দিলেন, “আমরা যখনই কোনো খাবার খাব, তা থেকে কিছু অংশ আমরা সুফ্ফার লোকদের জন্য দিয়ে আসব।” সেই অনুসারে সুফ্ফার দুটি পিলারের মধ্যে একটি পাত্র ঝুলানো হয়েছিল। সেখানে সাহাবিরা খাবার (প্রধানত খেজুর) রেখে আসতেন। এটা করা হয়েছিল এ জন্য যে, যাদের সামর্থ্য নেই তারা যেন সেখান থেকে খেতে পারে, তাঁদেরকে যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয়। উল্লেখ্য, মুসলিমদের মধ্যে এই প্রথাটি ১৯৪০- ১৯৫০ সাল পর্যন্ত চালু ছিল। যেমনটি আগেই উল্লেখ করেছি, সুফ্ফার সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত  ছিলেন আবু হুরায়রা (রা)। তিনি ছিলেন ইয়েমেনের দাস গোত্রের।

খায়বার যুদ্ধের পরে অর্থাৎ হিজরতের ৭ম বছরে তিনি মদিনায় আসেন। নবিজির (সা) সঙ্গে এত অল্প সময় থেকেও তিনি ছিলেন সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বেশি হাদিসের বর্ণনাকারী। তিনি এত বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন যে, পরবর্তী প্রজন্মের কেউ কেউ প্রশ্ন পর্যন্ত তুলেছেন: “কিছু সাহাবি তাঁর চেয়ে দীর্ঘ সময় নবিজির (সা) সঙ্গে থাকলেও তিনি তাঁদের চেয়ে এত বেশি জানেন কী করে?” এ বিষয়টি নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলে তিনি নিজেই তা ব্যাখ্যা করেছেন।

 

আহলে আল-সুফ | কেবলা পরিবর্তন ও কোরানের আয়াত রহিতকরণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আবু হুরায়রা (রা) বলেছেন, যা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, “যারা প্রাপ্ত জ্ঞান নিজেদের মধ্যে রেখে দেয় আল্লাহ যদি তাদের সমালোচনা না করতেন [কোরান, ২:১৫৯], তাহলে আমি একটিও হাদিস বর্ণনা করতাম না। আমি তোমাদের বলব, কেন (বা কীভাবে) আমি আমাদের মুহাজির ও আনসার ভাইদের চেয়ে বেশি জানি। মুহাজিররা ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বাজারে কেনাবেচার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। আর আনসাররা জমিতে ফসল ফলানোর কাজে ব্যস্ত থাকতেন। আর আমি সেই সময় ক্ষুধার্ত পেটে সর্বদাই নবিজির (সা) সঙ্গে লেগে থাকতাম। তাই আমি অনেক কিছুই মুখস্থ করতে পেরেছি যা ব্যস্ততার কারণে বা সময়াভাবে) তাঁরা পারেননি।”

তবে আবু হুরায়রা (রা) হতদরিদ্র ছিলেন না। তাঁকে মধ্যবিত্ত বলা যেতে পারে। তাঁর মা আগে ইয়েমেনে বসবাস করতেন, একসময় তিনি মদিনায় এসে একটি বাড়ি কেনেন। কিন্তু আবু হুরায়রা (রা) মায়ের বাড়িতে না গিয়ে সুফ্ফাতেই বসবাস করতে থাকেন। কারণ তা নিছক আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, ইসলামের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠেছিল। নবিজি (সা) সর্বদা তাঁর মসজিদে থাকতেন। সুতরাং আবু হুরায়রা (রা) যত বেশি সময় সম্ভব নবিজির (সা) সঙ্গে থেকে তাঁর কাছ থেকে সর্বোচ্চ সম্ভব জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করতেন। তিনি জ্ঞান অন্বেষণের জন্য নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন ত্যাগ করেছিলেন।

হানজালা ও কাব ইবনে মালিকের মতো বিখ্যাত সাহাবিরাও সুফ্ফায় থাকতেন। নবিজির (সা) সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে সুফ্ফা পরিণত হয়েছিল। জ্ঞানার্জনের একটি প্রাথমিক পীঠস্থানে। তাই কিছু আনসারও নিজেদের বাড়ি ছেড়ে সুফ্ফায় গিয়ে থাকা শুরু করেন। কিছু বিখ্যাত মুহাজিরও (যেমন: আবু জর গিফারি, সুহায়েব আল-রুমি, বেলাল ইবনে রাবাহ, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ প্রমুখ) সুফ্ফায় চলে যান। [প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, কিছু সুফি গোষ্ঠী বলে থাকেন। যে ‘সুফি’ শব্দটি সুফফা থেকে এসেছে; কিন্তু এ কথা সত্য নয়।

সুফ্ফার লোকেরা জ্ঞান-গরিমা ও ইমান-আমল (যেমন, পবিত্র কোরান মুখস্থ করা, তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা, জ্ঞান অন্বেষণ ইত্যাদি) সব ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্বের কারণে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। এমনকি প্রতিটি বড় যুদ্ধে শাহাদত বরণকারীদের মধ্যে সুফ্ফার শীর্ষে। হিজরিতে মুসাইলামা আল-খান্দাবের বিরুদ্ধে রিদ্দার যুদ্ধে অনেক সাহাবি মারা যান, যাদের অনেকেরই পবিত্র কোরান মুখস্থ ছিল। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন সুফ্ফার লোক। সে কারণে আবু বকর (রা) ও উমর (রা) কোরান সংকলন করতে উদ্যোগী হন।

সুফ্ফায় কত থাকতেন? কখনো পাঁচ-দশজন থাকতেন, আবার কখনো সত্তর জনও থাকতেন। মদিনার বাইরে থেকে কোনো প্রতিনিধি এলে তিনি। সুফ্ফাতেই থাকতেন। জানা যায়, মদিনার বাইরের দূরবর্তী এলাকা নতুন মুসলিমরা এসে সুফ্ফায় কোরান, ফিকহ, নামাজ পড়ার নিয়ম ইত্যাদি শিখে নিজ গোত্রের কাছে ফিরে অর্জিত জ্ঞান বিতরণ করতেন। ইবনে মাসউদ বলেছেন, “নতুন কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁকে কোরান ও নামাজ শিক্ষা দেওয়ার জন্য আমাদের (সুফ্ফার) মধ্য থেকে একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হতো।” তাই বলা যেতে পারে, সুফ্ফা ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো। তবে নবিজির (সা) তিরোধানের পর সুফ্ফার গুরুত্ব ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকেনি।

মসজিদুন নববির শুধু পেছনের অংশের ছাদটি ছিল সুফ্ফার লোকদের জন্য নির্ধারিত। এ থেকে দেখা যায়, নবিজি (সা) নিয়মিত মুসল্লিদের চেয়ে সুফ্ফার লোকদের বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। তিনি তাঁদের নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন কারণ তাঁরা মসজিদে থাকতেন। [এখনকার সময়ে মসজিদুন নববির উঁচু পাটাতনকে কেউ কেউ সুফ্ফার জায়গা ভেবে ভুল করে। প্রকৃতপক্ষে সুফা ছিল বেশ সামনের দিকের একটি জায়গা। তা ছাড়া, সুফ্ফায় কোনো উঁচু পাটাতন “ছিল না।

আরও দেখুনঃ

Leave a Comment