সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি | মদিনায় হিজরত, সুরাকা ইবনে মালিক ছিলেন যুম গোত্রের একজন নেতা। তিনি কুরাইশ ছিলেন না। সুরাকা ইসলাম গ্রহণের পরে নিজেই কাহিনিটি এভাবে বর্ণনা করেন: সুরাকা তাঁর গোত্রের লোকদের সঙ্গে বসে ছিলেন। এমন সময় তাঁরা খবর পেলের, উটে আরোহী তিন ব্যক্তির খোঁজ করা হচ্ছে— মুহাম্মদ, আবু বকর এবং আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিত।

তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য কুরাইশরা একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছে কিছুক্ষণের মধ্যে তাঁর গোত্রের একজন এসে খবর দিল, “আমি দূর থেকে তিনজনকে দেখতে পেয়েছি। আমি নিশ্চিত, কুরাইশরা তাদেরকেই খুঁজছে।” সুরাকা ইবনে মালিকের মনে লোভ জেগে উঠল। তিনি একাই একশ উট পেতে চাইলেন। তাই উপস্থিত সবাইকে মিথ্যা বললেন, যাতে কেউ তাঁদের খুঁজতে বের না হয়। “ওহ। কুরাইশরা যাঁদেরকে খুঁজছে, এরা তারা নয়। এরা (অমুক অমুক) এই অঞ্চলে যে অভিযানে বের হবে তা আমাকে আগেই বলেছিল (অর্থাৎ এরা অন্য কেউ, যাদের আমি চিনি)। “

 

সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সুরাকার মুখে এই কথা শুনে সবাই সেখানে বসে রইল। কিছুক্ষণ পরে তাঁর সঙ্গীরা বিষয়টা ভুলে গেলে তিনি সেখান থেকে সরে পড়লেন। তারপর ছুটে বাড়ি গিয়ে তাঁর যুদ্ধের ঘোড়া প্রস্তুত করলেন, বর্ম পরিধান করে দ্রুত ওই তিনজনের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি ভেবেছিলেন, তিনি তাঁর তিরধনুক দিয়ে দূর থেকে একাই তিনজনকে মেরে ফেলতে পারবেন। পুরস্কারের শর্ত ছিল, জীবিত বা মৃত যে কোনো অবস্থায় ধরে আনলেই চলবে। এভাবে তিনি ওই তিনজনের ধারেকাছে না গিয়েও একশটি উট সহজেই পেয়ে যাবেন বলে ধরে নিয়েছিলেন।

খুঁজতে খুঁজতে সুরাকা যখন প্রথমবারের মতো তাদের দেখতে পেলেন, তখনই তাঁর ঘোড়াটির পা হঠাৎ মাটিতে ঢুকে গেল এবং তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে উল্টে পড়ে গেলেন। তাঁর জীবনে এমন ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। অন্য একটি বর্ণনা অনুসারে, তিনি তাঁর ও ওই তিন উট আরোহীর মাঝখানে ধোঁয়া দেখতে পেলেন। তাই তিনি তাঁর সঙ্গের ‘আজলাম’ বের করল। আজলাম এক ধরনের তির যা জাহেলি যুগে ভাগ্যগণনার জন্য ব্যবহার করা হতো। সুরাকা এখন কী করবেন সেই নির্দেশনা পাওয়ার জন্য আজলামটি বালির ওপরে ফেললেন। তিনি যা উত্তর পেলেন তা হলো, ‘তুমি আর এগিয়ে যেও না’। তিনি দ্বিতীয়বার চেষ্টা করলেও তাঁর ঘোড়াটি একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখাল।

কিন্তু তিনি লোভের বশবর্তী হয়ে ভাগ্যের পূর্বাভাস উপেক্ষা করে এগিয়ে চললেন। এক সময় তিনি তাঁদের এত কাছে চলে এলেন যে, চিৎকার তাঁরা শুনতে পেতেন। তখন তিনি আবারও তাঁর ঘোড়ার কাছ থেকে বাধা পেলেন। এবারের বাধাটি ছিল আরও প্রচণ্ড। তৃতীয়বারের মতো বাধা পেয়ে তাঁর মনে হলো, তাঁর নিজের ভাষায়, “আমি বুঝতে পারলাম, এ এমন এক শক্তি যা আমার আয়ত্তের বাইরে। আমার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হলো যে, ইনি এমন এক ব্যক্তি যাঁর কাছে আমি কখনোই পৌঁছতে পারব না; ইনি আমার শক্তির ঊর্ধ্বে। আমি এও বুঝতে পারলাম যে, এই ব্যক্তি যা প্রচার করছেন (ইসলাম) তা ছড়িয়ে পড়বেই।”

সুরাকা আরো বর্ণনা করেন: “আমি তাঁদের পেছন থেকে লক্ষ করছিলাম। আমি দেখলাম, তাঁদের দুজনের একজন সবসময় অস্থির। তিনি ঘন ঘন ডানে- বামে তাকাচ্ছেন, কখনও পেছনে আসছেন, কখনো সামনে যাচ্ছেন।” সুরাকা যাঁর কথা বলছেন তিনি আবু বকর (রা), তিনি নবিজিকে (সা) নিয়ে উৎকণ্ঠার কারণে অস্থির ছিলেন। সুরাকার কথায়, “অন্য আরোহীটি ডানে-বামে না তাকিয়ে খুব শান্তভাবে বসে ছিলেন এবং কিছু একটা পড়ছিলেন।” অন্য আরোহীটি ছিলেন স্বয়ং নবি করিম (সা); তিনি যা পড়ছিলেন তা ছিল পবিত্র কোরান।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

পর পর তিনবার বাধা পেয়ে সুরাকা একশ উট পুরস্কারের আশা ছেড়ে দিলেন। তিনি নবিজি (সা) ও তাঁর সঙ্গীকে পেছন থেকে ডেকে বললেন: “আমার কাছ থেকে আপনাদের কোনো ভয় নেই। আমি আপনাদের কোনো ক্ষতি করব না। আমাকে আপনাদের কাছে আসার অনুমতি দিন।” অনুমতি পেয়ে তিনি নবিজির (সা) কাছে তাকে (সুরাকাকে) লিখিতভাবে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন।

ভাবতেই অবাক লাগে, এক মিনিট আগেই তিনি যাকে হত্যা করতে উদ্যত ছিলেন, এখন তাঁরই কাছে নিরাপত্তা চাচ্ছেন। যেহেতু তাঁর মনে বিশ্বাস এসে গিয়েছিল যে, নতুন ধর্মটি দ্রুতই সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে, তাই তা ঘটার আগেই তিনি নবিজির (সা) কাছে নিরাপত্তা চাইলেন। নবিজি (সা) আবদুল্লাহ ইবনে উবাইতিকে অনুমতি দিলেন সুরাকা ইবনে মালিককে নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারটি লিখিতভাবে নিশ্চিত করার। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, আবদুল্লাহ ইবনে উৱাইকিত মুসলিম ছিল কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই।

সুরাকা ইবনে মালিক নবিজি (সা) ও তাঁর সঙ্গীদের কিছু খাবার এগিয়ে দিলেন। কিন্তু তাঁরা তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। আবু বকর (রা) তাঁকে বললেন, “তুমি বরং আমাদের একটা অনুরোধ রেখো; আমাদের সম্পর্কে কাউকে কিছু বোলো না।” সুরাকা ইবনে মালিক সেই কথা রেখেছিলেন। তিনি মক্কায় ফিরে গিয়ে তাঁদের সম্পর্কে কাউকে কিছু বলেননি।

নবিজি (সা) নিরাপদে মদিনায় পৌঁছার পর সুরাকা মক্কার সবাইকে সেদিনের ঘটনাটি জানিয়ে দেন। এই খবর কুরাইশদের কাছে পৌঁছালে আবু জেহেল সুরাকার নিন্দা করে একটি কবিতা লিখেছিল। কবিতার লাইনগুলো ছিল এরকম: “তুমি তাদের যেতে দিয়েছিলে? তুমি একটা বোকার হদ। ইত্যাদি।” সুরাকাও কবিতা লিখে এর উত্তর দিয়েছিলেন: “তুমি যদি সেদিন সেখানে থাকতে এবং আমি যা দেখেছি তা যদি দেখতে, তাহলে তুমি এখন যা বলছ তা কখনোই বলতে পারতে না।”

 

সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ইবনে ইসহাকে এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে।

আরও অনেক পরে, ৮ম হিজরিতে হুনায়েনের যুদ্ধের দিনে নবি করিম (সা) যখন মক্কার বাইরের অন্যান্য গোত্রের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেন, তখন সেখানে সুরাকা ইবনে মালিকের গোত্রও ছিল। সুরাকা তখন তাঁর সেই নিরাপত্তার দলিল নিয়ে হাজির হন। নবিজি (সা) তাঁকে সহজেই চিনতে পারেন এবং তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। তারপর সুরাকা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং একজন সাহাবি হিসেবে মদিনায় হিজরত করেন।।

ইবনে আবদ আল-বার বর্ণনা করেছেন, সুরাকা ইবনে মালিক চলে যাওয়ার প্রাক্কালে নবিজি (সা) প্রথমবারের মতো তাঁর দিকে ফিরে বলেছিলেন, ‘হে সুরাকা, যেদিন তুমি কিসরার ব্রেসলেটগুলো পরবে সেদিন তোমার কেমন লাগবে?” উল্লেখ্য, পারস্যের সম্রাট কিসরা অত্যন্ত দামি স্বর্ণখচিত ব্রেসলেট ও গহনা পরত। এজন্য সবাই তাকে ঈর্ষা করত। সেই সময় বিশ্বে একজন মাত্র কিসরা ছিল।

সুরাকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হরমুজের পুত্র কিসরা?” নবিজির (সা) মৃত্যুর মাত্র ছয়-সাত বছরের মধ্যেই কাদিসিয়ার যুদ্ধে পারস্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং পার্সেপলিস’ মুসলিমদের করতলগত হয়। সেখানকার সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করে তৎকালীন খলিফা উমরের (রা) কাছে পাঠানো হয়। ধনসম্পদ ও সোনাদানার পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তা দিয়ে মসজিদ ভরে যায়। উমর (রা) সুরাকা ইবনে মালিককে ডেকে নিয়ে নিজের চেয়ারে বসান এবং কিসরার ব্রেসলেটগুলো খুঁজে বের করে তা সুরাকার হাতে তুলে দেন।

কল্পনা করতে পারেন, কিসরার ব্রেসলেট এখন সুরাকার হাতে! নবি করিম (সা) যা বলেছিলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পূরণ হয়েছে। ইবনে আবদ আল-বার বর্ণনা করেছেন, জনতা ব্রেসলেটগুলোসহ সুরাকা ইবনে মালিককে মদিনা শহর প্রদক্ষিণ করায়। উমর (রা) বলেছিলেন, “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি হরমুজের পুত্র কিসরার কাছ থেকে ব্রেসলেটগুলো নিয়ে বনু মুসলিজ গোত্রের বেদুইন সুরাকার হাতে পৌঁছে দিয়েছেন।” নবিজির (সা) জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া অনেক অলৌকিক ঘটনার মধ্যে এটি অন্যতম ।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment