ইয়াসরিবের জনসংখ্যা | মদিনাপর্বের ভূমিকা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

ইয়াসরিবের জনসংখ্যা | মদিনাপর্বের ভূমিকা, ইয়াসরিবে মূলত দুটি বড় নৃগোষ্ঠী বসবাস করত: ইহুদি ও আরব। এখন প্রশ্ন, এই ইহুদিরা কোথা থেকে এল? তারা আরব ভূখণ্ডের মাঝখানেই বা কী করছিল? এই আরবরা কারা? অন্য আরবদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কই বা কী? ইয়াসরিবে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে সম্পর্কই বা কেমন ছিল?

ইয়াসরিবের জনসংখ্যা | মদিনাপর্বের ভূমিকা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ইয়াসরিবের জনসংখ্যা | মদিনাপর্বের ভূমিকা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মদিনার জনগোষ্ঠী:

ইহুদি (বনু নাদির, বনু কুরায়জা এবং বনু কায়নুকা)

বনু নাদির, বনু কুরায়জা ও বনু কায়নুকা—এই তিন ইহুদি নৃগোষ্ঠী কোথা থেকে এল? নবি করিম (সা) ও ইহুদিদের ঘিরে যেসব ঘটনার কথা আমরা জানি সেগুলোর উৎস কী? ইহুদি-বিদ্বেষের অভিযোগ নিয়ে আলোচনার সবচেয়ে বড় অসুবিধা হলো, অনৈসলামিক উৎসগুলোতে আরবের ইহুদিদের সম্পর্কে সাধারণভাবে উল্লেখ থাকলেও মদিনার ইহুদিদের সম্পর্কে তেমন কিছু নেই। তাদের সম্পর্কে উল্লেখ শুধু ইসলামি সূত্রগুলোতেই পাওয়া যায়। অমুসলিমদের দৃষ্টিতে মুসলিম উৎসগুলো ‘পক্ষপাতদুষ্ট’।

তাদের মতে, মুসলিমরা যে কোনো মূল্যে মুহাম্মদের (সা) সম্মান রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। তাদের ধারণা, যারাই নবিজির (সা) বিরোধিতা করে আমরা মুসলিমরা তাদের নেতিবাচকভাবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করি। সুতরাং এই কথিত পক্ষপাতিত্বের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে অথবা নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক ধরনের ভারসাম্য আনতে গিয়ে কিছু কিছু মুসলিম মুনাফেকদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে একজন ভালো ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি হিসেবে দেখাবার চেষ্টা করেন । ফলে পুরো ব্যাপারটি ভিন্ন আঙ্গিকে চলে যায় ।

সুতরাং আমরা কীভাবে উৎসগুলো ব্যাখ্যা করব তা নিয়ে খুব সতর্ক হওয়া দরকার। এই ইহুদি উপজাতিগুলো কোথা থেকে এসেছে তা নিয়ে অনেক তত্ত্ব বা ধারণা আছে। শুরুতে আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব। কিছু তত্ত্ব এসেছে প্রথম যুগের পণ্ডিতদের থেকে, বাকিগুলো পরবর্তী যুগের পণ্ডিতদের থেকে: ইসলামের প্রাথমিক উৎসগুলো থেকে প্রাপ্ত একটি তত্ত্ব অনুসারে, মুসা (আ) নিজেই ইহুদিদের একটি ছোট দলকে হেজাজ অঞ্চলে পাঠিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, ওই অঞ্চলে মহানবি মুহাম্মদের (সা) আগমন ঘটবে। তাই তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর অনুসারীদের একদল যেন মুহাম্মদের (সা) প্রতি ইমান আনে ও তাঁকে বরণ করে নেয়।

তবে এই তত্ত্বটি একটু অস্বাভাবিক বলে মনে নয়। মুসা (আ) কেন তাঁর অনুসারীদের অন্য দেশে পাঠাবেন যখন তিনি নিজেই সেই সময়ের নবি? তাঁর উম্মতদের তো নিজেদের নবির সঙ্গেই থাকার কথা। তা ছাড়া মুসা (আ) তো এও জানতেন যে তাঁর ও নবি মুহাম্মদের (সা) মধ্যবর্তী সময়ে আরও একজন নবি (ইসা) আসার কথা রয়েছে। যা-ই হোক, আল্লাহ ভালো জানেন।

আরেকটা তত্ত্ব অনুসারে, যা আগেরটার চেয়ে যুক্তিসংগত বলে মনে হয়, ইহুদিরা জেরুসালেম থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পরে তাদের একটি অংশ ইয়াসরিবে গিয়ে বসতি স্থাপন করে। সুলায়মানের (আ) রাজত্বকালে সব ইউনিই জেরুসালেমে বাস করত। সুলায়মান (আ) সেখানে একটি বিশাল টেম্পল তৈরি করেছিলেন, যা ‘সুলায়মানের টেম্পল’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তী দেড় হাজার বছরেরও বেশি সময়ে ওই রাজ্যের শক্তি ভেঙে পড়ে। খলিফা উমরের (রা) জেরুসালেম বিজয়ের আগ পর্যন্ত শহরটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠী যেমন পৌত্তলিক রোমান, খ্রিষ্টান রোমান, সাসানীয় ইত্যাদি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। এই সময়কালে জেরুসালেম থেকে ইহুদিরা দুইবার বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছিল।

ইসলামের সংখ্যাগরিষ্ঠ পণ্ডিতদের মতে, আল্লাহ তায়ালা সুরা ইসরার প্রথম নিকের আয়াতগুলোতে ইহুদিদের অতীতের দুটি বহিষ্কার ও তাদের ওপর আরোপিত দুটি শান্তির কথা উল্লেখ করেছেন। কিছু আধুনিক পণ্ডিতের মত অনুসারে, সুরা ইসরায় উল্লিখিত ঘটনাগুলো ইসলাম-পরবর্তী সময়ের, ইসলাম-পূর্ব সময়ের নয়। তবে বেশিরভাগ পণ্ডিতই বহিষ্কার দুটিকে ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বহিষ্কারের এই ঘটনাগুলো হলো:

(১) প্রথমবারের বহিষ্কারের প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য আমরা একটু অতীতে ফিরে যাই। সুলায়মানের (আ) নির্মিত বিশাল আকৃতির টেম্পলটি ছিল অত্যন্ত মনোরম। এরকম চমৎকার স্থাপত্য কাঠামো প্রাচীন বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের একটি হিসেবে বিবেচিত হতো। মানুষ এরকম কিছু আগে কখনো দেখেনি। মুসলিম হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি, সুলায়মানের (আ) পক্ষে জিনরা এসে টেম্পলটি তৈরি করেছিল। আল্লাহ তায়ালা কোরানে বলেছেন, “আমি আরও অধীন করে দিলাম জিনকে, যারা সকলেই ছিল স্থপতি ও ডুবুরি।” [৩৮:৩৭ ) জিনরা সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তা কুড়িয়ে এনেছিল, যা ওই স্থাপত্যকর্মে ব্যবহার করা হয়েছে।

সুলায়মানের টেম্পলটি ৪০০-৫০০ বছর ধরে ভালোভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল। সেটি প্রথমবারের মতো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালে নেবুচাদনেজার নামের ব্যাবিলনের এক দুরাচারী শাসকের হাতে। জেরুসালেমের পতনের পর ইহুদিরা সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে বড় বড় দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন দিকে অভিবাসী হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণেই ইহুদিরা নিজেদেরকে “বিচরণকারী জনগোষ্ঠী’ বলে অভিহিত করে থাকে। কারণ সেই সময় থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তাদের কোনো নির্দিষ্ট ভূমি ছিল না।

জানা যায়, জেরুসালেম থেকে বেশিরভাগ ইহুদি চলে গিয়েছিল ইরানে। কয়েক দশক পরে ‘সাইরাস দ্য গ্রেট’ তাদেরকে আবার জেরুসালেমে ফেরার সুযোগ করে দেন। তাদের মধ্যে অনেকে ফিরে গেলেও অনেকেই আবার ইরানে থেকে যায়। তাদের একটি বড় দল বর্তমান ইরাক অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। উমাইয়া শাসনের শুরুতে কুফা ও বাগদাদে অনেক ইহুদি বাস করত। কিছু সংখ্যক ইহুদি ইয়েমেনে গিয়ে বাস করতে শুরু করেছিল বলে জানা যায়। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, তারা দ্বিতীয় দফায় বিতাড়িত হওয়ার পরই কেবল ইয়েমেনে গিয়ে বসতি গেড়েছিল। আল্লাহ ভালো জানেন।

এই তত্ত্ব অনুসারে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮৭ সালেই ইহুদিদের একটি ছোট দল আরবের হেজাজ অঞ্চলে চলে গিয়েছিল। তবে এর সত্যতা যথেষ্ট সন্দেহজনক। কারণ তাহলে মেনে নিতে হয় যে, নবিজির (সা) জন্মের এক হাজার বছর আগে ইহুদিরা সেখানে গিয়েছিল। আমার (ইয়াসির কাদি) মতে সময়টা এত আগে হওয়ার কথা নয়।

(২) পরবর্তীকালের একজন সম্রাট’ ইহুদিদের জন্য টেম্পলটি পুনর্নির্মাণ করেন। ৭০ খ্রিষ্টাব্দে (অর্থাৎ ইসা ইবনে মরিয়মের (আ) জন্মের পরে) সম্রাট টিটুসের দ্বারা সেটাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এর ফলে ইহুদিদের দ্বিতীয়বারের মতো আভিবাসনের ঘটনা ঘটে, অর্থাৎ তারা আবারও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

(৩.১) তৃতীয় দফায় অভিবাসন ঘটে ১৩২ খ্রিষ্টাব্দে, যখন একদল ইহুদি তৎকালীন শাসক সম্রাট হেড্রিয়ানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। বিদ্রোহের জের ধরে সম্রাট হেড্রিয়ান হাজার হাজার ইহুদিকে নির্মমভাবে হত্যা করে। ফলে তারা সেখান থেকে আবার পালিয়ে যায়। কথিত আছে, এই অভিবাসনের সময় তাদের কেউ কেউ আরব অঞ্চলের দিকে চলে যায়। যাত্রাপথে তারা ইয়াসরিব নামের এক উর্বর ভূমিতে পৌঁছে, যেখানে সারি সারি খেজুর গাছ ছিল, কিন্তু লোকবসতি তেমন ছিল না। তাদের মধ্যে একটি দল এই এলাকায় থেকে যায়। আর একটি দল কাছাকাছি খায়বার অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বর্ণিত আছে, তাদের সবচেয়ে বড় দলটি ইয়েমেন পর্যন্ত পৌঁছেছিল।

প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, আরব উপদ্বীপের মধ্যে ইয়েমেনেই একসময় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ইহুদি বসবাস করত। বেশ কিছু বছর পরে ৯ম হিজরিতে নবিজি (সা) মুআদ ইবনে জাবাল নামের এক সাহাবিকে ইয়েমেনে পাঠান। তিনি তাঁকে বলেন, “তুমি আহলে কিতাবের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) দেশে যাচ্ছে।” উল্লেখ্য, আরব অঞ্চলে একমাত্র ইয়েমেনেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খ্রিষ্টানের বসবাস ছিল। আবরাহা ইয়েমেনের অংশবিশেষ জয় করার পরে সেখানে একজন নিয়োগ করে। ফলে সেখানকার অনেক লোক ‘ইস্টার্ন অর্থোডক্স খ্রিষ্টানর ধর্ম গ্রহণ করে।

 

ইয়াসরিবের জনসংখ্যা | মদিনাপর্বের ভূমিকা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

(৩.২) আরও একটি তত্ত্ব অনুসারে, ইয়াসরিবের ইহুদিরা ইয়েমেন থেকে এসেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, প্রথম তত্ত্ব অনুসারে জেরুসালেম থেকে ইহুদিরা ঘুরতে ঘুরতে কিছু সংখ্যক ইয়াসরিবে আর বেশিরভাগ ইয়েমেনে চলে যায়। দ্বিতীয় তত্ত্ব অনুসারে, ইয়েমেন থেকে ইহুদিরা ছোট ছোট দলে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে যায়। তাদের কিছু দল ইয়াসরিবে বসতি স্থাপন করে। অতএব দেখা যাচ্ছে, ইয়াসরিব ও ইয়েমেনের ইহুদিদের মধ্যে একটা সম্পর্ক ছিল।

[ আনুষঙ্গিক বিষয়: কিছু আধুনিক গবেষক ইয়াসরিবের ইহুদিদের ব্যবহৃত আরবি থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তারা ‘রাব্বিনিক জুডাইজম’ অনুসরণ করত না, অর্থাৎ তারা মূলধারার ইহুদি নয়। তারা কারাইট নামে একটি প্রাচীন সম্প্রদায় থেকে উদ্ভূত। কারাইটরা সরাসরি তাওরাত অনুসরণ করত; তারা রাবাইদের কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেছিল। ‘রাব্বিনিক জুডাইজম’ শুরু হয় ৪০০- ৫০০ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে। গবেষকদের ধারণা, মদিনার ইহুনিরা সম্রাট হেড্রিয়ান বা টিটুসের সময়ে আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৭০-১৩০ সালে জেরুসালেম থেকে বহিষ্কৃত হয়ে আরব অঞ্চলে এসেছিল। বর্তমানকালে তারা সংখ্যায় খুবই নগণ্য, বিশ্বজুড়ে সর্বসাকল্যে আনুমানিক ৪০ হাজার।]

মদিনার ইহুদিরা যেভাবে বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত ছিল (বনু কায়নুকা, বনু কুরায়জা এবং বনু নাদির) তা দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে ওই গোত্রগুলো আলাদা আলাদা অভিবাসনের অংশ হিসেবে আরবে এসেছে। এই ধারণার কারণ, ইহুদিরা সাধারণত গোত্রে বিভক্ত থাকে না। গোত্র-বিভক্তি আরব জনগোষ্ঠীর প্রবণতা। তবে হ্যাঁ, প্রাথমিক যুগে বনি ইসরাইল ১২টি গোত্রে বিভক্ত ছিল। কিন্তু তা অনেক আগের ব্যাপার। বহিষ্কারের সময় তারা ছিল একটি জাতি, একটি নৃগোষ্ঠী ।

যদি তারা একই স্থান থেকে একই সময়ে এসে থাকে তাহলে তিনটি গোত্রে ভাগ হয়ে বসবাস করছিল কেন? এমনকি বুআতের যুদ্ধ আউস ও খাজরাজদের মধ্যেকার যুদ্ধ হলেও তিনটি গোত্রের ইহুদিরাও তাতে যোগ দিয়েছিল, পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াইও করেছিল। অতএব ধারণা করা যায়, মদিনার ইহুদি গোত্রগুলো তিনটি পৃথক অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সেখানে বসতি স্থাপন করেছিল। প্রতিবার নতুন নতুন দল এসে বাস করতে শুরু করে। তবে আল্লাহই ভালো জানেন।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment