পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আমরা ইতিমধ্যে আলোচনা করেছি, আল্লাহ তায়ালা সুরা ইসরার ইসরার ঘটনা এবং সুরা নাজমে মিরাজের ঘটনার ওপর আয়াত নাজিল করেছেন। ইসরা বিষয়ে সুরা ইসরার শুরুতে মাত্র একটি আয়াতই আছে; সুরাটির বেশিরভাগ অংশেই ইহুদিদের অবাধ্যতা, বায়তুল মাকদিসের পবিত্রতা এবং শেষ সময়ে কী ঘটবে তা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

সুরা নাজমে মিরাজের বিষয়ে বেশ কয়েকটি আয়াত আছে

প্রশ্ন ১।

নবিজি (সা) কি মিরাজে আল্লাহকে দেখেছেন?

ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেছেন, নবি করিম (সা) মিরাজে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাকে দেখেছিলেন। কিন্তু সহিহ বুখারিতে আছে, আয়েশা (রা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বলে যে নবিজি (সা) আল্লাহকে দেখেছেন তিনি সম্পর্কে এক বিশাল মিথ্যাচার করছেন, কারণ আল্লাহ কোরানে বলেছেন, ‘তাঁকে তো দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না, বরং দৃষ্টিশক্তি তাঁরই অধিকারে।” [সুরা আনআম, ৬:১০৩]

সহিহ মুসলিমে আছে, সাহাবিদের অন্যতম ছাত্র মাশরুক একবার আয়েশাকে (রা) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আমাকে একটা বিষয় জিজ্ঞেস করার অনুমতি দিন, এ নিয়ে আমার ওপর রাগ করবেন না। আল্লাহ কি বলেননি, ‘সে তো তাঁকে স্বচ্ছ দিগন্তে দেখেছে’ [৮১:২৩), এবং নিশ্চয়ই সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল। [৫৩:১৩], ‘তাঁদের দুজনের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান ছিল’ [৫৩:৯]? [প্রাসঙ্গিক বিষয়: একজন সাহাবি নবিপত্নী আয়েশাকে (রা) কীভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলেন তা নিয়ে কারও মনে প্রশ্ন আসতে পারে।

উল্লেখ্য যে, নিকাব ও হিজাবের আড়াল ছাড়া আয়েশা (রা) কখনোই প্রকাশ্যে উপস্থিত হননি। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে নবিজির (সা) স্ত্রীদের সম্পর্কে বলেছেন, “তোমরা তাঁর স্ত্রীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে।’ [৩৩:৫৩] এই ক্ষেত্রেও মাশরুক জিজ্ঞেস করার সময় আয়েশা (রা) পর্দার অন্তরালে ছিলেন, যাতে তাঁর শারীরিক অবয়ব না বোঝা যায়। এমনকি তিনি যখন বাইরে বের হতেন, তখন তাঁর উটের চারদিকে একটা অতিরিক্ত আবরণ থাকত।]

মাশরুকের প্রশ্নের জবাবে আয়েশা (রা) প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছিলেন এভাবে: “তোমার কথা শুনে আমার চুল দাঁড়িয়ে গেছে। আমিই সর্বপ্রথম নবিজিকে (সা) এই তিনটি আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। এই কথাগুলো জিব্রাইলের (আ) বিষয়ে বলা হয়েছে, আল্লাহ তায়ালার বিষয়ে নয়।” তিনি আরও বলেন, “তুমি কি কোরানে পড়নি, ‘তাঁকে তো দৃষ্টিতে পাওয়া যায় না, বরং দৃষ্টিশক্তি তাঁরই অধিকারে’ [১০৩]? তুমি কি কোরানে আরও পড়নি, ‘মানুষের এমন মর্যাদা নাই যে, আল্লাহ তাঁর সাথে কথা বলবেন ওহির মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার অন্তরাল ছাড়া, এমন দূত পাঠানো ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ব্যক্ত করেন।’

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

[42:5117 এখানে দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি সম্পর্কে আয়েশার (রা) বেশ পরিষ্কার ধারণা ছিল। মাশরুক ভেবেছিলেন, তিনি আয়েশাকে (রা) কাবু করে ফেলবেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে উল্টোটাই হয়েছিল। সহিহ মুসলিমে আরও আছে, আবু জর আল-গিফারি (রা) একবার নবিজিকে (সা) সরাসরি জিজ্ঞেস করেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি কি আপনার প্রতিপালককে দেখেছেন?” জবাবে নবিজি (সা) বলেছিলেন, “সেখানে আলো ছিল; আমি কীভাবে তাঁকে দেখতে পাব?” পণ্ডিতদের মতে, এখানে আল্লাহ তায়ালার হিজাবের আলো সম্পর্কে বলা হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যায়, নবিজি (সা) এমন এক স্থানে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি ছাড়া আর কেউই ছিলেন না; এবং তিনি সেখানে আল্লাহর পর্দা বা আবরণ দেখতে পেয়েছিলেন।

সহিহ মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তায়ালার নূরের (জ্যোতির, আলোর) হিজাব রয়েছে। যদি তিনি তা উত্তোলন করতেন, তবে তাঁর মুখমণ্ডল থেকে বিচ্ছুরিত রশ্মিতে সবকিছু (সৃষ্টির প্রতিটি জিনিস) ধ্বংস হয়ে যেত।” সুতরাং ‘আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর নূর। [২৪:৩৫] তাঁর হেদায়েতও নূর। আমরা আল্লাহ তায়ালার প্রত্যেক নাম ও গুণের সত্যতা সমর্থন করি, তবে এর পেছনের কারণ অনুধাবন করার ক্ষমতা আমাদের নেই। আল্লাহর নূর এতটাই শক্তিশালী যে তা সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারে। মুসা (আ) আল্লাহ তায়ালাকে দেখার ইচ্ছা ব্যক্ত করলে আল্লাহ তাঁর পর্দা এক মুহূর্তের জন্য উঠানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো পাহাড় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। [৭:১৪3]

এই পৃথিবীতে কোনো সৃষ্টিই আল্লাহর সৌন্দর্যের সামনে টিকতে পারে না। সৃষ্টিকে তাঁর বিশালতা থেকে রক্ষার জন্য আল্লাহ তায়ালা নিজের জন্য পর্দা/আবরণ রেখেছেন। পৃথিবীতে আমরা যেসব পর্দা দেখি, এই পর্দা সে সবের মতো নয়। আল্লাহর পর্দা নূরের পর্দা। তাহলে সৃষ্টিকুল কীভাবে পরের দুনিয়ায় আল্লাহকে দেখতে পাবে? আসলে পরের দুনিয়ায় আমাদের শারীরিক অবস্থা হবে ভিন্নতর, এই দুনিয়ার মতো নয়। তা হবে এক সত্যিকারের পুনরুত্থান। তখন আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে দেখতে সক্ষম হব। এই দুনিয়ায় কেউ আল্লাহকে দেখেনি, দেখতে পাবেও না। সুতরাং ইবনে আব্বাসের বক্তব্য এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: হয় তিনি ভুল করেছেন, নয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে নবিজি (সা) আল্লাহকে মন দিয়ে দেখেছেন (দিবা দৃষ্টিতে নয়)।

 

পবিত্র কোরানে ইসরা ও মিরাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

প্রশ্ন ২:

ইসরা ও মিরাজ কি স্বপ্ন ছিল?

ইসরা ও মিরাজ কি স্বপ্ন ছিল? নাকি ছিল শারীরিকভাবে ভ্রমণ? তাবেয়িন ও তাবেয়ি-তাবেয়িনদের বিভিন্ন বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে প্রথম যুগের পণ্ডিতদের কেউ কেউ বলেছেন, তা ছিল স্বপ্ন। নবিজি (সা) বলেছেন, ‘আমি মক্কায় কাবার সামনে জেগে উঠেছিলাম।’ এই কথা থেকে তাঁরা অনুমান করে নিয়েছিলেন যে, যেহেতু তিনি জেগে উঠেছিলেন, তাহলে তা নিশ্চয়ই স্বপ্ন ছিল। তবে এই বর্ণনা এসেছে হাতেগোনা কয়েকজনের কাছ থেকে। স্পষ্টতই তাঁরা একটিমাত্র বাক্যের ওপর ভিত্তি করে পুরো ঘটনার ভুল ব্যাখ্যা করেছেন।

মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক ইসলামের পণ্ডিত-গবেষকেরা সর্বসম্মতভাবে একমত হয়েছেন যে, ইসরা ও মিরাজ শারীরিকভাবেই (দেহ ও প্রাণ সহযোগে) ঘটেছিল। নবিজি (সা) যে তখন স্বপ্ন দেখছিলেন না, বরং জাগ্রত অবস্থায় ছিলেন, তার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য প্রমাণ রয়েছে। তিনি যদি স্বপ্নই দেখে থাকেন, তাহলে তো এতে অলৌকিক কিছু নেই। কেউ যদি চাঁদে যাওয়ার কিংবা অতীতে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে, তাহলে তার মধ্যে অলৌকিক কিছু নেই।

ঘটনাটি যদি স্বপ্নই হয়ে থাকে, তবে নবিজি (সা) পরের দিন তা কুরাইশদের জানানোর সময় কেন এতটা নার্ভাস ও আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন? অধিকন্তু, তাঁকে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়ার জন্য বোরাকের মতো একটি প্রাণীর প্রয়োজন ছিল। নবিজি (সা) ফিরে আসার পথে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ায় তাঁকে পানি পান করতে হয়েছিল, এটা তাঁর জাগ্রত অবস্থা প্রমাণ করে।

আমাদের সময়ে প্রগতিশীল ও আধুনিকতাবাদী অনেকেই এসব অলৌকিক ঘটনা (যেমন: লোহিত সাগরের বিভাজন, চাঁদের বিভাজন, ইসরা ও মিরাজ ইত্যাদি) বিশ্বাস করতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন। তাঁরা অনেক সময় এগুলোকে ‘বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন, যা নিতান্তই ভুল। এগুলো ছিল মিরাকল বা অলৌকিক ঘটনা। নিঃসন্দেহে ইসরা ও মিরাজ শারীরিকভাবেই ঘটেছিল।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment