‘গাজওয়াতুল উশায়রা’ বা উপায়রার অভিযান | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

‘গাজওয়াতুল উশায়রা’ বা উপায়রার অভিযান | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি, জানা যায়, আবওয়ার অভিযানটিই ছিল মুসলিমদের প্রথম সামরিক অভিযান। এটি সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরি সালের সফর মাসের ১২ তারিখে (অর্থাৎ হিজরতের ৯-১০ মাসের মধ্যে)। নবিজি (সা) কুরাইশদের একটি কাফেলা আসার খবর পেয়ে মুসলিমদের একটি দল নিয়ে রওয়ানা দেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনী যথাসময়ে কুরাইশদের কাফেলার কাছে না পৌঁছতে পারার কারণে সে যাত্রা প্রকৃত যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি।

তবে এই অভিযানের সময় নবিজি (সা) মদিনার পাশে বনু দামরা নামের এক স্থানীয় গোত্রের সঙ্গে জোট বাঁধেন। সারিয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের পরিসীমা বৃদ্ধি করা। ওই জোট গঠনের মাধ্যমে মদিনার রাজনৈতিক সীমারেখা শহরের বাইরে আরও ১০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আমরা দেখতে পাচ্ছি একটি সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্রের সূচনা হতে চলেছে।

‘গাজওয়াতুল উশায়রা’ বা উপায়রার অভিযান | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

'গাজওয়াতুল উশায়রা' বা উপায়রার অভিযান | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

উবায়দা ইবনুল হারিসের সারিয়া

দ্বিতীয় অভিযানটিতে প্রথমবারের মতো তির ছোড়ার ঘটনা ঘটেছিল। তিরটি ছুড়েছিলেন সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস। এটিকে ‘আল্লাহর পথে প্রথম তির’ বলা হয়ে থাকে। এখানেও প্রকৃত লড়াই হয়নি। দুপক্ষের মধ্যে কিছু তির ছোড়াছুড়ি হয়েছিল বটে, তবে সেখানে কোনো রক্তপাতের ঘটনা ঘটেনি। একপর্যায়ে সেখানে একটি নিরপেক্ষ উপজাতির দল এসে পড়ার পর যুদ্ধবিরতি হয়। তারপর কুরাইশ ও মুসলিমরা যার যার পথে চলে যায়। এই সারিয়াকে উবায়দা ইবনুল হারিসের সারিয়া বলা হয় ।

পরবর্তী সময়ে ওই নিরপেক্ষ উপজাতিটি মুসলিমদের সঙ্গে একটি জোট গঠন করে। তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করলেও রাজনৈতিকভাবে ইসলামি রাষ্ট্রকে মেনে নেয়। তারা মুসলিমদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল যে তারা কুরাইশদের সমর্থন করবে না; এবং যদি কুরাইশরা আক্রমণ করতে আসে তবে তারা নবিজিকে (সা) তা অবহিত করবে।

‘গাজওয়াতুল উশায়রা’ বা উপায়রার অভিযান

যদিও এ অভিযানেও কোনো রক্তপাত হয়নি, তবু উশায়রার অভিযানটিকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অভিযান বলা যেতে পারে। কুরাইশদের সবচেয়ে বড় কাফেলাটিকে আক্রমণ করার জন্য নবিজি (সা) প্রায় ১০০-১৫০ সাহাবিকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। কুরাইশদের এই কাফেলাটি বছরে একবার সিরিয়ায় যেত। কাফেলাটিতে কমপক্ষে ৭০-৮০টি উট ছিল। বলা যেতে পারে, মক্কার পুরো সম্পদের শতকরা ৭০-৮০ ভাগই ছিল এই কাফেলার অংশ। কারণ, মক্কায় যার কাছে যে অর্থ থাকত, সে এই কাফেলায় বিনিয়োগ করত।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

এমনকি নারীরাও এতে বিনিয়োগ করত । এটিই ছিল মক্কার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। কুরাইশরা কিছু পণ্য কিনে সিরিয়ায় নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করে লাভসহ টাকা ফেরত পেত, আবার সেখান থেকে অন্য পণ্য কিনে ইয়েমেনে নিয়ে গিয়ে তা বিক্রি করে লাভসহ টাকা ফেরত পেত। এভাবেই তারা উত্তরে আর দক্ষিণে পণ্য কেনাবেচা করার মধ্য দিয়ে অর্থ উপার্জন করত। মক্কা থেকে আগত ওই বিশেষ কাফেলার নেতা ছিলেন বিখ্যাত আবু সুফিয়ান ইবনে হারব।

পাজওয়াতুল উশায়রাকে বলা যেতে পারে বদরের যুদ্ধের প্রথম ধাপ। কুরাইশদের কাফেলাটি অল্পের জন্য মুসলিম বাহিনীকে এড়িয়ে উত্তরের দিকে চলে যেতে সক্ষম হয়। নবিজি (সা) কাফেলাটিকে পাকড়াও করার জন্য আটঘাট বেঁধে পরিকল্পনা করেছিলেন। জানা যায়, কাফেলার একজন কোনোভাবে আলাদা হয়ে পিছিয়ে পড়েছিল। সে দূর থেকে মুসলিমদের আসতে দেখতে পেয়ে ছুটে গিয়ে কাফেলার কাছে খবর দেয়। ফলে আবু সুফিয়ান সচরাচর যে পথ দিয়ে যেত সে পথ পরিহার করে কাফেলা নিয়ে দ্রুত অন্য একটি পথ দিয়ে সরে পড়ে।

স্পষ্টতই এটি ছিল আল্লাহর ‘কদর’ (১)। আল্লাহ তায়ালা এমনভাবে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন যাতে আবু সুফিয়ান মুসলিমদের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ কাফেলাটির যাত্রাপথ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেয় এবং মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মূল রাস্তায় সাক্ষাৎকে এড়াতে পারে। কিন্তু আবু সুফিয়ান জানত না। যে, কাফেলাটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে গিয়ে সে কুরাইশদের জন্য আরও বড় ক্ষতির কারণ তৈরি করল। সত্যিই তো, “তারা ষড়যন্ত্র/পরিকল্পনা করল, আর আল্লাহও পরিকল্পনা করলেন। আর আল্লাহ তো শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।” [সুরা আলে ইমরান, ৩:৫৪]

 

উপায়রার অভিযান

 

নবিজি (সা) কুরাইশদের যথাস্থানে না পেয়ে ভাবলেন, ‘সম্ভবত আমরা একদিন আগেই এখানে পৌঁছেছি।’ যা-ই হোক, তিনি এরপর তাঁর দলবল নিয়ে মদিনায় ফিরে এলেন। তিনি ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি যে, আবু সুফিয়ান ইতিমধ্যে তাঁর পরিকল্পনার কথা জেনে গিয়েছে। আবু সুফিয়ান ছিল অত্যন্ত চতুর লোক। নেতৃত্বের গুণাবলি ছিল তার মজ্জাগত। সে বুঝতে পারছিল যে তার পক্ষে

সহজে মক্কায় ফিরে আসা সম্ভব হবে না। সে যাতে কাফেলা নিয়ে নিরাপদে ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে একজন দূতকে মক্কায় পাঠায়। এর ফলে কুরাইশরা একটি পুরো বাহিনী মদিনার দিকে পাঠায়। অন্যদিকে মুসলিমরা একদমই আশা করেনি যে, কুরাইশদের দিক থেকে

একটি সেনাবাহিনী এসে পড়বে। আবু সুফিয়ান অল্পবয়সী যে ছেলেটিকে মক্কায় দূত হিসেবে পাঠিয়েছিল, তাকে একটি অতিরঞ্জিত ও মিথ্যা কাহিনি শিখিয়ে দিয়েছিল। এমনকি তাকে (দূতকে) নিজের পোশাক ছিঁড়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মক্কায় হাজির হতে বলেছিল। আমরা পরবর্তী পর্বে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব। সুতরাং গাজওয়াতুল উশায়রা ছিল বদরের যুদ্ধের প্রথম ধাপ। গাজওয়াতুল উশায়রার অবস্থান ছিল মদিনা থেকে উত্তর দিকে, সিরিয়ার পথে। আর “গাজওয়াত বদর আল-কুবরা’ (বদরের প্রধান যুদ্ধ) সংঘটিত হয়েছিল মদিনা থেকে দক্ষিণ দিকে।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment