উমরের ইসলাম গ্রহণ | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

উমরের ইসলাম গ্রহণ | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট, উমরের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ সম্পর্কে একাধিক কাহিনির বর্ণনা পাওয়া যায়। এক কাহিনিতে বর্ণিত আছে, একবার উমর মদ খাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সন্ধ্যায় বের হলেন। যে বাড়িতে মক্কার যুবকরা সচরাচর মদ্যপান করত সেখানে গিয়ে কাউকে পেলেন না। তারপর অন্য একটি বাড়িতে গিয়েও কারও দেখা পেলেন না। তারপর মদ বিক্রেতার কাছে গেলেন, কিন্তু সেখানে তাকে পেলেন না।

তখন মদ্যপানের ইচ্ছা দূর করার জন্য তিনি তাওয়াফ করার কথা ভাবলেন। তাওয়াফের জন্য মধ্যরাতে কাবায় গিয়ে দেখলেন, সেখানে নবিজি (সা) একাকী বসে আছেন, আর কোনো লোকজন নেই। উমর মনে মনে ভাবলেন ‘এখনই এই ব্যক্তিকে প্রহার করার মোক্ষম সময়’। সুতরাং তিনি নবিজির (সা) পেছনে গিয়ে দাঁড়ালেন, এবং দেখলেন যে তিনি কিছু একটা পাঠ করছেন (আসলে তিনি কোরান তেলাওয়াত করছিলেন)। উমর এর আগে কখনও ভালোভাবে মনোযোগ দিয়ে কোরান তেলাওয়াত শোনেননি। তিনি আর না এগিয়ে নবিজির (সা) কণ্ঠে কোরান পাঠ শুনতে লাগলেন। নবিজি (সা) জানতেন না যে উমর তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। মুসনাদ ইমাম আহমদে উমরের (রা) জবানিতে এই কাহিনি বর্ণনা রয়েছে।

 

উমরের ইসলাম গ্রহণ | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

উমরের ইসলাম গ্রহণ | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

নবিজি (সা) তখন সেখানে সুরা আল হাককা তেলাওয়াত করছিলেন। সুরাটির বাক্যবিন্যাস, তাল এবং মাধুর্যে উমর (রা) মুগ্ধ হয়ে গেলেন। তিনি ভাবতে লাগলেন: ‘এটা কোথা থেকে এসেছে? কুরাইশরা যেমন বলছে, এটা তেমনি কোনো এক কবির রচনা হবে হয়তো। উমরের মনে এই ভাবনা আসতে না আসতেই নবিজি (সা) সুরা থেকে এই আয়াতটি তেলাওয়াত করলেন: “এ কোনো কবির রচনা নয়; যদিও তোমরা অল্পই তা বিশ্বাস কর।” (182)

উমরের ভাবনাঃ এটা নিশ্চয়ই একজন গণক কিংবা জ্যোতিষীর কথা। নবিজির (সা) তেলাওয়াত। এ কোনো গণকের কথা নয়। যদিও তোমরা অল্পই সে উপদেশ গ্রহণ করো। [৬৯:৪২]

উমরের ভাবনাঃ তাহলে এটা কী?

নবিজির (সা) তেলাওয়াত। এটা বিশ্বজগতের প্রতিপালকের কাছ থেকে অবতীর্ণ। [৬৯৪৩] উমরের ভাবনা। আর যদি তিনি (মুহাম্মদ) এটি উদ্ভাবন করে থাকেন? নবিজির (সা) তেলাওয়াত: সে (মুহাম্মদ) যদি তাঁর নিজের কিছু কথা আমার বলে চালিয়ে দিত, তাহলে আমি তাঁর ডানহাত সংবরণ করতাম। 16:88-821 নবিজি (সা) শেষ না করা পর্যন্ত উমর পুরো সুরাটিই শুনলেন।

এর দিন কয়েক পরে উমর কিছু লোকের সাথে বসে গল্পগুজব করছিলেন। সেখানে আবু জেহেল নবিজি (সা) সম্পর্কে তিরস্কার করে বলল, “এই ব্যক্তির চেয়ে বেশি অন্য কেউ আমাদের পিতৃপুরুষদের ও দেবতাদের অপমান করেনি। সে আমাদের ধর্মকে গালমন্দ করেছে। সে বলেছে যে, কেউ যদি প্রতিমাপূজা করে, তবে তাকে নরকে শাস্তি দেওয়া হবে। সে আমাদের পূর্বপুরুষদের নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করেছে। কে আমাদের এই লোকটির হাত থেকে মুক্তি দেবে? আল্লাহর কসম, কেউ যদি তা করতে সমর্থ হয়, তাহলে আমি তাকে ১০০টি উট পুরস্কার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। এর সাথে আমি আরও ১০০টি ‘উকিয়া’ (রুপার থলি) যোগ করব।” আবু জেহেলের এই ঘোষণা শুনে উমর ভাবলেন, ‘এ তো এক বিশাল পরিমাণ অর্থ। আমি এই কাজ করব।’

যেই ভাবা, সেই কাজ। উমর দ্রুত বাড়ি ফিরে গিয়ে তাঁর তলোয়ার বের করে নবিজির (সা) বাড়ির দিকে ছুটলেন। ইবনে ইসহাক ও অন্য আরও কিছু বর্ণনায় আছে, পথিমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাপার তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট আরবিতে এক অতিপ্রাকৃত কন্ঠস্বর শুনতে পেলেন, “এ তুমি কী করছো? এই লোকটি তো শুধু বলেছেন যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্য নেই!”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

প্রথমে উমর এসব ভাবনা অগ্রাহ্য করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি নুয়ায়েম ইবনে আবদিল্লাহ আল-নাহামের (যিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন) বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নুয়ায়েম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন? কী হয়েছে?” উমর: যথেষ্ট হয়েছে! আমাদেরকে অনেক গালমন্দ করা হয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের ঠাট্টা-তামাশা করা হয়েছে। আমি মুহাম্মদকে হত্যা করতে যাচ্ছি। নুয়ায়েম (কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে); আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? আপনি কি সত্যিই মনে করেন, বনু আবদ মানাফ তাদের একজনকে হত্যা করার পরে আপনাকে জীবিত রাখবে? আপনি যদি সত্যিই কিছু করতে চান, তাহলে আপনার নিজের পরিবারকে আগে ঠিক করুন।

উমর (হতবাক হয়ে): তুমি কী বলতে চাচ্ছ?

নুয়ায়েম: আপনি কি জানেন না যে আপনার নিজের বোন ও ভগ্নিপতি ইসলাম গ্রহণ করেছে? নুয়ায়েম ভাবলেন, ‘আগে তো আমি নবিজির (সা) বাসার দিকে যাওয়া থেকে উমরকে ফেরাই। সে নিশ্চয়ই তাঁর নিজের বোনের কোনে ক্ষতি করবে না।’ এটা ছিল উমরের জন্য চরম অবমাননাকর।

উমর (আরও রেগে গিয়ে): কী? আমার পরিবার ইসলাম গ্রহণ হয়েছে? এবার তিনি ক্রোধে উন্নত হয়ে তাঁর বোনের বাড়ির দিকে রওনা হলেন।

[আনুষঙ্গিক বিষয়: নতুন কেউ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে নবিজি (সা) তাঁর জন্য পুরানোদের মধ্য থেকে একজনকে শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করতেন। নবিজি (সা) নবদীক্ষিত মুসলিমদের জন্য কীভাবে নামাজ পড়তে হবে, রোজা রাখতে হবে, কোরান তেলাওয়াত করতে হবে ইত্যাদি শেখানোর জন্য কর্মসূচি চালু করেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সেই কঠিন সময়েও ইসলামে শিক্ষার বিষয়টি ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ । অথচ আমাদের সময়ে কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে তাঁর ইসলামি জ্ঞান বাড়ানোর জন্য আমরা তেমন কিছুই করি না। আমরা কেবল তাকে অভ্যর্থনা ও অভিনন্দন জানিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ করি। নতুন মুসলিম ভাই বা বোনের পরবর্তী সময়ে কোনো কিছুর দরকার হলো কি না, সে খবর আর রাখি না।

উমরের বোন ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাবকে নতুন ধর্মে দীক্ষিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল খাবাব ইবনুল আরাতকে। ফাতেমার স্বামী সাইদ ইবনে জায়েদ ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদ পাওয়া দশজন সাহাবির মধ্যে একজন। তাঁর বাবা জায়েদ ইবনে আমর ইবনে নুফায়েল ছিলেন হুনাফাদের একজন; নবিজি (সা) যাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন দুটি উদ্যানসহ এক উম্মাহ ।]

আবার উমরের ইসলাম গ্রহণের কাহিনিতে ফিরে আসি। ফাতেমার বাড়ির দরজার কাছে আসতেই তিনি ভেতর থেকে কোরানের তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলেন। কিছুক্ষণ পর তিনি দরজায় কড়া নাড়লে শব্দ পেয়ে খাবার ভয়ে আলমারির আড়ালে লুকালেন। আর ফাতেমা সহিফাটি (পাথর কিংবা ট্যাবলেট যার উপরে কোরানের আয়াতগুলো লেখা ছিল) তাঁর কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখলেন।

ফাতেমা। ভেতরে আসুন। দিনের এই সময়ে আপনি এখানে কী করছেন? উমর: কীসের শব্দ শুনতে পেলাম? তোমরা কি কিছু পড়ছিলে?

ফাতেমা। না, আপনি কিছু শোনেননি ।

উমর: আল্লাহর কসম, আমি যা শুনেছি তা আমি জানি। আমার ধারণা যে তোমরা দুজনেই ইসলাম গ্রহণ করেছ।

 

উমরের ইসলাম গ্রহণ | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

প্রথমে তাঁরা দুজনেই ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করলেন। উমর তো ইতিমধ্যেই রেগে আছে। তিনি সাইদকে ঘুষি দিতে উদ্যত হলে ফাতেমা তাঁদের দুজনের মাঝে এসে দাঁড়ালেন। ফলে উমরের মুক্তির আঘাত সাইদের পরিবর্তে ফাতেমার ওপর লেগে তাঁর গা থেকে রক্ত বের হয়ে পড়ল। ঘটনার এ পর্যায়ে ফাতেমা ও সাইদ উভয়েই কিছুটা ক্ষোভের সাথেই সত্য কথাটি বলে ফেললেন: “হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং নবি করিমের (সা) প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি। আপনি এখন যা খুশি তা করতে পারেন।”

মাত্রই আবু জেহেল সজোরে দরজা বন্ধ করে দিয়ে বলল, “আল্লাহর অভিশাপ তোমার এবং তুমি যা কিছু নিয়ে এসেছ তার ওপর বর্ষিত হোক।” এরপর উমর (রা) কুরাইশদের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার কথা ভাবলেন। এ জন্য তিনি খোঁজ করলেন, গুজব ছড়ানো বা কোনো কথা প্রচার করার ক্ষেত্রে মক্কায় কে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। কেউ একজন তাঁকে জামিল ইবনে মামার আল-জুমাহির নাম বলল।

সুতরাং উমর (রা) জামিলের কাছে গিয়ে বললেন, “তুমি কি জান যে আমার কাছে এক গোপন খবর আছে? আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আমি এখন মুহাম্মদের (সা) ধর্ম অনুসরণ করছি।” এ কথা শোনামাত্র জামিল কোনোমতে গায়ে একটি কাপড় চাপিয়ে বাইরে ছুটে গেলেন। আসলে তিনি এই খবরটা সবাইকে জানাতে চাইলেন। তাই তিনি কাবায় পৌঁছার আগেই মক্কার রাজপথে চিৎকার করে বলতে শুরু করলেন, “হে মক্কাবাসী! হে কুরাইশগণ! উমর ইবনুল খাত্তাব ‘সাবাত্ম হয়ে গেছে।” উল্লেখ্য, সেই সময় আরবে সাবিয়ান নামে আর একটি ধর্ম প্রচলিত ছিল। কেউ ইসলাম গ্রহণ করলে মক্কার পৌত্তলিকরা তাকে সাবাআ বা সাবিয়ান বলে অভিহিত করত। উমর (রা) জামিলকে ডেকে এনে সংশোধন করে দিয়ে বললেন, “আসলামতু (অর্থাৎ আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি)।”

উমর ইবনুল খাত্তাব ইসলামের জন্য অনেক সুফল বয়ে নিয়ে এসেছিলেন। সহিহ বুখারিতে এ বিষয়ে বর্ণনা আছে। একটি বর্ণনা অনুসারে, নবিজি (সা) বলেছেন, “তোমাদের আগে এমন অনেক মানুষ ছিল যাদের সঙ্গে ফেরেশতাদের যোগাযোগ হলেও তারা নবি ছিল না। যদি আমার উম্মতদের মধ্যে এ রকম কেউ থাকে তবে সে উমর।” ইসলামে উমরের (সা) অবদান বোঝার জন্য তাঁর খেলাফতের ইতিহাসই যথেষ্ট। আবু বকর (রা) আরবে ইসলামকে সুদৃঢ় করেছিলেন এবং উমর (রা) তাঁর খেলাফতকালে ইসলামি ভূখণ্ড চারগুণ পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

আরো পড়ূনঃ

Leave a Comment