উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সাদ ইবনে মুআদের ইসলাম গ্রহণ | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সাদ ইবনে মুআদের ইসলাম গ্রহণ | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার, ইয়াসরিবে মুসলিমদের সংখ্যা বাড়তে বাড়তে একসময় এমন কোনো এলাকা রইল না, যেখানে এক বা একাধিক পরিবার ইসলাম গ্রহণ করেনি। মূলত দুজন ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমেই সেখানে ব্যাপক সংখ্যক ধর্মান্তরের সূচনা হয়। তাঁরা হলেন উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সান ইবনে মুআন, উভয়েই আউস গোত্রের সদস্য। তাঁরা বুঝতের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট নেতৃত্বের শূন্যতা থেকে নতুন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন।

উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সাদ ইবনে মুআদের ইসলাম গ্রহণ | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সাদ ইবনে মুআদের ইসলাম গ্রহণ | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

উসায়েল ও সান ছিলেন পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁদের মধ্যে একদিন কথা হচ্ছিল। সাদ বললেন, “আমাদের শহরে কী এক নতুন ধর্ম এসেছে। আমার কাজিন আসাদ এক ব্যক্তিকে (মুসআব) তাঁর বাড়িতে থাকতে দিয়েছেন, ে ব্যক্তি এই নতুন ধর্ম প্রচার করছেন। আসাদ আমার কাজিন, তাই আমি বেশ বিব্রত বোধ করছি। তুমি কি গিয়ে লোকটাকে (মুসআব) শহর থেকে বের করে দেবে?” বন্ধুর অনুরোধে উসায়েদ তাঁর বর্ণা নিয়ে আসাদের বাড়ি গেলেন। আসাম তাঁকে মুসআবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, “হে মুসআব। ইনি আমাদের খাজরাজের নেতাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান।”

উসায়েদ মুসআবকে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, “আপনি কেন আমাদের দেশে এসেছেন? আমাদের অল্প বুদ্ধির লোকদের মগজধোলাই করতে? আমাদের নারী ও শিশুদেরকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দিতে? আপনার ওই নতুন নবির দীক্ষায় দীক্ষিত করতে? আপনার যদি জীবনের মায়া থাকে, তাহলে যেখান থেকে এসেছেন সেখানে ফিরে যান। “

মুসআব বললেন, “আপনি সুস্থির হয়ে বসে আমার কথাগুলো শুনুন। আপনি রাজি থাকলে ভালো; রাজি না থাকলে আমি চলে যাব।” লক্ষ করুন, মুসআব শান্তভাবে ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিলেন যা কেবল মজবুত ও পরিপুর্ণ ইমান থাকলেই সম্ভব। তাঁর অনুরোধ উসায়েদের কাছে অত্যন্ত যুক্তিসংগত বলে মনে হলো, উসায়েদ বসে পড়লেন এবার মুসআব তাঁকে ইসলামের মূল মর্মবাণী শোনালেন।

উসায়েদের মনে তৎক্ষণাৎ নতুন ধর্মটি সম্পর্কে আগ্রহ জাগল; তিনি বললেন, “আপনি যা বলেছেন তা সম্পূর্ণভাবে যৌক্তিক মনে হচ্ছে। এখন আমি কীভাবে এই ধর্ম গ্রহণ করতে পারি তা আমাকে বলে দিন। ” যে ব্যক্তি বর্শা নিয়ে এসেছিলেন ইসলামের বাণী প্রচারকারী মুসআবকে খুন করতে, সেই উসায়েদ মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করলেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

সুবহানআল্লাহ! মুসআব উসায়েদকে বললেন, “আপনি প্রথমে গোসল করে আসুন। তারপর “শাহাদাহ” পড়ে দুই রাকাত নামাজ পড়ুন।” উসায়েদ তা-ই করলেন। তারপর তিনি মুসআবকে বললেন, “যে ব্যক্তি (সাদ ইবনে মুআদ) আমাকে এখানে পাঠিয়েছে, আপনি যদি তাঁকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে এ বিষয়ে ( ইসলাম গ্রহণে) রাজি করাতে পারেন, তাহলে এখানে আপনার বিরোধিতা করার আর কেউ থাকবে না।”

মুসআব বললেন, “আপনি গিয়ে তাঁকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিন । উসায়েদ সাদের কাছে ফিরে গেলেন। সাদ তখন বন্ধুদের সঙ্গে বসে ছিলেন। উসায়েদকে দেখে তিনি তাঁর বন্ধুদের বললেন, “যে লোক আমাদের ছেড়ে গিয়েছিল, এ তো সেই লোক নয় (অর্থাৎ তাঁর কিছু একটা হয়েছে)।” তিনি উসায়েদকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি সফল হয়েছে?” জবাবে উসায়েদ বললেন, “আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু… তুমি একবার চেষ্টা করে দেখো না?” আসলে তিনি সানকে মুসআবের কাছে পাঠানোর চেষ্টা করছিলেন।

তিনি তাকে একটু উসকে দিতে এবং বিষয়টির গুরুত্ব বোঝাতে আরও বললেন, “আমি শুনলাম, আসাদ ওই লোকটাকে থাকার জায়গা দিয়েছেন বলে অমুক অমুক গোত্রের লোকজন তাকে (আসাদকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”

এবার সাদ কিছুটা উত্তেজিত হয়ে অস্ত্র নিয়ে সোজা আসাদের বাড়ি গিয়ে তাঁকে বললেন, “হে আসাদ! যদি তুমি আমার কাজিন না হতে তাহলে এই অস্ত্রগুলো আমার পাশে ঝোলানো থাকত না (অর্থাৎ এগুলো দিয়ে তোমাকে শেষ করে দিতাম)। আমাদের রক্তের সম্পর্কের কারণেই আমি বেশি কিছু করছি না। তুমি যত তাড়াতাড়ি পার তোমার অতিথিকে বিদায় করো। আমাদের শহরের পরিবেশ আর দূষিত না করে তাঁকে এখান থেকে চলে যেতে বলো।”

মুসআব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আমার কথাগুলো অন্তত শুনুন। আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে ভালো। না হলে আমার আর কিছু বলার থাকবে না (অর্থাৎ আমি চলে যাব)।” নিজের ও ইসলামের ওপর মুসআবের আস্থার দৃঢ়তা লক্ষ করুন। এবারও একই ঘটনা ঘটল। মুসআবের শান্ত ভঙ্গিমা ও আত্মবিশ্বাস সাদকে ভাবিয়ে তুলল। সাদ বললেন, “ঠিক আছে, তোমার কথা মেনে নিচ্ছি।”

 

উসায়েদ ইবনে হুদায়ের ও সাদ ইবনে মুআদের ইসলাম গ্রহণ | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

এইবার মুসআব পবিত্র কোরানের সুরা জুখরুফ থেকে কিছু অংশ তেলাওয়াত করে সাদকে শোনালেন। সাদ তেলাওয়াত শুনে সম্পূর্ণভাবে বদলে গেলেন। তিনি বললেন, “আমি কীভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে পারি?” এভাবেই সাদ ইবনে মুআদও ইসলাম গ্রহণ করলেন। এই দুজন ইসলাম গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে খাজরাজ উপজাতির একটি পুরো গোত্র “বনু আবদ আল-আশাল’ ইসলামের পতাকাতলে চলে আসে। কারণ এই দুজনই ছিলেন ওই গোত্রের নেতা। ওই সময় পর্যন্ত গণহারে ইসলাম গ্রহণের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল এটাই।

[আনুসঙ্গিক বিষয়: সহিহ বুখারির হাদিসে আছে, উসায়েদ ইবনে হুদায়ের যখনই কোরান তেলাওয়াত করতেন, তখনই তিনি দেখতে পেতেন যে ফেরেশতারা তা শোনার জন্য পৃথিবীতে নেমে এসেছে। তিনি দেখতেন, প্রতিদিনই ফজরের পর কিছু আলো নেমে আসে। তা দেখে তিনি নবিজির (সা) কাছে গিয়ে বললেন, “যখনই আমি তেলাওয়াত করি, তখনই এসব আলো দেখতে পাই।

আলো দেখে আমার প্রাণীগুলো উত্তেজিত হয়ে পড়ে। আসলে কী ঘটছে তা নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি।” নবিজি (সা) শুনে বললেন, “এগুলো আর-রহমানের কাছ থেকে আসা শাস্তি (ফেরেশতা) যারা তোমার কোরান তেলাওয়াত শোনার জন্য এসেছে।” অন্যদিকে সাদ ইবনে মুআদ হলেন সেই ব্যক্তি যাঁর সম্পর্কে একটি বিখ্যাত হাদিসে উল্লেখ আছে, তাঁর মৃত্যুর সময় (যখন তাকে কেউ একজন হত্যা করেছিল) আল্লাহর আরশ ক্রোধে কেঁপে উঠেছিল। সাদের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আমরা পরের একটি পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করব।]

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment