খাদিজার রা সঙ্গে পরিচয় | খাদিজার (রা) সঙ্গে বিয়ে এবং কাবা পুনর্নির্মাণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

খাদিজার রা সঙ্গে পরিচয় | খাদিজার (রা) সঙ্গে বিয়ে এবং কাবা পুনর্নির্মাণ, নবুয়তের আগে মহানবি মুহাম্মদের (সা) জীবনের ঘটে যাওয়া আরও দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আমরা আলোচনা করব। প্রথম ঘটনাটি হলো খাদিজা বিনতে খুওয়ালিদের (রা) সঙ্গে মুহাম্মদের (সা) বিয়ে। এটা কীভাবে ঘটেছিল?

 

খাদিজার রা সঙ্গে পরিচয় | খাদিজার (রা) সঙ্গে বিয়ে এবং কাবা পুনর্নির্মাণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

খাদিজার রা সঙ্গে পরিচয় | খাদিজার (রা) সঙ্গে বিয়ে এবং কাবা পুনর্নির্মাণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

খাদিজার (রা) সঙ্গে পরিচয় আগেই উল্লেখ করেছি, নবি করিম (সা) প্রথম জীবনে পেশায় একজন রাখাল ছিলেন। তিনি মজুরির বিনিময়ে মক্কা বা তার আশেপাশের অঞ্চলের মানুষদের মেষপালনের কাজ করতেন। খাদিজা বিনতে খুওয়ালিদের (রা) বড় বোনের বেশ কিছু উট ছিল। তিনি সেগুলোকে মক্কার বাইরে নিয়ে গিয়ে চরানো ও যত্ন নেওয়ার জন্য মুহাম্মদ (সা) ও আরেক যুবককে নিয়োগ করেন। তারপর উট চরানো শেষ হলে তাঁরা শহরে ফিরে এলে সহকর্মী যুবকটি নবিজিকে (সা) বলল, “আমাদের কাজ যেহেতু শেষ হয়েছে, তাই চলুন আমরা উটগুলোর মালিকের কাছ থেকে আমাদের মজুরি নিয়ে আসি।” জবাবে নবিজি (সা) বললেন, “আপনি আমার পক্ষ থেকে যান, কারণ আমি যেতে খুব লজ্জা ও সংকোচ বোধ করছি।”

যা-ই হোক, যুবকটি দুজনের মজুরি আনতে খাদিজার (রা) বোনের কাছে গেল। ঘটনাক্রমে খাদিজা (রা) সেই সময় ওই বাড়িতে ছিলেন। তিনি (খাদিজা) যুবকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “মুহাম্মদ (সা) কোথায়?” জবাবে যুবক বলল, “সে এখানে এসে মজুরি চাইতে খুব লজ্জা ও সংকোচ বোধ করছিল।” তখন খাদিজার (রা) বড় বোন বললেন, “আমি মুহাম্মদের (সা) চেয়ে লাজুক, বিনয়ী, মার্জিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি কখনও দেখিনি।” বর্ণিত আছে, খাদিজা (রা) এভাবেই প্রথমবারের মতো মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে জানতে পারেন; বোনের থেকে শোনা প্রসংসাসূচক কথাগুলো তাঁর মনের গভীরে প্রবেশ করে।

ঘটনাক্রমে ওই বছরেরই শেষের দিকে খাদিজাকে (রা) তাঁর নিজের বাণিজ্য কাফেলা সিরিয়ায় পাঠানোর পরিকল্পনা করছিলেন। খাদিজা (রা) অনেক ধনসম্পদের মালিক ছিলেন। তিনি দুইবার বিয়ে করেছিলেন। তাঁর প্রথম স্বামীর ঔরসজাত এক পুত্রসন্তান ছিল। তাঁর দ্বিতীয় স্বামী ছিলেন একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, কিন্তু তাঁদের দুজনের কোনো সন্তানাদি ছিল না। জাহেলি যুগে নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে কোনো সম্পদ পেত না। কিন্তু খাদিজার (রা) দ্বিতীয় স্বামী যেহেতু কোনো পুত্রসন্তান রেখে যাননি এবং তাঁর কোনো ভাইবোনও ছিল না, তাই খাদিজা (রা) উত্তরাধিকার সূত্রে স্বামীর সব সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। এ রকম ঘটনা সচরাচর ঘটত না।

খাদিজা (রা) পরবর্তী কয়েক বছর ধরে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেন। তাঁর ব্যাবসার ধরন ছিল এ রকম: তিনি হজের সময় মক্কায় কিছু পণ্য কিনে সিরিয়ায় পাঠিয়ে বিক্রি করতেন, সিরিয়া থেকে অন্য কিছু পণ্য কিনে তা ইয়েমেনে বিক্রি করতেন, তারপর ইয়েমেনে আরও কিছু পণ্য কিনে মক্কায় এনে তা বিক্রি করতেন। তবে তিনি নারী হওয়ায় নিজে কাফেলার সঙ্গে সিরিয়া কিংবা ইয়েমেনে যেতেন না। এ জন্য তাঁকে একজন ব্যবসায়িক অংশীদার নিতে হতো।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

তখনকার দিনে এই কাজে কাউকে মজুরির বিনিময়ে নিয়োগ করার প্রচলন ছিল না। অংশীদারি পদ্ধতিতে লভ্যাংশ ভাগাভাগি করা হতো। উদাহরণস্বরূপ, ‘৩০ শতাংশ লাভ আপনার, ৭০ শতাংশ আমার’—ঠিক ইসলামি ব্যাংকিং-এর মুদারাবা পদ্ধতির মতো। তবে খাদিজা (রা) যে লোকদের ব্যবসার অংশীদার হিসেবে নিচ্ছিলেন। তারা তাঁর আত্মীয় ছিল না বলে তাঁর স্বার্থটা মোটেই দেখছিল না। তারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে প্রতারণা করছিল। ফলে তিনি প্রাপ্য লভ্যাংশ পুরোপুরি পাচ্ছিলেন না; ব্যবসার যতটা প্রসার করা সম্ভব ছিল ততটা করতে পারছিলেন না।

এ রকম পরিস্থিতিতে খাদিজা (রা) যখন নবিজির (সা) সততা সম্পর্কে শুনলেন, তখন সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাঁকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এখানে উল্লেখ্য, ব্যবসা পরিচালনায় মুহাম্মদ (সা) ছিলেন একেবারেই অনভিজ্ঞ। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৪-২৫ বছর; আগে কখনও কোনো ব্যবসায়িক যাননি। তবু শুধু তাঁর সততার কারণে (রা) তাঁর অভিজ্ঞতার অভাবকে উপেক্ষা করেন। কোনো পুরুষ যখন নারীদের সঙ্গে আচরণে মার্জিত হয়, তখন স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া যায় যে সে অন্য ক্ষেত্রেও ভদ্র ও সৎ স্বভাবের হবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে খাদিজা (রা), যিনি সেই সময় মক্কার সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে খ্যাতিমান ছিলেন, তাঁর এক পরিচারকের মাধ্যমে নবিজিকে (সা) কাফেলা পরিচালনা করার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে খবর পাঠান।

তৎকালীন আরবে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা প্রায় সকলেই বিবাহিত ছিল; তাদের অবিবাহিত থাকা ছিল সেই সময়ে বিরল ঘটনা। খাদিজা (রা) প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক ছিলেন বলে অনেক পুরুষই তাঁকে বিবাহ করতে ইচ্ছুক ছিল; কারণ জাহেলি আইন অনুসারে স্বামীরা আপনা আপনিই বা অটোমেটিকভাবে স্ত্রীদের ধনসম্পদের অধিকারী হয়ে যেত। কিন্তু খাদিজা (রা) তাদের সবাইকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

খাদিজার (রা) কাছ থেকে বার্তা পেয়ে নবিজি (সা) তাঁর চাচা আবু তালিবের কাছে এ বিষয়ে পরামর্শ চাইলেন, “হে আমার চাচা। খাদিজা আমাকে তাঁর ব্যবসায় কাজ করার জন্য খবর পাঠিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?” এ থেকে বোঝা যায়, মুহাম্মদ (সা) তাঁর গুরুজনদের ভক্তি-শ্রদ্ধা করতেন। তিনি কাজের প্রস্তাব পেয়েই তৎক্ষণাত ‘হ্যাঁ’ বলেননি, বরং তাঁর চাচার সঙ্গে পরামর্শ করছেন: বলা যেতে পারে, চাচার অনুমতি চেয়েছেন।

আবু তালিব জবাবে বলেন, “হে আমার ভাতিজা! তিনি অত্র অঞ্চলের সবচেয়ে ধনী নারী হিসেবে পরিচিত। আল্লাহ তোমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন। তাঁকে না বোলো না।” আবু তালিবের উপদেশ পাওয়ার পর নবিজি (সা) খাদিজার (রা) কাফেলা পরিচালনা করার প্রস্তাবে রাজি হন। খাদিজা (রা) তাঁকে ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত লাভের ৫০ শতাংশ দিতে সম্মত হন, কারণ তিনি ভেবেছিলেন যে এতে তিনি কাজে আরও বেশি উদ্যমী হবেন। যা-ই হোক, নবিজি (সা) খাদিজার (রা) দেওয়া ব্যবসায়িক প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন এবং প্রথম সফর হিসেবে একটি কাফেলা নিয়ে বোসরা শহরে যান। [এটি কিন্তু ইরাকের বসরা বা তুরস্কের বুসরা শহর নয়।] এই সফরে খাদিজা (রা) মায়সারা নামের তাঁর এক পরিচারককে কাফেলার সঙ্গে পাঠিয়েছিলেন।

বোসরা দামেস্ক থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের একটি ছোট্ট শহর। পণ্য বেচাকেনার জন্য এই শহরটি আরবদের কাছে ভৌগোলিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে হওয়ায় বেশ পরিচিতি পেয়েছিল। বোসরার বাজারটি ছিল বেশ বড়। ইয়েমেনি ও মিশরীয় ছাড়াও আশেপাশের অঞ্চলগুলোর বহু মানুষ সেখানে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে যেত। ফলে এটি অর্থনৈতিক লেনদেনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিতি পায়। এত বছর পর আজও ওই বাজারের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, উমর (রা) পরবর্তী সময়ে বোসরা শহর জয় করেছিলেন। তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা বিশ্বের। প্রাচীনতম মসজিদগুলোর মধ্যে একটি।

 

খাদিজার রা সঙ্গে পরিচয় | খাদিজার (রা) সঙ্গে বিয়ে এবং কাবা পুনর্নির্মাণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

কাফেলাটি মক্কায় ফিরে এলে খাদিজা (রা) মায়সারার কাছ থেকে সফরের খুঁটিনাটি শোনেন। মুহাম্মদ (সা) যে কতটা কর্তব্যপরায়ণতার সঙ্গে কাফেলার তদারকি করেছেন এবং সততার সঙ্গে ব্যবসার লেনদেন করেছেন, তিনি জানতে পারেন। বর্ণিত আছে, সফরের পুরোটা সময় নবিজিকে (সা) একখণ্ড মেঘ সব সময় ছায়া দিয়ে রাখত। নিঃসন্দেহে আল্লাহ ইচ্ছা করলে এমনটি ঘটতেই পারে। তবে এর কোনো প্রামাণিক বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই মহানবির (সা) জীবনের নবুয়তপূর্ব অধ্যায়ের কোনো অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করার সময় আমাদের কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

খাদিজা (রা) হিসেব করে দেখলেন, আগের যে কোনো কাফেলার তুলনায় মুহাম্মদের (সা) এই কাফেলায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভ হয়েছে। এ জন্য অবশ্যই দুটি কারণ উল্লেখ করা যায়: (১) এবারের কাফেলার নেতা (মুহাম্মদ) ছিলে একজন সৎ ব্যক্তি; এবং (২) তিনি যা কিছু করতেন তাতেই আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বরকত থাকত। তিনি যখন ছোটবেলায় হালিমার সঙ্গে ছিলেন, তখনও সেখানে সবকিছুতেই বরকত ছিল। অতএব এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, নবিজি (সা) যা-ই করছেন তাতেই বেশি বেশি নেয়ামত ছিল।

প্রথম সফরেই এতটা সততা ও সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে নবিজি (সা) সম্পর্কে খাদিজার (রা) মনে ভালো ধারণা জন্ম নিয়েছিল। এই ধারণার সঙ্গে তাঁর মনে এক ধরনের আবেগও সৃষ্টি হয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই ধরনের আবেগ-অনুভূতিতে দোষের কিছু নেই। খাদিজা (রা) ছিলেন একজন ‘সিঙ্গেল’ (অবিবাহিত) ভদ্রমহিলা এবং মুহাম্মদ (সা) ছিলেন একজন প্রাপ্তবয়স্ক ও যোগ্য ‘ব্যাচেলর’ (অবিবাহিত পুরুষ)।

প্রেমে পড়া হারাম কিছু নয়; একটি স্বাভাবিক অনুভূতির ব্যাপার। কিন্তু প্রেমে পড়ার পরের ব্যক্তির আচরণ হালাল বা হারামের দিকে যেতে পারে। খাদিজার (রা) ক্ষেত্রে যা হলো তা এই যে তিনি নিজের বোনের মুখে মুহাম্মদের (সা) অনেক প্রশংসা শুনলেন, তারপর তিনি তাঁর সততার পরিচয় পেলেন, সবশেষে তাঁর কাজের মধ্যেও বরকত দেখতে পেলেন। তাই এখন যদি তাঁর মনের মধ্যে ব্যক্তি মুহাম্মদকে (সা) বিয়ে করার ইচ্ছা জাগে, তাতে তো দোষের কিছু নেই। আসলে এরকম একজন সৎ ও যোগ্য পুরুষ মানুষকে যে কোনো ভদ্রমহিলাই বিয়ে করার ইচ্ছা পোষণ করতে পারে; সেটাই স্বাভাবিক।

আরো পড়ুনঃ

 

Leave a Comment