মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ-২ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ, মহানবি মুহাম্মদের (সা) অনেক অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি ছিল। সে সবের মধ্যে শিষ্টাচার, ধৈর্য, করুণা, বিচারবোধ, মমত্ববোধ, যত্নশীলতা, নিরহঙ্করতা, বিনয়, সহজ-সরল জীবনযাত্রা, রসিকতাবোধ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

 

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ-২ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ-২ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

একবার উমর ইবনুল খাত্তাব (রা) মসজিদে প্রবেশ করে দেখলেন নবিজি (সা) তাঁর ছোট্ট কামরাটিতে শুয়ে আছেন। তিনি কামরার ভেতরে গিয়ে দেখতে পেলেন, সেখানে খেজুর গাছের শাখা দিয়ে তৈরি একটি ছোট বিছানা ও একটি পানির জগ ছাড়া আর কিছুই নেই। নবিজি (সা) তাঁকে বসতে দিলেন। তাঁর গায়ে খেজুর শাখাগুলোর কারণে সৃষ্ট রক্তাভ ক্ষত দেখে (রা) কাঁদতে শুরু করলেন। ঘটনাটা এমন এক সময়ের, যখন নবিজি (সা) আরব ভূখণ্ডের এক বিরাট অংশের অবিসংবাদিত নেতা।

উমর (রা) কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! আমরা আপনাকে এইভাবে জীবন কাটাতে দিতে পারি না। দেখুন, রোম ও পারস্য সাম্রাজ্যের সম্রাটেরা কীভাবে আরাম-আয়েশের মধ্যে জীবন-যাপন করে। নিশ্চয়ই এর চেয়ে আরও ভালোভাবে জীবন কাটানো আপনার প্রাপ্য।” জবাবে নবিজি (সা) বললেন, “হে উমর! তুমি কি এতে খুশি নও যে তাদের আছে এই পৃথিবীর জীবন, আর আমার আছে পরকালের (আখেরাতের) জীবন।”

আয়েশা (রা) বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সা) যে বিছানায় ঘুমাতেন তা ছিল চামড়ার ওপরের অংশ দিয়ে তৈরি যা আমরা খেজুরের পাতা দিয়ে কিছুটা নরম করে রাখতাম।” বর্ণিত আছে যে, একবার তাঁর কোনো একজন স্ত্রী তাঁকে আরেকটু আরাম দেওয়ার জন্য বিছানার (অর্থাৎ গদি/তোষকের) নিজের অংশটুকু ভাঁজ করে নবিজির (সা) দিকে দিয়ে রেখেছিলেন। তাতে করে তিনি সেই রাতে স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি সময় ধরে ঘুমিয়েছিলেন, এবং ফলে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য সময়মতো জাগতে পারেননি।

যখন নবিজি (সা) জেগে উঠে বুঝতে পারলেন কী ঘটেছিল, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, সেই আরাম তিনি। চান না যা তাকে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে বাধা দেয়। কখনো কখনো তিনি কয়েক সপ্তাহ সময় ধরে মাংস খেতেন না। আবদুর রহমান ইবনে আওফ (রা) থেকে বর্ণিত, “নবিজি (সা) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কখনও সাদা রুটি খেতেন না। এমনকি তাঁর পরিবারও সেই সময় মাংস খেত না!”

আরেক বর্ণনায় আছে, নবিজির (সা) মৃত্যুর অনেক বছর পর যখন মুসলিম সমাজে সচ্ছলতা এসেছে, তখন অনেকেই মাঝে মাঝে আয়েশার (রা) কাছে ভালো খাবার উপহার হিসেবে পাঠাতেন। সেগুলো দেখে তিনি খুশি না হয়ে বরং তিনিও আবদুর রহমান ইবনে আওফের (রা) মতো বলেছেন, “আল্লাহর রসুল (সা) কখনই পেট পুরে রুটি খেতেন না।”

সাহাবিরা মদিনাতে শুরুর দিকে আর্থিকভাবে খুব কঠিন সময় অতিবাহিত করছিলেন। সেই সময়ে একবার উমর (রা) রাস্তায় হাঁটার সময় নবি করিমকে (সা) বসে থাকতে দেখলেন। বাইরে ছিল মধ্যাহ্নের প্রচণ্ড গরম। ওরকম সময়ে কেউ রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে না। উমর (রা) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি এ সময় বাইরে কী করছেন?” তিনি বললেন, “তুমি যে কারণে বাইরে রয়েছ সে কারণেই।” তাঁর মানে হলো এই যে, দুজনের বাড়িতেই কোনো খাবার নেই।

তখন তাঁরা দুজনেই বসে পড়লেন। এমন সময় দেখা গেল, আবু বকরও (রা) তাদের মতো ওই একই কারণে রাস্তায় হাঁটছেন। এবার তাঁরা তিনজন বসে ক্ষুধার্ত অবস্থায় নিজেদের মধ্যে কথোপকথন করছিলেন। এমন সময় একজন সাহাবি সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন তারা সেখানে কী করছেন। উমর (রা) জানালেন তাঁরা ক্ষুধার্ত হয়ে বাইরে বসে আছেন। তখন সাহাবিটি তাঁদের তিনজনকে খাওয়াবেন বলে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গেলেন। সাহাবিটির একটি ছাগল ছিল। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, “আমাদের এই ছাগলটিকে জবাই করতে হবে। আমরা অতিধিদের মাংস ও রুটি খাওয়াব!”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

তিনজনের খাওয়া শেষ হলে আল্লাহর রসুল (সা) আবু বকর (রা) এবং উমরকে (রা) স্মরণ করিয়ে দিলেন, তাঁরা কিন্তু নিজ নিজ বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত অবস্থায়, আল্লাহ তায়ালা তাঁদের জন্য এই খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। নবিজি (সা) তখন তাদেরকে পবিত্র কোরানের একটি আয়াত স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন: “এরপর (আল্লাহ তায়ালার) নেয়ামত (আরাম উপভোগ) সম্পর্কে তোমাদের সেদিন অবশ্যই জিজ্ঞেস করা হবে।” [সুরা তাকাসুর, ১০২] বদরের যুদ্ধে যাওয়ার সময় উপস্থিত ৩১৩ জন যোদ্ধার মধ্যে ৭৫টি উট ভাগ করে দিতে হয়েছিল, অর্থাৎ প্রতি ৩-৪ জনের জন্য একটি করে উট ছিল। যুদ্ধে যাওয়ার পথে নবিজি (সা) আলি ইবনে আবু তালিব (রা) ও আবু লুবাবাকে (রা) নিজের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিলেন। যাত্রাপথের সঙ্গী দুই সাহাবি বললেন, “আমাদের বয়স কম। আমরা নিজেরা সহজেই হেঁটে যেতে পারি।

আপনি উটের পিঠে উঠুন।” নবিজি (সা) শুধু যে তাদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠই ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন পুরো যুদ্ধক্ষেত্রের কমান্ডার বা নেতা। সে হিসেবে তাঁর ব্যক্তিগত সুস্থতা ও নিরাপত্তার বিষয়টিও কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। নবিজি (সা) সঙ্গীদের দেওয়া প্রস্ত বিটি গ্রহণ করতে পারতেন। অথচ তিনি তাঁদেরকে হেসে জবাব দিলেন, “তোমাদের দুজনের কেউই আমার চেয়ে বেশি শক্তিশালী নও, এবং পরকালের জন্য আমারও আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার প্রয়োজন তোমাদের দুজনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অতএব আমরা উটটি ভাগাভাগি করেই ব্যবহার করব।”

আনাস ইবনে মালিক (রা) ১১০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। সেই সময় গড় আয়ু ছিল মাত্র ৩০ বছর। আনাসের শৈশবেই তাঁর মা তাঁকে আল্লাহর রসুলকে (সা) খেদমত করার জন্য নিয়ে যান, এবং পুত্রের মঙ্গলের জন্য দোয়া প্রার্থনা করেন। নবি’জি (সা) দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ! তাঁকে তাঁর জীবনে, তাঁর ধন-সম্পদে এবং তাঁর বংশধরদেরকে বরকত দিন।” জানা যায়, পরবর্তী সময়ে আনাস অনেক ধন-সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। তিনি যে ব্যবসাতেই হাত দিতেন তার সবকিছুতেই সমৃদ্ধি আসত। আনাসের বংশধরের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে, তিনি নিজেও সবাইকে মনে রাখতে পারতেন না।

আনাস (রা) বলেছেন, “আমি নবিজির (সা) সঙ্গে দশ বছর থেকেছি। কিন্তু এর মধ্যে একবারও তিনি আমাকে তিরস্কার করেননি, একবারের জন্যও তাঁর মুখ থেকে ‘উহ’ শব্দটি বের হয়নি। একবারও তিনি আমাকে বলেননি, ‘তুমি এটা কেন করনি?” এমনই শিষ্টাচারী ছিলেন আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা)।

নবিজির সাহসিকতা সম্পর্কে আলি ইবনে আবি তালিব (রা) বর্ণনা করেছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে যখন পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করত তখন আমরা নবি’জির (সা) কাছে আশ্রয় নিতাম।” আনাস ইবনে মালিকের (রা) বর্ণনা অনুসারে, একবার মদিনাবাসীরা মধ্যরাতে উচ্চস্বরে হই-হুল্লোড় শুনতে পেয়ে খুব ভয় পেয়েছিল। তারা যখন সাবধানে আস্তে আস্তে বাইরে বেরিয়ে এল, তখন দেখতে পেল যে নবিজি (সা) ইতোমধ্যেই বাইরে বেরিয়ে এসেছেন।

রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য নবিজি (সা) একাই এগিয়ে গেলেন। একটু এগিয়ে তিনি সেখানে আবু তালহার ক্ষিপ্ত ঘোড়াটিকে দেখতে পেলেন। তখন তিনি স্যাডল বা জিন ছাড়াই ঘোড়াটির উপর চড়ে ফিরে এসে সবাইকে বললেন, “তোমাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি এটি পরীক্ষা করে দেখেছি।”

নবি করিম (সা) ছিলেন একজন উদার ও খোলা মনের মানুষ। তাঁর কাছে কেউ কোনো অনুরোধ করলে তিনি কখনো তা ফেলতে পারতেন না। এমনকি ছোট বাচ্চারাও যে কোনো কারণে নবিজির (সা) কাছে সহজেই যেতে পারত। একবার নবিজির (সা) পরনে এমন একটি কাপড় ছিল যার কিছু অংশ ছেঁড়া। তা দেখে একজন সাহাবি তাকে খুব সুন্দর একটি পোশাক উপহার দিলেন। নতুন ওই পোশাকটি দেখে অন্য এক সাহাবি তাঁকে বললেন, “আপনি কি আমাকে এই পোশাকটা উপহার হিসেবে দিতে পারেন?” নবিজি (সা) সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন, এবং ঘরে ফিরে আবার আগের সেই ছেঁড়া পোশাকটি পরে বেরিয়ে এলেন!

নবিজির (সা) রসবোধ ছিল তুখোড়। তাঁর রসিকতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। রসিকতাগুলো ছিল খাঁটি ও নির্মল। সেগুলোর মধ্যে সামান্যতম মিথ্যারও স্থান ছিল না। একবার এক বৃদ্ধা নবিজির (সা) কাছে এসে বললেন, “হে আল্লাহর রসুল। দোয়া করুন যেন আল্লাহ আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।” নবিজি (সা) একথা শুনে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, “খালা, আপনি কি জানেন না যে বুড়ো মহিলারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না?” একথা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে লাগলেন। তখন তিনি বৃদ্ধাকে বললেন, “আপনি কাঁদবেন না। আল্লাহর কসম, বৃদ্ধা মহিলারা প্রবেশ করতে পারে না। তবে আল্লাহ তায়ালা প্রথমে আপনাকে একটি সুন্দরী যুবতী নারীতে পরিণত করবেন, এবং তারপরে আপনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন!”

নবিজি (সা) মৃত্যুশয্যায় থাকার সময়ে তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা) একবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তিনি প্রচণ্ড মাথাব্যাথায় কষ্ট পাচ্ছিলেন। তিনি তখন স্ত্রীকে শান্ত করার জন্য কিছুটা রসিকতা করে বললেন, “ও আয়েশা! যদি তুমি এই মুহূর্তে মারা যাও তবে তুমি কী হারাবে? যে ব্যক্তি তোমাকে গোসল করাবে এবং তোমার জানাজা পড়াবে সে হব আমি।” আয়েশা (রা) অনুযোগের সুরে জবাব নিয়েছিলেন, “আমি নিশ্চিত যে আপনি এটি চান, কারণ তখন আপনি অন্য স্ত্রীদের কাছে স্বাধীনভাবে যেতে পারবেন!” সুবহানআল্লাহ। নবিজি (সা) নিজের মৃত্যুশয্যায়ও রসিকতা করেছেন। এই ঘটনা থেকেই ফিকহ বা ধর্মীয় বিধান এসেছে যে স্বামী বা স্ত্রী একে অন্যকে জানাজার জন্য গোসল করাতে পারবে।

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ-২ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

 

জহির নামের সরল ও আন্তরিক মনের এক যুবককে নবি করিম (সা) খুব পছন্দ করতেন। একদিন তিনি ছেলেটিকে বাজারে কিছু জিনিস বিক্রি করতে দেখলেন। ছেলেটি একটা জিনিস দেখিয়ে বলছিল, “কে আমার কাছ থেকে এটি কিনবে? কে আমার কাছ থেকে এটি কিনবে?” নবিজি (সা) নিঃশব্দে পিছন থেকে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। জহির যখন টের পেল যে নবিজি (সা) তাকে জড়িয়ে তখন সে ইচ্ছা করেই পেছন দিকে একটু হেলান দিল।

সঙ্গে সঙ্গে নবিজি (সা) অনেকটা রসিকতা করে কিছুটা চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “আমার কাছ থেকে এই ‘আবদ’কে কে কিনবে?” সেই দিনগুলোতে কেউ যদি বাজারে গিয়ে বলে যে সে একটি ‘আবদ’ বিক্রি করতে চাচ্ছে, তার অর্থ সবাই বুঝবে যে ওটা গোলাম। এই রসিকতায় নবিজি (সা) কিন্তু মিথ্যা কিছু বলছেন না। এখানে ‘আবদ’ অর্থে তিনি ‘আল্লাহর বান্দা’ বোঝাতে চেয়েছেন। জহির বলল, “হে আল্লাহর রসুল।

সেক্ষেত্রে আপনি খুব কম দাম পেতে যাচ্ছেন। আমি খুব বেশি নামে বিক্রি হব না।” নবিজি (সা) জবাবে বললেন, “তুমি আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টিতে অত্যন্ত দামি।” নিজের উম্মতদের প্রতি নবিজির (সা) ছিল অপরিসীম ভালোবাসা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেছেন: “(হে মানবজাতি) তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে এক রসুল এসেছে। তোমাদের দুর্ভোগ তার কাছে দুঃসহ। তিনি তোমাদের জন্য উৎকণ্ঠিত, মুমিনদের প্রতি তিনি অনুগ্রহে ও ক্ষমায় পরিপূর্ণ।”

[সুরা তওবা, ৯:১২৮] সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, একবার নবি করিম (সা) পবিত্র কোরান তেলাওয়াত করছিলেন। সেখানে একটি আয়াতে ইব্রাহিম (আ) বলছেন, “হে আমার প্রতিপালক। যে আমাকে অনুসরণ করে, সে-ই আমার দলভুক্ত হবে, কিন্তু কেউ আমার অবাধ্য হলে আপনি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সুরা ইব্রাহিম, ১৪-৩৬] এরপর নবিজি (সা) সুরা মায়েদা থেকে একটি আয়াত পাঠ করলেন, যেখানে ইসা (আ) বলছেন, “হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদের শাস্তি দেন তবে সেটা আপনার অধিকারের মধ্যেই পড়ে, আর আপনি যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি ‘আজিজুল হাকিম’।” এখানে ইসা (আ) মনে মনে চাচ্ছিলেন, আল্লাহ যেন তাদের ক্ষমা করেন।

ওই দুই আয়াত পড়া শেষ করে আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদ (সা) আল্লাহর পানে হাত তুলে বললেন, “হে আল্লাহ, আমার উম্মত! হে আল্লাহ, আমার উম্মত!” তারপর তিনি নিজের উম্মতদের কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগলেন। আল্লাহ তায়ালা তখন ফেরেশতা জিব্রাইলকে (আ) বললেন, “মুহাম্মদের কাছে যাও এবং তাকে জিজ্ঞেস করো কেন সে কাঁদছে।” (অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা কান্নার কারণ আগে থেকেই জানতেন।)

জিব্রাইল (আ) নবি করিমের (সা) কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কাঁদছেন কেন?” নবিজি (সা) জবাব দিলেন, “আমি আমার উম্মতের কথা মনে করে, এবং তাদের পরিণতি কী হবে তা ভেবে কাঁদছি।” তারপর জিব্রাইল (আ) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে এটা জানালে আল্লাহ বললেন, “হে জিব্রাইল! আবার তুমি মুহাম্মদের কাছে ফিরে যাও, এবং তাকে বলো যে তার উম্মতদের ব্যাপারে আমি তাকে খুশি করব।” অন্য কথায়, আল্লাহ তায়ালা নবিজির (সা) উম্মতদেরকে বিশেষ বরকত দেবেন।

আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক নবিকে একটি করে ‘ইচ্ছা’ (বা দোয়া করার সুযোগ) দান করেছেন, যা তিনি (আল্লাহ) প্রত্যাখ্যান করবেন না। কোনো কোনো নবি তাঁর সম্প্রদায়ের অবাধ্যতার কারণে হতাশ হয়ে এই ইচ্ছাটিকে তাঁর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, নুহ (আ) ৯৫০ ধরে দাওয়াত দেওয়ার পরও যখন তাঁর সম্প্রদায়ের মানুষরা তাঁর কথা শুনছিল না, তখন তিনি বিফল মনোরথে প্রতিপালকের কাছে ইচ্ছা আপন করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমি চাই না এই পৃথিবীতে কাফেরদের একটি ঘরও অবশিষ্ট থাকুক।” নুহের (আ) ইচ্ছায় সাড়া দিয়ে আল্লাহ তায়ালা শুধু বিশ্বাসীদের ছাড়া সব মানুষকে ধ্বংস করেছিলেন। ইব্রাহিম (আ) সেই বিখ্যাত দোয়াটি করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার বংশধরদের মধ্য থেকে একজন রসুল প্রেরণ করুন…।” এবং এ কারণেই নবি মুহাম্মদ (সা) বলেছেন, “আমি আমার পিতা ইব্রাহিমের দোয়ার ফসল।”

 

মহানবি মুহাম্মদের (সা) অন্তর্নিহিত চারিত্রিক গুণাবলি | মহানবি মুহাম্মদের (সা) বিশেষ বৈশিষ্ট্যসমূহ-২ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

 

মুসা (আ) ফেরাউনের বিরুদ্ধে যে দোয়াটি করেছিলেন, আল্লাহ তা সুলায়মান (আ) দোয়া করেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন রাজত্ব (নিয়ন্ত্রণ) দিন যা আপনি এর আগে অন্য কোনো মানুষকে দেননি।” সুতরাং আল্লাহ তাঁকে এমন ক্ষমতা দিয়েছিলেন যা আর কাউকেই দেওয়া হয়নি (উদাহরণস্বরূপ, শয়তান ও জিনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি)।

আর আমাদের প্রিয় নবি মুহাম্মদের (সা) জন্য নির্ধারিত দোয়াটি তিনি আমাদের (অর্থাৎ তাঁর উম্মতদের) জন্য ব্যবহার করেছেন। তাঁর কথায়, “প্রত্যেক নবি ও রসুলকে আল্লাহ তায়ালা একটি করে দোয়ার সুযোগ দিয়েছেন, যা তিনি (আল্লাহ) কখনই প্রত্যাখ্যান করেন না। আমি ব্যতীত প্রত্যেক নবি-রাসুলই তাঁদের দোয়াগুলো এই দুনিয়াতে ব্যবহার করেছেন। আর আমি আমার দোয়াকে আমার উম্মতদের জন্য সংরক্ষণ করেছি। আমি দোয়াটি তাদের (আমার উম্মতদের) জন্য শেষ বিচারের দিনে ব্যবহার করব। আমার দোয়া হবে, ‘হে আল্লাহ! আমার সব উম্মতকে ক্ষমা করুন’।”

আল্লাহ তায়ালা এই দোয়া কবুল করবেন। যেসব মুসলিম নবিজির (সা) শিক্ষা কিছুটা হলেও গ্রহণ করবে এবং সেই অনুসারে আমল করবে, আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রত্যেককে ক্ষমা করবেন। ফলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। এই যে নবিজি (সা) আমাদের জন্য তাঁর দোয়াটি সংরক্ষণ করলেন, উম্মতদের জন্য তাঁর ভালোবাসার এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী-ই বা হতে পারে।

আনাস ইবনে মালিক (রা) বর্ণনা করেছেন, একবার এক লোক নবি করিমের (সা) কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, “হে আল্লাহর রসুল! কেয়ামত করে আসবে?” নবিজি (সা) তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, “কেয়ামত যদি এসে পড়ে, তুমি কি তার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছ?” একথা শুনে লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “এটি সত্য যে আমি নামাজ, রোজা বা দান-খয়রাত তেমন একটা করিনি; তবে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি রয়েছে আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা।” তখন নবিজি (সা) বললেন, “(কেয়ামতের পর) সে তার সঙ্গেই থাকবে, যার প্রতি তার ভালোবাসা রয়েছে।” আনাস (রা) বলেন, “আমরা সেদিনের মতো এত খুশি আর কখনোই হইনি যখন আমরা শুনলাম যে একজন মানুষ যাকে ভালোবাসে পরকালে সে তার সঙ্গেই থাকবে; কারণ আমরা আমাদের প্রিয় নবিকে (সা) অত্যন্ত ভালোবাসি এবং তাঁর সঙ্গেই থাকতে চাই।”

আমরা মুসলিমরা অত্যন্ত সৌভাগ্যবান যে আমরা এমন একজনকে নবি হিসেবে পেয়েছি যার রয়েছে আমাদের প্রতি অগাধ ভালোবাসা। আমরা যদি তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিই এবং তাঁকে অনুসরণ করি, তাহলে আল্লাহ তায়ালাও নিশ্চয়ই আমাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ পবিত্র কোরানে উল্লেখ করেছেন, “(হে রসুল) বলো, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তবে আমাকে অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।” [সুরা আলে ইমরান, ৩:৩১]

আরো পড়ুনঃ

 

Leave a Comment