চুক্তিনামার বিবরণ – সীরাতুন্ নবী (সা.) – ইবনে হিশাম (র.) [ সীরাতে ইবনে হিশাম – ২য় খণ্ড]

চুক্তিনামার বিবরণ ,সীরাতে ইবনে হিশাম – ২য় খণ্ড – চুক্তিনামার বিবরণ – সীরাতুন্ নবী (সা.) – ইবনে হিশাম (র.)

রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে কাফিরদের প্রতিশোধমূলক হলফনামা

সীরাতে ইবনে হিশাম : ইব্‌ন ইসহাক বলেন : কুরায়শরা যখন দেখল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণ একটি নিরাপদ স্থানে গিয়ে সম্মানজনক আশ্রয় পেয়ে গেছে, সম্রাট নাজ্জাশী তাদেরকে তাদের বিরোধীপক্ষ হাতে রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন, এদিকে উমর (রা) ও ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তিনি ও হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের সাথে গিয়ে মিলেছেন, ফলে আরবের অপরাপর গোত্রে ইসলাম ক্রমবিস্তার লাভ করছে, তখন তারা এক জরুরী পরামর্শে মিলিত হল এবং এই মর্মে তারা বনু হাশিম ও বনূ মুত্তালিবের বিরুদ্ধে একটি হলফনামা সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা আর তাদের সাথে কোনরূপ সম্পর্ক রাখবে না।

তাদের সাথে বিয়ে-শাদী ও বেচাকেনা সম্পূর্ণরূপে বয়কট করে চলবে। এ প্রস্তাবে তাদের ঐকমত্য সাধিত হওয়ার পর, তারা একটি চুক্তিনামা লিখল এবং তা মেনে চলার ব্যাপারে সকলে অঙ্গীকারাবদ্ধ হল ও তাতে তারা সই করল। এরপর তারা চুক্তিপত্রটি কা’বা শরীফের ভিতরে ঝুলিয়ে রাখল, যাতে এর মর্যাদা তাদের অস্তরে সূদৃঢ় হয়।

চুক্তিনামার বিবরণ : সীরাতে ইবনে হিশাম - ২য় খণ্ড - রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর তাঁর সম্প্রদায়ের নির্যাতন- সীরাতুন্ নবী (সা.) - ইবনে হিশাম (র.)
Sirat Un Nabi – Ibn Hisham

এ চুক্তিনামাটি লিখেছিল মানসূর ইব্‌ন ‘ইকরিমা ইব্‌ন ‘আমির ইব্‌ন হাশিম ইবন আব্দ মানাফ ‘আবদুদ্দার ইব্‌ন কুসাই। ইব্‌ন হিশাম বলেন : কারও মতে এর লেখক ছিল নাযর ই হারিস। এ কারণে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার উপর অভিসম্পাত করেছিলেন। ফলে, তার কয়েকটি আঙ্গুল অবশ হয়ে যায়।

ইবন ইসহাক বলেন : কুরায়শরা পদক্ষেপ গ্রহণ করলে বনূ হাশিম ও বনূ মুত্তালিবের লোকজন আবূ তালিব ইব্‌ন ‘আবদুল মুত্তালিবের কাছে সমবেত হয় এবং তার সাথে তাঁর গিরিসংকটে গিয়ে আশ্রয় নেয়। বনু হাশিম থেকে একমাত্র আবূ লাহাব” “আবদুল- উয্যা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবই সপক্ষ ত্যাগ করে কুরায়শের সাথে মিলিত হয় এবং তাদের সমর্থন করে।

[ চুক্তিনামার বিবরণ : সীরাতে ইবনে হিশাম – ২য় খণ্ড]

রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে আবূ লাহাবের হঠকারিতা এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ ওহী

ইবন ইসহাক বলেন : হুসায়ন ইবন আবদুল্লাহ্ আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, আবূ লাহাব স্বগোত্র ছেড়ে কুরায়শদের পক্ষ অবলম্বন করার পর, উতবা ইব্‌ন রবী আর কন্যা হিন্দার সাথে সাক্ষাৎ করল। তাকে বলল: হে উতবা তনয়া! তুমি কি লাত ও ‘উয্যার সমর্থন করেছ? যারা তাদের পরিত্যাগ ও বিরোধিতা করেছে তুমি কি তাদের বর্জন করেছ? সে বলল : হ্যা, হে আবূ “উতবা! আল্লাহ্ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন।।

ইব্‌ন ইসহাক বলেন আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে যে, সে বলত মুহাম্মদ আমাকে এমন সব বিষয়ের কথা বলে ভয় দেখায়, যা আমি দেখি না। সে বলে, মৃত্যুর পর সেগুলো হবে। এসব বলে সে আমার হাতে কি যেন তুলে দিল। এরপর সে তার দু’হাতে ফুঁ দিয়ে বলে ওঠে, তোমরা ধ্বংস হও, মুহাম্মদ যা বলে তার কিছুই আমি তোমাদের মাঝে দেখছি না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা’আলা নাযিল করেন: “আবূ লাহাবের দু’হাত ধ্বংস হোক, ধ্বংস হোক সে নিজেও।

ইব্‌ন হিশাম বলেন : মানে (ধ্বংস হোক, ক্ষতিগ্রস্ত হোক) (হতে ক্রিয়াটি উদ্ভূত, যার) অর্থ : (ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ধ্বংস হওয়া)। বনূ হিলাল ইব্‌ন আমির ইব্‌ন সা’সা’আ গোত্রীয় হাবীব ইবন খুদূরা খারিজীর একটি কাসিদায় আছে :

হে তায়ব। আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের লোক
যাদের শ্রম পণ্ড ও ব্যর্থ হয়ে গেছে।

[ চুক্তিনামার বিবরণ : সীরাতে ইবনে হিশাম – ২য় খণ্ড]

কুরায়শদের সম্পর্কে আবূ তালিবের কবিতা

ইবন ইসহাক বলেন: যখন কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর বিরুদ্ধাচরণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আবূ তালিব বলেন :
ওহে! আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে বনূ লুআঈ-এর শাখা বনু কা’বকে। ।
বন্ লুআঈকে এ বার্তা পৌঁছে দাও, বিশেষত তোমরা কি জান না, আমরা মুহাম্মদকে একজন নবীরূপে পেয়েছি, যেমন নবী ছিলেন হযরত মূসা। পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে তাঁর বর্ণনা আছে।

وان عليه في العباد محبة × ولاخير ممن خصه الله بالحب

মানুষের অন্তরে তাঁর জন্য আছে ভালবাসার ঠাই। আল্লাহ্ তা’আলা যাকে নিজ ভালবাসার জন্য বাছাই করেছেন, তাঁর থেকে বিছিন্ন হয়ে কোন কল্যাণের আশা করা যায় না।

তোমরা যে চুক্তিপত্র লিখেছ, তা তোমাদের নিজেদেরই জন্য অশুভ প্রমাণিত হবে, যেমন অশুভ প্রমাণিত হয়েছিল সালিহ (আ)-এর উট শাবকের আওয়ায।

 

সূরা হাজ্জ্ব

তোমরা সচেতন হও, সচেতন হও, কবর খননের আগেই।
সাবধান হও সেদিনের আগে, যেদিন নিষ্পাপ লোক হবে পাপীদের মত।

তোমরা নিন্দুকদের কথায় পড়ে, আমাদের পূর্ব ভালবাসা ও নৈকট্যের বন্ধন ছিন্নভিন্ন করে ফেলনা।
তোমরা টেনে এনো না ক্রমাগত যুদ্ধ। কারণ, যুদ্ধের স্বাদ যে একবার গ্রহণ করেছে, সে তা তেঁতোই পেয়েছে।

কা’বার রবের কসম! আমরা এমন লোক নই যে, কালচক্রের আঘাত ও বিপদাপদে জর্জরিত হয়ে আহমদকে তোমাদের হাতে ছেড়ে দেব –

এখনও তো তোমাদের আমাদের গর্দান বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং তোমাদের আমাদের হাত তীক্ষ্ণ কুসাসী তরবারিতে কর্তিত হয়নি।

بمعترك ضيق ترى كسر القنا * به والنسور الطخم يعكفن كالشوب

আমরা এখনও মুখোমুখি হইনি এমন সুকঠিন রণাঙ্গণে, যেখানে তুমি দেখতে পাবে— ইতস্তত খণ্ড-বিখণ্ড বর্শা, আর কালো মাথাবিশিষ্ট একঝাক শকুন, যারা নেশাগ্রস্থদের মত বুদ হয়ে পড়ে আছে। তার আশেপাশে ঘোড়ার ছোটাছুটি ও দুর্দান্ত বীরদের হাঁক-ডাক দেখলে তুমি ভাববে, এ বুঝি এক মহাব্যস্ত রণক্ষেত্র।

আমাদের পূর্বপুরুষ কি হাশিম নন, যিনি নিজ শক্তিকে করে যান সুদৃঢ় এবং সন্তানদের উপদেশ দিয়ে যান বর্শা ও তলোয়ারবাজীর ? আমরা যুদ্ধে ক্লান্ত হই না, যতক্ষণ না যুদ্ধই শ্রান্ত হয়ে ওঠে, যে কোন বিপদ-আপদই আসুক, আমরা কারও কাছে তার অভিযোগ করি না।।

والكننا أهل الحفائط والنهي × اذا طار ارواح الكماة من الرعب

বস্তুত আমরা সুদক্ষ প্রতিরোধকারী, জ্ঞানের অধিকারী এমনকি সেই মুহূর্তেও, যখন ভয়-ত্রাসে বাহাদুদেরও প্রাণ উড়ে যায়।

উক্ত গিরিসংকটে তারা দুই বা তিন বছর অন্তরীণ অবস্থায় কাটান। এ সময় তারা দুর্বিষহ দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেন। কুরায়শদের কতক আত্মীয়তার দায়িত্ববোধসম্পন্ন ব্যক্তি গোপনে যা কিছু পাঠাত, তাই ছিল তাদের সম্বল, নয়ত প্রকাশ্যে তাদের কাছে কারও কোন সাহায্য-সামগ্রী পৌঁছতে পারত না।

সূরা মুমিনূন

[ চুক্তিনামার বিবরণ : সীরাতে ইবনে হিশাম – ২য় খণ্ড]

হাকীম ইব্‌ন হিযামের সাহায্য প্রেরণ, আবূ জাহ্ল কর্তৃক বাধা প্রদান ও আবুল বাখতারীর মধ্যস্থতা

বর্ণিত আছে, হাকীম ইব্‌ন হিযাম ইব্‌ন খুওয়ায়লিদ ইব্‌ন আসাদ তাঁর ফুফু খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদ (রা)-এর জন্য কিছু গম নিয়ে যাচ্ছিলেন, তার একটি গোলাম তা বয়ে নিচ্ছিল।

খাদীজা (রা) তখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সহধর্মিণী এবং তাঁরই সংগে গিরিসংটে অবস্থানরত ছিলেন। আবূ জাহল তাদের দেখতে পেয়ে রুখে দাঁড়ায় এবং বলে ওঠে :

“তুমি এই খাদ্য সামগ্রী নিয়ে বনু হাশিমের কাছে যাবে ? আল্লাহর কসম । এ খাদ্যদ্রব্য নিয়ে তোমাকে এক কদমও অগ্রসর হতে দেব না। তার আগে আমি তোমাকে মক্কায় অপদস্থ করে ছাড়ব।”

 

সূরা হাজ্জ্ব

এমনি মুহূর্তে সেখানে আবুল বাখতারী ইবন হিশাম ইবন হারিস ইবন আসাদ এসে উপস্থিত হলেন।

তিনি আবূ জাহলকে বললেন : “তোমার কি হয়েছে ?”

আবূ জাহল বলল : “সে বনূ হাশিমের কাছে খাদ্য সামগ্রী নিয়ে যাচ্ছে”।

আবুল বাখতারী বললেন : “আরে, তার ফুফুর এই সামান্য কিছু খাদ্যদ্রব্য তার কাছে রক্ষিত ছিল। তিনি এখন চেয়ে পাঠিয়েছেন আর তুমি তাতে বাধা দিচ্ছ? ছেড়ে দাও, ও চলে যাক।”

কিন্তু আবূ জাহল অনড়। এই নিয়ে তাদের মধ্যে কটুক্তি বিনিময়ও হল। এক পর্যায়ে আবুল বাখতারী উটের একটি চোয়াল তুলে আবূ জাহলকে প্রচণ্ড আঘাত করলেন। ফলে তার মাথা ফেটে যায়। এরপর তাকে আচ্ছা করে পদদলিত করেন। হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব কাছ থেকে এসব লক্ষ্য করেছিলেন।

রাসূলুল্লাহ (সা) ও সাহাবীদের নিকট কোনরূপ সাহায্য-সামগ্রী পৌছুক, এটা কাফিরদের পসন্দ ছিল না। তাঁদের দুঃখ-দুর্দশায় তারা রীতিমত কৌতুকবোধ করছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা) এ অবস্থায়ও নিজ সম্প্রদায়কে রাত-দিন, প্রকাশ্যে-গোপনে সর্বাবস্থায় হিদায়াতের পথে আহবান জানাচ্ছিলেন। এভাবে আল্লাহর নির্দেশ পালন করে যাচ্ছিলেন। এতে কোন মানুষকে তিনি একবিন্দু পরওয়া করতেন না।

আরও পড়ুন:

Leave a Comment