জনসমক্ষে কোরান তেলাওয়াত নিষিদ্ধকরণ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

কুরাইশরা প্রকাশ্যে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত নিষিদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। মুসলিমরা কোরান তেলাওয়াত করলে তারা থামিয়ে দিত, অথবা এমনভাবে উচ্চস্বরে চেঁচামেচি ও শব্দ করে কথা বলত যাতে তেলাওয়াতের কথাগুলো বোঝা না যায়। ইবনে আব্বাস (রা) উল্লেখ করেছেন, যখনই নবিজি (সা) কাবার সামনে কোরান তেলাওয়াত করতেন, তখনই কুরাইশরা সেখানে হট্টগোল বাধিয়ে দিত এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুলকে (সা) অভিশাপ দিতে থাকত।

 

জনসমক্ষে কোরান তেলাওয়াত নিষিদ্ধকরণ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

জনসমক্ষে কোরান তেলাওয়াত নিষিদ্ধকরণ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সুতরাং কেউ কোরান পাঠ শুনতে চাইলে তাঁকে ওই শোরগোলের মধ্যেই তা শুনতে হতো, অথবা ভান করতে হতো যে সে শুনছে না। চিৎকার শোরগোলের কারণে নবিজি (সা) প্রায়শই নিজের কন্ঠস্বর একটু চড়িয়ে তেলাওয়াত করার চেষ্টা করতেন।  এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তায়ালা নাজিল করেন: “তোমরা নামাজের সময় স্বর উচ্চ করো না আবার অতিশয় ক্ষীণও করো না; এই দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন করো।”

[সুরা বনি ইসরাইল, ১৭:১১০) একবার কিছু সাহাবি আল-আরকামের বাড়িতে একত্রিত হয়ে আলোচনা করছিলেন যে, তখন পর্যন্ত নবিজি (সা) ছাড়া কেউ প্রকাশ্যে পবিত্র কোরান তেলাওয়াত করেনি। অন্যদের মধ্যে কে তেলাওয়াত করতে ইচ্ছুক তা নিয়েও আলোচনা করছিলেন। উপস্থিত সাহাবিদের মধ্য থেকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) প্রথম বলেন, “আমি তেলাওয়াত করব।” তখন অন্য সাহাবিরা বলেন, “আমরা চাই না তুমি এটা কর। কারণ তোমাকে সাহায্য কিংবা রক্ষা করার জন্য তোমার পরিবারের কেউ এখানে নেই।”

ইবনে মাসউদ (রা) ছিলেন একজন ইয়েমেনি, কুরাইশ বা মক্কার কেউ নন। আরবের সেই দিনগুলোতে সবকিছুর ওপরে ছিল বংশ। আপনি যদি কোনো গোত্রের অংশ হন তাহলে আপনার চিন্তা নেই, গোত্রের লোকেরাই আপনাকে রক্ষা করবে। এসব জানা থাকা সত্ত্বেও ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, “তবু আমি প্রকাশ্যে কোরান তেলাওয়াত করতে চাই: আমি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখছি।” পরদিন সকালে তিনি লোকজন জড়ো হওয়ার সময় কাবায় হাজির হন।

সেই সময় কাবাঘর ছিল মক্কায় সামাজিকতার পীঠস্থান। মক্কাবাসীরা দিনের কাজ শেষ করে কাবার চত্বরে জড়ো হয়ে গল্পগুজব করত, আয়েশ করে সময় কাটাত। একদিন সবাই একত্রিত হওয়ার পর ইবনে মাসউদ (রা) ‘মাকামে ইব্রাহিমে দাঁড়িয়ে সুরেলা কন্ঠে জোরে জোরে সুরা আল-রহমান তেলাওয়াত করা শুরু করলেন। তিনি এত চমৎকার করে তেলাওয়াত করছিলেন যে কিছুক্ষণের মধ্যেই বেশ কিছু সুন্দর মানুষ তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল, “সে কী আবৃত্তি করছে?”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

এখানে মনে রাখতে হবে, তেলাওয়াত ও তাজবিদ’ এ দুটি বিষয় সম্পূর্ণভাবে এবং শুধু পবিত্র কোরানের সঙ্গেই সম্পর্কিত। আরবরা কথা বলার সময় ‘শুন্নাহ’ এবং ‘মৃদুদ’ ব্যবহার করত না। কিন্তু কোরানের ভাষার একটা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে। ইবনে মাসউদের (রা) দরাজ গলায় আর-রহমানের শ্রুতিমধুর মন্ত্রমুগ্ধকর তেলাওয়াত শুনে উপস্থিত লোকেরা নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি শুরু করে দিল। একপর্যায়ে একজন বলে উঠল, “এই কথাগুলোই তো মুহাম্মদ (সা) তাঁর ওপর নাজিল হয়েছে বলে দাবি করছেন।”

এভাবে থলের বিড়ালটি বেরিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোকেরা ইবনে মাসউদের (রা) ওপর চড়াও হয় এবং তাঁকে মারধর শুরু করে। তিনি যেহেতু কুরাইশ ছিলেন না, তাই তাঁকে রক্ষা করার কেউ সেখানে ছিল না। মারধরের মাত্রা বেড়ে গেলে সুরাটির শেষ দুই পৃষ্ঠা বাকি থাকা অবস্থায় তিনি তেলাওয়াত বন্ধ করতে বাধ্য হন। তিনি মারধর ও আঘাতের চিহ্নসহ রক্তাক্ত অবস্থায় ফিরে এলে সাহাবিরা তাঁকে বললেন, “ঠিক এ কারণেই আমরা তোমাকে যেতে দিতে চাইনি।” ইবনে মাসউদ (রা) জবাবে বললেন, “আল্লাহর কসম! আজকের ঘটনার পরে কুরাইশদের প্রতি আমার ঘৃণা ও অবজ্ঞা বেড়েছে বই কমেনি। আমি আগামীকাল আবারও এই কাজটি করতে রাজি আছি।” সাহাবিরা বললেন, “যথেষ্ট হয়েছে। কোরান তেলাওয়াত করে শোনানোর মধ্য দিয়ে তুমি তাদের মর্মপীড়ার যথেষ্ট কারণ ঘটিয়েছ।”

আমরা সেই বিখ্যাত গল্পটিও জানি যেখানে কুরাইশদের তিন নেতা নবিজির (সা) কন্ঠে তেলাওয়াত শোনার জন্য যার যার মতো গোপনে চেষ্টা চালিয়েছিল। মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক তাঁর সিরাত গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আল-জুহরির বরাত দিয়ে লিখেছেন। আবু সুফিয়ান ইবনে হারব, আবু জেহেল ইবনে হিশাম এবং আখনাস ইবনে শুরায়েক ইবনে আমর ইবনে ওয়াহাব আল-সাকিফি- এই তিনজন নবিজির (সা) কণ্ঠ থেকে কোরানের তেলাওয়াত শোনার জন্য এক রাতে বের হলো।

নবিজি (সা) তখন তাঁর বাসায় রাতের নামাজ পড়ছিলেন। তারা তিনজনই আলাদাভাবে রসুলের (সা) বাসার আশেপাশে অবস্থান নিল। তাঁরা কেউ জানতেন না যে আরও কেউ একই উদ্দেশ্যে সেখানে অবস্থান নিয়েছে। তারা তিনজনই নবিজির (সা) গলায় কোরান মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে রাত পার করে ফেলল। সকালে নিজ নিজ বাড়ি ফেরার পথে দেখা হয়ে গেলে তাঁরা একে অপরকে দোষারোপ করে বলল, ‘এখানে আর আসবে না, যাতে মানুষের মনে ভুল ধারণা জন্মায়। তারপর তারা যার যার মতো বাড়ি চলে গেলেন।

দ্বিতীয় রাতেও তারা আবার নবিজির (সা) বাসার পাশে নিজ নিজ জায়গায় অবস্থান নিয়ে সারা রাত কাটিয়ে দিল। ভোর হলে বাড়ি ফেরার পথে আবার দেখা হলে আবারও প্রত্যেকেই আগেরবারের মতো কথা বলে পরস্পরকে দোষারোপ করল। তারপর নিজ নিজ বাড়ি চলে গেল। তৃতীয় রাতেও তাঁরা নিজের জায়গায় ফিরে এসে সারারাত নবিজির (সা) কোরান পাঠ শুনে কাটাল। ভোর হলে বাড়ি ফেরার পথে আবার দেখা হলে একে অপরকে বলল, “আমরা এখানে আর না আসার প্রতিশ্রুতি দেওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরে যাব না।” তাই তাঁরা একে অপরকে সেই প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন রাস্তা দিয়ে চলে গেল।

 

জনসমক্ষে কোরান তেলাওয়াত নিষিদ্ধকরণ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

পরের দিন সকালে আখনাস ইবনে শুরায়েক আবু সুফিয়ানের বাড়িতে হাজির হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু সুফিয়ান, মুহাম্মদের (সা) কাছ থেকে যা কিছু শুনেছ সে সম্পর্কে তুমি কী মনে কর?’ আবু সুফিয়ান জবাবে বলল, ‘হে আখনাস, আল্লাহর শপথ, আমি এমন কিছু শুনেছি যা আমি বুঝতে পেরেছি এবং আমি এর অর্থ কী তা জানি। আবার আমি এমন কিছুও শুনেছি যা আমি বুঝতে পারিনি এবং যার অর্থ কী তা আমি জানি না।’ আখনাস বলল, ‘তুমি যাঁর শপথ নিয়েছিলে আমিও তাঁর শপথ নিয়ে বলছি, আমিও তোমার মতোই ভেবেছি।’

তারপর সে (আখনাস) আবু জেহেলের বাড়িতে গিয়ে একই প্রশ্ন করল, ‘হে আবু আল-হাকাম (অর্থাৎ আবু জেহেল)! মুহাম্মদের (সা) কাছ থেকে যা কিছু শুনেছ সে সম্পর্কে তুমি কী মনে কর?’ আবু জেহেল জবাব দিল, ‘আমরা এবং বনু আবদ মানাফ সম্মান ও সামাজিক অবস্থানের জন্য পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি। তারা মানুষকে খাওয়ালে আমরাও মানুষকে খাওয়াতাম, তারা যুদ্ধে লিপ্ত হলে আমরাও যুদ্ধ করতাম, তারা দান করলে আমরাও দান করতাম।

রেসের ঘোড়ার মতো সমানে সমানে লড়ছিলাম। এখন তারা বলছে যে তাদের মধ্যে একজন নবি আছেন যিনি ঐশ্বরিকভাবে ওহি লাভ করেছেন। এই ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব? আল্লাহর কসম, আমরা কখনোই তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব না। তারপর আখনাস উঠে চলে গেল। এ থেকে বোঝা যায় যে, রসুলের (সা) তেলাওয়াত নিশ্চয়ই আবু জেহেলসহ এই তিন কুরাইশ নেতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছিল। পরের দিন আখনাস আবার আবু সুফিয়ানের কাছে গিয়ে বলল, ‘আমার তো মনে হয় মুহাম্মদের এই কথাগুলো সত্য।’

আবু সুফিয়ানের পক্ষে আর্থনাসের সঙ্গে একমত হওয়া ছিল খুবই বিব্রতকর। তাই সে ধোঁয়াশামিশ্রিত উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি এর কিছু অংশ বুঝেছি, আর কিছু অংশ বুঝতে পারিনি। সে জানত যে এটা সত্য, কিন্তু রাজনীতিবিদ হওয়ার কারণে আবু সুফিয়ান কোনো বেফাঁস কথা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখতে চেয়েছিল। অন্যদিকে আবু জেহেল কেন মুহাম্মদকে (সা) নবি হিসেবে গ্রহণ করবে না সে ব্যাপারে সরাসরি ব্যাখ্যা দিয়েছিল। লক্ষ করুন, আবু জেহেল এখানে সৎ হলেও অন্য গোত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা এবং অহংকারের কারণে সে মুহাম্মদকে (সা) নবি হিসেবে গ্রহণ করল না।

আরো পড়ুনঃ

Leave a Comment