যেসব ঘটনার পরিণতিতে বদরের প্রধান যুদ্ধ | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

যেসব ঘটনার পরিণতিতে বদরের প্রধান যুদ্ধ | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি, গাজওয়াতুল উশায়রা সংঘটিত হয়েছিল হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষের জমাদিউল আউয়াল মাসে। নবি করিম (সা) উশায়রা এলাকায় গিয়ে শিবির স্থাপন করে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন। তিনি সেখানে জমাদিউস সানি মাসের প্রথম কয়েক দিন পর্যন্ত ছিলেন। তারপরে তিনি কাফেলার দেখা না পেয়ে মদিনায় ফিরে আসেন । এর মধ্যে রমজান মাস চলে এল। তখনও কাফেলাটি ফিরে আসার খবর না পেয়ে নবিজি (সা) একাধিক সাহাবিকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠান।

সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুসারে, আনাস ইবনে মালিক বলেছেন কাফেলা ফেরার সময় হয়ে এলে নবিজি (সা) একজন সাহাবিকে গুপ্তচর হিসেবে পাঠিয়েছিলেন কাফেলাটির আগমনের খবরাদি সংগ্রহ করে এসে তাঁকে জানানোর জন্য। সাহাবিটি (গুপ্তচর) ফিরে এলে তিনি তাঁর কাছ থেকে কাফেলার অবস্থান সম্পর্কে জানার জন্য ঘরে একমাত্র আনাস ছাড়া আর কাউকে রাখেননি। আনাস সেই সময় মাত্র সাত বছরের বালক ছিলেন বলে তাঁকে সেখানে থাকতে দিয়েছিলেন।

ইবনে ইসহাক বর্ণিত অন্য একটি হাদিস অনুসারে, নবিজি (সা) দুজন বিখ্যাত সাহাবি তালহা ইবনে উৰায়দিল্লাহ এবং সাইদ ইবনে জায়েদকে কাফেলাটির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তাঁরা দুজন কাফেলাটি দেখতে পেয়ে তার গতিবিধি লক্ষ করতে লাগলেন। এক সময় সেটি তাঁদের পাশ দিয়ে চলে যাওয়ার পর তাঁরা দ্রুত মদিনায় ফিরে এসে নবিজিকে (সা) জানান যে, কাফেলাটির নেতৃত্বে আছে আবু সুফিয়ান এবং তাতে উটের সংখ্যা আনুমানিক এক হাজার।

 

যেসব ঘটনার পরিণতিতে বদরের প্রধান যুদ্ধ | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

যেসব ঘটনার পরিণতিতে বদরের প্রধান যুদ্ধ | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

কুরাইশদের নিকট ইতিহাসে এত বড় বাণিজ্যিক কাফেলা আগে কখনও ছিল না। এটি এই কারণে হতে পারে যে তারা নিকট অতীতে মুসলিমদের সম্পত্তি ও জমি দখল করে নেওয়ার মাধ্যমে হঠাৎ করেই অনেক ধনসম্পদের মালিক হয়ে গিয়েছিল। কাফেলাটিতে সম্পদের মোট মূল্য আমাদের সময়ের হিসেবে ৫২০ মিলিয়ন ডলার হবে। এর মালিকানা পেলে ইসলামি রাষ্ট্রের কোষাগার ও অর্থনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আনা যাবে। সুতরাং আমরা বুঝতে পারি, নবিজি (সা) কেন এ বিষয়ে এত আগ্রহী ছিলেন।

ইবনে ইসহাক উল্লেখ করেছেন, সেই সময় মক্কায় এমন কোনো পরিবার ছিল না যেটি ওই কাফেলায় বিনিয়োগ করেনি। বাণিজ্যিক কাফেলায় বিনিয়োগ ছিল মক্কার কুরাইশদের আয়ের প্রধান উৎস। তারা সঞ্চিত অর্থ দিয়ে পণ্য কিনে বাণিজ্যিক কাফেলাগুলোতে বিনিয়োগ করত; সেসব পণ্য সিরিয়ায় নিয়ে বিক্রি করা হতো। আবার অন্যান্য পণ্য কিনে ইয়েমেনে পাঠাত। এভাবেই মক্কার লোকেরা জীবিকার সংস্থান ও সম্পদ অর্জন করত। মক্কায় কৃষিকাজের সুযোগ ছিল না। বাণিজ্যই ছিল জীবনধারণের মূল উৎস। নবিজি (সা) খুব ভালো করেই জানতেন যে, তিনি যদি এই কাফেলার সম্পদের দখল নিতে পারেন তাহলে একদিকে মক্কার অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, আবার অন্যদিকে ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে।

এরকম অবস্থায় নবিজি (সা) কিছু সাহাবিকে একত্র করলেন। সেখানে ঠিক কী কথা হয়েছিল তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, নবি করিম (সা) কোথায় যাচ্ছেন তা ঘোষণা করেননি; তিনি শুধু বলেছিলেন, “আজ আমাদের একটি মিশনে যেতে হবে, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাদের প্রাণী (উট ইত্যাদি) প্রস্তুত রয়েছে তারা যেন আমার সঙ্গে যোগ দেয়।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

নবিজির (সা) নির্দেশ শুনে কিছু সাহাবি বলেন, “হে আল্লাহর রসুল, আমার প্রাণীটি এখন প্রস্তুত নেই। সেটি মদিনার অন্য একটি জায়গায় আছে। আমি গিয়ে নিয়ে আসছি।” নবিজি (সা) তাঁদের বলেন, “না। শুধু যাদের প্রাণী এখানে মজুত রয়েছে তারাই যাবে। আমরা এখনই রওয়ানা দিচ্ছি।” অন্যদিকে ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) সাহাবিদের বলেন, “কুরাইশদের কাফেলাটি তোমাদের দিকে ফিরে আসছে। এতে কুরাইশদের অনেক অর্থসম্পদ রয়েছে। সুতরাং চলো আমরা এর মোকাবেলা করি। আল্লাহ তায়ালা চাইলে তিনি সম্ভবত তোমাদের এটি দিয়ে দেবেন।

এখন আমরা উপরে উল্লিখিত দুটি বর্ণনাকে কীভাবে সমন্বয় করব? আল্লাহ ভালো জানেন। তবে মনে হয়, যখন তিনি মসজিদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিচ্ছিলেন তখন তিনি মিশনটির বিষয়ে বিস্তারিত (কোথায়, কীভাবে, কে ইত্যাদি) জানাতে চাননি। কারণ সেখানে শত্রুপক্ষের গুপ্তচর থাকার সম্ভাবনা ছিল। তাই তিনি প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেননি, বরং বলেন, “আজ আমাদের একটি মিশনে যেতে হবে, সুতরাং তোমাদের মধ্যে যাদের প্রাণী প্রস্তুত রয়েছে তাঁরা যেন আমার সঙ্গে যোগ দেয়। আমরা এখনই রওয়ানা দিচ্ছি।” প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল একটি কৌশল। এমনকি সাহাবিরাও জানতেন না তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন। সম্ভবত মুসলিম বাহিনী মদিনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে নবিজি (সা) তাঁদের বলেছিলেন, “কুরাইশের কাফেলাটি তোমাদের দিকে ফিরে আসছে। এতে কুরাইশদের…।”

 

যেসব ঘটনার পরিণতিতে বদরের প্রধান যুদ্ধ | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

সাহাবিরা কেউ জানতেন না তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন। নবিজি (সা) তাঁদের প্রস্তুতিও নিতে দেননি । কারণ, অভিযানটি তখন বেশ সহজ বলেই মনে হয়েছিল। জানা গিয়েছিল, এক হাজার উটের কাফেলাটিতে মাত্র ৪০ জন সশস্ত্র প্রহরী ছিল। নবিজির (সা) মূল উদ্দেশ্য ছিল, দ্রুত ও সহজে এক হাজার উটের দখল নিয়ে নেওয়া। তাঁর ধারণা ছিল, মুসলিমদের এত বেশি সংখ্যক লোকবল দেখে প্রহরীরা দৌড়ে পালাবে কিংবা মারা পড়বে এবং কুরাইশরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্রুত কাজটি সেরে ফেলা যাবে। সুতরাং এটি অত্যন্ত পরিষ্কার যে, বদরের অভিযানটি শুরুতে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে পরিচালনা করা হয়নি।

কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের ইচ্ছা ছিল ভিন্ন, যা আমরা বদরের যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে দেখতে পাব। সাহাবিরা মোটেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তিনশরও বেশি লোকের বাহিনীতে মাত্র দুটি ঘোড়া ছিল, আর উটের সংখ্যা ছিল একশটিরও কম।

যা-ই হোক, নবি করিম (সা) অনুমিত লক্ষ্যস্থলের কাছাকাছি পৌঁছে প্রথম তাঁবু স্থাপন করেই অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের ওপর বিশদ জরিপ করেন। তিনি দুজন সাহাবিকে পান যারা কমবয়সী হওয়ায় অভিযানে অংশ নেওয়ার উপযুক্ত ছিলেন না। তাঁরা ছিলেন আল-বারা ইবনে আজিব এবং আবদুল্লাহ ইবনে উমর; উভয়েরই বয়স ছিল ১৪ বছরের কম। লক্ষ করুন, সেই সময়ে কোনো ব্যক্তি ১৪ বছর বয়সে পৌঁছলেই তাঁকে প্রাপ্তবয়স্ক (যা আমাদের সময়ের ১৮ বছর) বলে বিবেচনা করা হতো, কারণ তাঁরা জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় পথ চলতে গিয়ে খুব দ্রুতই পরিপক্বতা অর্জন করত।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment