বনু আবদ আল-আশালের উসায়রিম | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

বনু আবদ আল-আশালের উসায়রিম | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার, বনু আবদ আল-আশাল গোত্রের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেনি। তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিলেন উসায়রিম, তাঁর গোত্রের সবাই ধীরে ধীরে ধর্মান্তরিত হলেও তিনি পৌত্তলিকতার চর্চা অব্যাহত রাখেন। অবশেষে তিন বছর পর ওহুদের যুদ্ধের দিনে তিনিও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন (পরবর্তী একটি পর্বে উসাইরিমের ইসলাম গ্রহণের বর্ণনা আছে)।

বনু আবদ আল-আশালের উসায়রিম | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

বনু আবদ আল-আশালের উসায়রিম | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আকাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকার

মুসআব ইবনে উমায়ের ইয়াসরিবের বহু মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করিয়েছিলেন। দাওয়াতের ১২তম বছরে, হিজরতের মাত্র কয়েক মাস পূর্বে, ইয়াসরিব থেকে ৭৫ জন মুসলিম মক্কায় গিয়ে নবি করিমের কাছে তাদের বাইয়াত বা অঙ্গীকার প্রদান করে। তা ‘বাইয়াতুল আকাবা আস-সানিয়া’ বা ‘আকাবার দ্বিতীয় অঙ্গীকারনামা’ নামে অভিহিত। যে ৭৫ জন মক্কায় হজ করতে যান, ইয়াসরিবে তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিবারে কমপক্ষে আরও তিনজন করে সদস্য রেখে এসেছিলেন, যারা ইতোমধ্যেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

অর্থাৎ মুসআব ৭৫ জনকে নিয়ে মক্কায় এলেও তাদের পরিবারের সদস্যদের যোগ করলে তিনি আসলে ২৫০-৩০০ জনকে ধর্মান্তরিত করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই সংখ্যাটি ছিল তৎকালীন মক্কায় বসবাসকারী মুসলিমদের সংখ্যার কাছাকাছি । মক্কায় ১৩ বছরে যত সংখ্যক মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে, ইয়াসরিব কীভাবে মাত্র এক বছরের মধ্যেই সেই সংখ্যায় পৌছে গেল? এর বেশ কিছু কারণ রয়েছে:

(ক) ইয়াসরিবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে কোনো নিপীড়ন-নির্যাতন ছিল না।

(খ) ইয়াসরিবে বসবাসরত ইহুদিরা একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিল। তাদের সংস্পর্শে আরবদের মনেও একেশ্বরবাদী প্রবণতা কাজ করত।

(গ) গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানকার উপজাতিদের মধ্যে নেতৃত্বের শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল। নবীন প্রজন্ম পৌত্তলিকতায় ভালো কিছু দেখতে পায়নি, উপরন্তু তারা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধসংঘাতে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল। তাই তারা অবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিল।

নবিজি (সা) ইয়াসরিব থেকে আগত ওই ৭৫ জনকে বার্তা পাঠালেন: “হজের শেষ রাতে সবাই বাড়ি ফেরার আগে আমরা দেখা করব। আকাবার পাশের উপত্যকায় ফজরের নামাজের আগে তোমরা আমার সাথে দেখা করবে।” জাবির ইবনে আবদিল্লাহ ছিলেন দ্বিতীয় অঙ্গীকারনামার প্রত্যক্ষদর্শীদের একজন। তিনি বর্ণনা করেছেন, “মক্কায় দশ বছরেরও বেশি সময় নবিজি (সা) হজ মৌসুমে লোকদের কাছে ইসলাম প্রচার করেছেন।

তিনি সেখানে আগত বিভিন্ন উপজাতির লোকদের জিজ্ঞেস করতেন, ‘কে আমাকে সমর্থন করবে যাতে আমি আমার প্রতিপালকের বাণী প্রচার করতে পারি?’ মুদার, ইয়েমেন ইত্যাদি অঞ্চল থেকে আগত দুই-একজন ছাড়া কোনো সমর্থক তিনি পাননি। অবশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের ইসলামের দিকে পরিচালিত করলেন। ইয়াসরিবের কিছু লোক আমাদের কাছে ইসলামের বাণী প্রচার করা শুরু করেন।

আমরা তা বিশ্বাস করেছি, কোরান তেলাওয়াত করেছি। শেষ পর্যন্ত অল্প কিছু লোক ছাড়া ইয়াসরিবের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আল্লাহ আমাদের একত্রিত করলেন। একপর্যায়ে আমরা নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার সময় একে অপরকে বললাম, ‘আমরা আর কতকাল নবিজিকে (সা) মক্কার বাইরের এক উপত্যকা থেকে অন্য উপত্যকায় তাড়িত হয়ে ভয়ে ভয়ে থাকতে দেব?’ (অর্থাৎ আমাদের এখন উচিত নবিজিকে (সা) আমাদের কাছে এনে তাঁর সুরক্ষা নিশ্চিত করা।) আল্লাহই আমাদের মনে এই ধারণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন।”

কাব ইবনে মালিকও এই অঙ্গীকার প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা হজের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার পর আমাদের ইসলাম গ্রহণ করার ব্যাপারটি অন্যান্য (পৌত্তলিক) আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলাম। তাই আমরা রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আকাবার পেছনের উপত্যকায় নবিজির (সা) সঙ্গে দেখা করার জন্য সবাই একে একে তাঁবু থেকে বের হয়ে গেলাম। এমনভাবে চুপিসারে কাজটা করলাম যাতে অন্যদের মনে কোনো রকম সন্দেহ না জাগে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে আমরা নবিজির (সা) অপেক্ষায় রইলাম। অবশেষে তিনি তাঁর চাচা আব্বাসকে সাথে নিয়ে সেখানে এলেন। আব্বাস তখনও তাঁর সম্প্রদায়ের ধর্মের (পৌত্তলিকতার) অনুসারীই ছিল।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

জাবির আরও বলেন, “আমরা হজের শেষ রাতে সমবেত হলাম। আব্বাস এসে আমাদের সবাইকে দেখে নবিজিকে (সা) বললেন, ‘হে আমার ভাতিজা! আমি এই লোকদের কাউকেই চিনি না। তাই আমি এখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি না লক্ষ করুন, আব্বাস ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি ইয়াসরিবে ব্যাবসায়িক সফর করার মধ্য দিয়ে সেখানকার অনেক প্রবীণ ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। কিন্তু সেই প্রবীণরা ইতিমধ্যে বুআতের যুদ্ধে মারা গেছেন। আব্বাস এই যুবকদের কাউকেই চিনতে পারছিলেন না। তাই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেননি।

আব্বাস একজন বয়োজ্যেষ্ঠ কুরাইশ হিসেবে জাতিগত আনুগত্য থেকে মনে করেছিলেন, তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদের (সা) নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইয়াসরিবের লোকদের সঙ্গে দরকষাকষি করা প্রয়োজন। আবু তালিবের মতো আব্বাসও নবিজিকে (সা) আন্তরিকভাবে ভালোবাসতেন। এ ছাড়া সমবয়সী হওয়ায় তাঁরা পরস্পরের ভাইয়ের মতো একসঙ্গে বড় হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব ছিল। নবিজি (সা) আব্বাসকে বিশ্বাস করে নিজের সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন। আব্বাস অবশেষে সে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু সেটা আরও অনেক পরের ঘটনা।

জাবিরের বর্ণনায় আরো রয়েছে: “আমরা নবিজির (সা) সামনে উপস্থিত হলে আব্বাস তাঁর পক্ষে কথা বলা শুরু করেন। তিনি এভাবে শুরু করেন, “হে খাজরাজের লোকসকল (যদিও সেখানে কিছু আউসও ছিল), তোমরা আমাদের (বনু হাশিম) মধ্যে এই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা সম্পর্কে অবগত আছ। আমরা তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের রোষানল থেকে এযাবৎ রক্ষা করে এসেছি। আমাদের মধ্যে তার মর্যাদা সম্মান আছে। তিনি এতদিন ধরে আমাদের সুরক্ষাও পেয়ে আসছিলেন।

কিন্তু এখন তিনি আমাদের ছেড়ে তোমাদের কাছে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অতএব তোমরা যদি মনে কর যে, তোমরা তোমাদের শর্ত মোতাবেক চলতে পারবে এবং তাঁর সাথে ভিন্নমত পোষণকারীদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করতে পারবে, তাহলেই শুধু তোমরা এই দায়িত্ব নিয়ো। নতুবা তিনি তাঁর মতোই থাকুক। তোমাদের বুঝতে হবে, তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে একজন শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি।”

স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, আব্বাস খাজরাজদের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছেন না। ফলে এ নিয়ে তিনি খুব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। আবার তিনি লোকসমক্ষে কিছুটা বিব্রতও বোধ করছেন এই কারণে যে, তাঁর নিজের ভাতিজাকে নিজ গোত্র (বনু হাশিম) ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে, কারণ তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাই তিনি “তাঁর ভাতিজা মুহাম্মদের মর্যাদা, সম্মান, সুরক্ষা আছে’ ইত্যাদি বলে নিজেদের ব্যর্থতা কিছুটা ঢাকা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আসলে আবু তালিবের মৃত্যুর পর মক্কায় নবিজির (সা) নিরাপত্তা নিশ্চিত ছিল না।

এবার ইয়াসরিবের লোকেরা জবাবে বলল, “হে আব্বাস! আপনি তো আপনার কথা বলেছেন। এবার নবিজিকে (সা) কথা বলতে দিন। হে আল্লাহর রসুল (সা)! আপনি আমাদেরকে শর্ত দিন।” তখন নবিজি (সা) আল্লাহকে ভয় করার কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে পবিত্র কোরান থেকে তেলাওয়াত কিছুটা করলেন। তারপর বললেন, আমার প্রতি তোমাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার গ্রহণ করব। বিনিময়ে তোমরা “আমি আমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এমনভাবে, যেন আমি তোমাদেরই একজন।”

সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসরিববাসীর মধ্য থেকে আল-বারা ইবনে মারুর নামের একজন বললেন, “আমরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। এই শর্ত আমাদের জন্য পালন করা খুবই সহজ। আমরা আবশ্যই আপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। কেউ আপনাকে স্পর্শ করতে পারবে না। আপনার হাত বাড়িয়ে দিন, আমরা আপনার প্রতি আমাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার করব।”

প্রতিক্রিয়াটি তাৎক্ষণিক হলেও এখানে আল-বারার শক্ত ইমানের পরিচয়। পাওয়া যায়। তারপর তাঁদের মধ্যে থেকে আবু আল-হায়সাম ইবনুল তায়হান নামের আরেকজন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! ইহুদিদের সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সন্ধি আছে। আমরা জানি, আপনাকে আমাদের কাছে নিয়ে যাওয়ার কারণে সেই সন্ধি ভেঙে যাবে। আপনি যখন আমাদের কাছে আসবেন এবং আল্লাহ যখন আমাদের বিজয় দান করবেন, তখন কি আপনি আমাদের ছেড়ে আপনার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাবেন?”

লক্ষ করুন, আবু আল-হায়সাম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করছেন যে মুহাম্মদই (সা) আল্লাহর রসুল, এবং তাঁদের ইন্সিত বিজয় একদিন আসবেই। কিন্তু তাঁর ভয় হলো, তাঁদের বিজয় আসার পর যদি নবিজি (সা) মক্কায় ফিরে যান, তাহলে তাঁরা ইহুদিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হবেন। নবিজি (সা) হেসে জবাব দিলেন, “না। আমার রক্তই তোমাদের রক্ত, আমার বিনাশই তোমাদের বিনাশ (অর্থাৎ আমরা একসঙ্গে বাঁচব, মরলে একসঙ্গেই মরব)। M কী সুন্দর কথা! নবিজি (সা) তাঁদের সুস্পষ্টভাবে আশ্বাস দিচ্ছেন, এখন থেকে তিনি স্থায়ীভাবেই ইয়াসরিবে বসবাস করবেন। তাঁরা আসলে এই প্রতিশ্রুতিটিই শুনতে চেয়েছিলেন, এবং তা পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন।

 

বনু আবদ আল-আশালের উসায়রিম | আকাবার প্রথম অঙ্গীকার | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

এখানে ইয়াসরিববাসীর ইমানের শক্তি লক্ষ করুন। আবার এর বিপরীতে দেখুন কিনদার লোকদের মধ্যে যারা বিজয়ের পরে ‘নেতৃত্ব’ পেতে চেয়েছিল আউস ও খাজরাজ উপজাতি ছিল কাহতানি আরব। তাঁদের বংশের ধারা ছিল। কুরাইশদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাঁরা ছিলেন ইয়েমেনের মানুষ। অনেক হাদিস রয়েছে যেখানে নবিজি (সা) ইয়েমেনিদের প্রশংসা করেছেন। সেগুলোর মধ্যে একটি “ইয়েমেনিরা অন্তরে বেশ কোমল এবং আচরণে অত্যন্ত ভদ্র।” অর্থাৎ তাঁরা খুব ভালো মানুষ। আমরাও এখানে আউস ও খাজরাজের মধ্যে বিচক্ষণতার পরিচয় পাই।

নবিজি (সা) সেদিন যে কথা দিয়েছিলেন, তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছেন। আমরা পরবর্তীকালে দেখতে পাব, মক্কা বিজয়ের পর সেখানকার সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেও নবিজি (সা) মদিনাতেই ফিরে যান। মক্কায় তো খাদিজার (রা) বাড়ি ছিল, যেখানে তিনি ২৫ বছর বসবাস করেছেন। সেখানে ছিল আৰু তালিবের বাড়ি, যেখানে তিনি বালক বয়স থেকে বেড়ে উঠেছিলেন। তিনি চাইলে মক্কায় থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি মদিনায় ফিরে গিয়েছিলেন এবং জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সেখানেই বসবাস করেছেন। সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়েছে।

ইয়াসরিববাসী বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! অঙ্গীকার হিসেবে আপনাকে আমাদের কী বলতে হবে?” নবিজি (সা) তাঁদের বললেন, “তোমরা অঙ্গীকার করবে যে, কষ্ট ও স্বস্তি উভয় সময়েই তোমরা আমার কথা শুনবে, মেনে চলবে, আল্লাহর পথে তোমাদের অর্থ ব্যয় করবে, সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ পরিহার করবে, যা-ই হোক না কেন সদা সত্য কথা বলবে, আর আমি মদিনায় যাওয়ার পর আমাকে তেমনইভাবে সাহায্য করবে যেমনভাবে তোমরা নিজ নিজ পরিবারকে সাহায্য কর।”

এখানে ইসলামের ধর্মীয় শর্তের সঙ্গে রাজনৈতিক শর্তও রয়েছে। নবিজির (সা) কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে একজন বলে উঠলেন, “এর বিনিময়ে আমরা কী পাব?” নবিজি (সা) এক কথায় জবাব দিলেন, “জান্নাত।” তাঁরা আসলে এই কথাটিই শুনতে চেয়েছিলেন। এখানে অর্থ, খ্যাতি, বা সৌভাগ্যের কথা নেই। জান্নাতের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা সবাই অঙ্গীকার করার জন্য উঠে দাঁড়ালেন।

অন্য কেউ নবিজির (সা) হাত স্পর্শ করার আগেই আসাদ ইবনে জুরারা নবিজির (সা) হাত ধরে চেপে তা নামিয়ে রেখে সকলকে বললেন, “সবাই একটু অপেক্ষা করুন।” [স্মরণ করুন, এই আসাদ ইয়াসরিব থেকে আসা প্রথম ছয়জন, ইসলাম গ্রহণকারীর একজন] তিনি বললেন, “হে ইয়াসরিবের লোকেরা! এই ব্যক্তি যে আল্লাহর রসুল তা নিশ্চিতভাবে জেনেই আমরা এতটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। কুরাইশরা তাঁকে বহিষ্কার করার পর তোমাদেরকে যুদ্ধ করতে বলা হবে (অর্থাৎ নবিজি (সা) কুরাইশদের ত্যাগ করার পর তারা তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা করবে)।

তোমরা যদি প্রস্তুত থাকো যে তোমাদের ঘাড়ে তলোয়ারের আঘাত আসতে পারে (অর্থাৎ যদি তোমরা মরতে প্রস্তুত থাকো), তবেই তাঁর কাছে আনুগত্যের অঙ্গীকার করো। আর মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে সেরা ব্যক্তিরা মৃত্যুবরণ করবে, পিতারা পুত্রদের হারাবে, পুত্ররা পিতাদের হারাবে, এবং তোমরা নিজেদেরও মৃত্যুর কারণ হবে। তোমরা যদি এর জন্য প্রস্তুত থাকো, তবে তাঁর কাছে অঙ্গীকার করো। নতুবা এখনই থামো, আল্লাহ সম্ভবত তোমাদের ক্ষমা করবেন। “

অর্থাৎ ‘এটা কোনো হালকা বিষয় নয়। এটাই শেষ সুযোগ। একবার যদি তোমরা তাঁর হাতে হাত রাখো, তাহলে আর ফিরে আসা যাবে না। এখানে আমরা আসাদের বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাই। তিনি চাননি তাঁর উপজাতির ওপর আল্লাহর শাস্তি নেমে আসুক, যদি তাঁরা শেষ পর্যন্ত বলেন যে তাঁরা এতটা করতে পারবেন না। এ পর্যায়ে ইয়াসরিববাসী বললেন, “হে আসাদ, তুমি অনেক কথা বলেছ। এবার তুমি নবিজির (সা) হাতের ওপর থেকে তোমার হাতটা সরিয়ে নাও। আমরা তাতে আমাদের হাত রাখতে চাই।”

তারপর ৭২ জন পুরুষ একের পর এক এগিয়ে গিয়ে নবিজিকে (সা) তাঁদের অঙ্গীকার (বাইয়াত) প্রদান করলেন। আর যে দুইজন নারী সেখানে উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের আনুগত্যের অঙ্গীকার মৌখিকভাবে গ্রহণ করা হলো। নবিজি (সা) তাঁদের হাত স্পর্শ করলেন না। অঙ্গীকারের পর্ব শেষ হওয়ার পর আব্বাসকে খুবই উৎকণ্ঠিত মনে হলো। তিনি শুধু বললেন, “এরা সবাই অনেক কম বয়সের। এদের কাউকেই আমি চিনি না।” আব্বাস আসলে তাঁর ভাতিজার নিরাপত্তা নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। তবে তিনি ইয়াসরিবের ওই লোকদের না চিনলেও আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল ও তাঁর রসুল (সা) তাঁদের নিশ্চিতভাবেই চিনতে পেরেছিলেন।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment