বনু শায়বান ইবনে সালাবা | ইয়াসরিবের জন্য বীজ রোপণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

বনু শায়বান ইবনে সালাবা | ইয়াসরিবের জন্য বীজ রোপণ, নবি করিম (সা) ইসলাম প্রচারের জন্য সাধারণত আবু বকরকে (রা) সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন উপজাতির কাছে যেতেন। কারণ আবু বকর (রা) ছিলেন বংশানুক্রম বিষয়ে অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। ( এখানে লক্ষণীয়, নবিজি (সা) বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরিচিতদের জ্ঞান কাজে লাগাতেন। আল্লাহর রসুলের (সা) ক্ষেত্রেই যদি এমন হতে পারে, তাহলে আমরা কেন তা করব না? কিন্তু অনেক মুসলিম গোষ্ঠী এটাকে সঠিক মনে করে না। তারা ভাবে, নবিজি (সা) অন্য লোকেদের জ্ঞান থেকে উপকৃত হবেন, তা কীভাবে সম্ভব? কিন্তু আমরা এই উদাহরণ থেকে তাঁর মানবসত্তার পরিচয় পাই। তিনি আল্লাহর রসুল হলেও তাঁর তো সব বিষয়ে জ্ঞান ছিল না।

 

বনু শায়বান ইবনে সালাবা | ইয়াসরিবের জন্য বীজ রোপণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

বনু শায়বান ইবনে সালাবা | ইয়াসরিবের জন্য বীজ রোপণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

যা-ই হোক, নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) বনু শায়বান ইবনে সালাবা গোত্রের কাছে গেলেন। আবু বকর (রা) তাদের সালাম জানালেন। এর অর্থ, সৌজন্যের সঙ্গে তাদের জিজ্ঞেস করা, ‘আপনারা কারা?’ জবাবে তারা বলল, ”আমরা বনু শায়বান ইবনে সালাবা।” আবু বকর (রা) নবিজির (সা) দিকে কিছুটা ঝুঁকে ফিসফিস করে বললেন, “হে আল্লাহর রসুল! বনু শায়বান আরবদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাবান ও বুদ্ধিমান উপজাতি। তারা উদারতা ও আন্তরিকতার জন্য প্রসিদ্ধ।”

বনু শায়বানের নেতারা: আপনাদের কী বিষয়?

নবিজি (সা): আমরা শুধু আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আপনাদের আমন্ত্রণ জানাতে এসেছি। আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আপনারা মিথ্যা দেবতাদের প্রত্যাখ্যান করুন। সেইসঙ্গে আমাদেরকে আপনাদের মাঝে গ্রহণ করে নেওয়ার জন্যও অনুরোধ করছি। কুরাইশরা আমাদের সাথে উদ্ধত আচরণ করছে এবং আল্লাহর বাণী প্রচারে বাধা দিচ্ছে। আল্লাহ স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং প্রশংসনীয় (এর অর্থ, আমি আপনাদের কাছে সাহায্য চাইছি, কিন্তু আল্লাহর আপনাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই)।

বনু শায়বানের নেতারা: আপনাদের কি আরও কিছু বলার আছে? তখন নবিজি (সা) তাদের সুরা আনফালের দুটি বিখ্যাত আয়াত [৬:১৫১- ১৫২]

তেলাওয়াত করে শোনালেন:

“বলো, ‘এসো তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা হারাম করেছেন তা তোমাদের পড়ে শোনাই। তা এই তোমরা তাঁর কোনো শরিক করবে না, পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের জন্য তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, আমিই তোমাদের ও তাদের আহার দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক, অশ্লীল আচরণের কাছে যেও না। আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না। তোমাদের তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা বুঝতে পার।”

“তোমরা এতিমদের বয়স (সাবালক) না হওয়া পর্যন্ত সৎ উদ্দেশ্য ছাড়া তার সম্পত্তির কাছে যেও না। আর তোমরা পরিমাপ ও ওজন ন্যায্যভাবে করবে। আমি কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্বভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন আপন স্বজনের বিরুদ্ধে হলেও ন্যায্য বলবে আর আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এইভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।”

নীতি ও নৈতিকতা বিষয়ে এই আয়াতগুলো শুনে বনু শায়বানের নেতারা বললেন, “আরও কি কিছু বলার আছে?” এবার নবিজি (সা) সুরা নাহলের এই আয়াতটি [১৬:৯০] পড়ে শোনালেন “আল্লাহ অবশ্যই ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়স্বজনদের দান করার নির্দেশ দেন। আর তিনি অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন করাকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

বনু শায়বানের এক নেতা বললেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, আপনি সত্য বার্তা নিয়ে এসেছেন এবং আমাদের উত্তম নৈতিকতার পথে আহ্বান করছেন। আর কুরাইশরা আপনার বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা বলছে।” লক্ষ করুন, নবিজির (সা) প্রতি কুরাইশদের আচরণ সম্পর্কে তিনি আসার আগেই বনু শায়বানের নেতারা অবগত ছিলেন। এ থেকে ধারণা করা যায়, নবিজির (সা) বার্তা ও কুরাইশদের বিরোধিতার খবর ইতিমধ্যে আরবের অন্যান্য জনগোষ্ঠী জেনে গিয়েছিল।

যা-ই হোক, এ পর্যায়ে বনু শায়বানের পক্ষ থেকে হানি ইবনে কায়েস নামের এক প্রবীণ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “হে কুরাইশের সদস্য (মুহাম্মদ), আপনি যা বলেছেন, তা আমি শুনেছি। আমি মনে করি, আমরা যদি আপনার সঙ্গে এই প্রথমবার সাক্ষাতের পরই আমাদের ধর্ম ত্যাগ করি, তবে তা হবে আমাদের জন্য অত্যন্ত তাড়াহুড়ো সিদ্ধান্ত। এতে আমাদের ক্ষতি হতে পারে। আমাদের উপজাতির এমন অনেককে আমরা রেখে এসেছি, যাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে। সুতরাং আমি মনে করি, আমাদের অপেক্ষা করা উচিত এবং আপনারও অপেক্ষা করা উচিত। আমরা এবার ফিরে যাব। আশা করব, আপনিও আবার (পরের বছর) আসবেন।”

তারপর নেতারা তাঁদের সেনাপ্রধান মুসান্না ইবনে হারিসাকে বললেন, “তুমি কী বল?” সেনাপ্রধান জবাবে বললেন, “আমাদের মুরুব্বি হানি ইবনে কায়েস যা বলেছেন তা ঠিকই বলেছেন। এ বিষয়ে আমাদের তাড়াহুড়ো করা মোটেই ঠিক হবে না। তা ছাড়া আরও যে বিষয়টি আমাদেরকে খেয়াল রাখতে হবে, তা হলো, আরও দুটি পক্ষের সঙ্গে আমাদের চুক্তি রয়েছে। একটি আমাদের প্রতিবেশী আরব গোত্রগুলোর সঙ্গে, অন্যটি পারস্য সম্রাট কিসরার সঙ্গে।

আরবদের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে আমাদের তেমন কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কিসরার সঙ্গে চুক্তিতে আরব উপদ্বীপের সব বিষয়ে আমাদের নিরপেক্ষ থাকার কথা বলা আছে। এখন আমরা যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করি তাহলে সম্রাট কিসরা তা মেনে নেবেন বলে মনে হয়। না। অর্থাৎ আমাদের সুরক্ষা আরবদের ক্ষেত্রে কাজ করলেও কিসরার ক্ষেত্রে কাজ করবে না।” বনু শায়বানের সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, বনু শায়বানের বসবাস ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে। এখানে সেনাপ্রধান মুসান্না মূলত বলতে চেয়েছেন, ‘আমরা মুহাম্মদকে পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করতে পারব না।”

 

বনু শায়বান ইবনে সালাবা | ইয়াসরিবের জন্য বীজ রোপণ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আমরা জানি, সেই সময় পারস্য সাম্রাজ্য ছিল একটি উল্লেখযোগ্য পরাশক্তি। সম্রাট কিসরা ছিলেন সেই অঞ্চলে অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সব শুনে নবিজি (সা) বললেন, “আপনাদের বক্তব্য যথার্থ এবং ন্যায্য। তবে আল্লাহর দ্বীনকে কেবল তারাই সাহায্য করতে পারবে যারা এই দ্বীন সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করবে।” ফিরে যাওয়ার আগে নবিজি (সা) বললেন, “আমি যদি আপনাদের বলি, আল্লাহ আপনাদের কিসরার রাজত্বের ওপরে বিজয় দান করবেন এবং আপনারা তাদের জমিজমা, অর্থ ও বন্দি নারীদের দখল নিতে পারবেন, তাহলে কি আপনারা আমাকে গ্রহণ করবেন?”তখন বনু শায়বানের এক অপেক্ষাকৃত তরুণ বললেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই।” কিন্তু বনু শায়বানের প্রবীণেরা এই ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্বাস করতে পারলেন না।

[প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, আরও কয়েক বছর পর নবি করিম (সা) পারস্য সম্রাট কিসরাকে ইসলাম গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে একটি চিঠি পাঠান। সম্রাট চিঠিটি ছিড়ে ফেলে দেয়। নবিজি (সা) তা জানতে পেরে বলেন, “সে যেমন আমার চিঠিটি ছিঁড়ে ফেলেছে, আল্লাহ তায়ালাও তার রাজত্ব তেমনি ছিঁড়ে ফেলবেন।” ইতিহাস থেকে আমরা জানি, ৪০০ বছর ধরে চেষ্টা করেও রোমানরা পার্সিয়ানদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই মুসলিমদের হাতে তাদের (পার্সিয়ানদের) পতন ঘটে এবং তারা অস্তিত্বহীন এক ইতিহাসে পরিণত হয়। এখনকার সময়ের ইরাক, ইরান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান ইত্যাদি এলাকা নবিজির (সা) মৃত্যুর কয়েক বছরের মধ্যেই মুসলিম ভূখণ্ডে পরিণত হয়। কীভাবে তা সম্ভব হয়েছিল, ইতিহাসবিদেরা আজ পর্যন্ত সেই রহস্যের কূলকিনারা পাননি।

প্রকৃতপক্ষে, সেই সময় পার্সিয়ানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোমান সাম্রাজ্য পতনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। পার্সিয়ানরা যুদ্ধে জিতে গিয়েছিল। আল্লাহ তায়ালাও সুরা রুমে বলেছেন, “আলিফ লাম মিম। রোমানরা পরাজিত হয়েছে।” [৩০:১-২] একপর্যায়ে দামেস্কও রোমানদের হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। কিন্তু এই বিষয়টি কারও ধারণায় ছিল না যে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেই দামেস্কও মুসলিমদের দখলে চলে আসবে এবং পারস্য সাম্রাজ্যের পুরোপুরি পতন ঘটবে।

এ ছিল সত্যিই এক বিস্ময়কর ব্যাপার, যা বুঝতে হলে পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস ও বিত্তবৈভব সম্পর্কে জানতে হবে। তাদের প্রাসাদগুলো সম্পর্কে জানতে শুধু “Clesiphon Palace” লিখে গুগল করে ছবিগুলো দেখুন। বিশাল বিশাল প্রাসাদের অসংখ্য ছবি দেখতে পাবেন। এই শক্তিশালী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক নতুন ধর্মে দীক্ষা নেওয়া এবং সামরিক দিক থেকে আনাড়ি একদল বেদুইন জয়লাভ করেছিল। নবিজি (সা) বনু শায়বানকে ঠিক এই ভবিষ্যদ্বাণীটিই করেছিলেন।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment