বয়কটের সমাপ্তি | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

বয়কটের সমাপ্তি | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট, বেশ কয়েকটি ঘটনার ফলে অবশেষে বয়কটের অবসান ঘটে।

বয়কটের সমাপ্তি | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

বয়কটের সমাপ্তি | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

১) নবি করিম (সা) কুরাইশদের বিরুদ্ধে দোয়া করেন, “হে আল্লাহ! ইউসুফের (আ) সময় যে খরা ও দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তাদের তেমন দুর্ভিক্ষে নিপতিত করুন।” আল্লাহ তায়ালা নবিজির (সা) এই দোয়া কবুল করেন। মক্কার কুরাইশদের জন্য দুর্ভিক্ষ এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তারা মৃত পশু ও তাদের চামড়া পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়েছিল। তারা বুঝতে পারছিল যে, এই দুর্ভিক্ষ হয়তো মুহাম্মদের (সা) দোয়ার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। ফলে তারা বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করেছিল।

২) কুরাইশদের মধ্যে কিছু কোমল হৃদয়ের মানুষ বিষয়টা উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত নিল, এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তাদের কিছু করা উচিত। তাদের অন্যতম প্রধান ছিলেন হিশাম ইবনে আমর হিশাম তাঁর বন্ধু তুহায়ের ইবনে আবি উমাইয়ার কাছে গেলেন। জুহায়ের ছিলেন নবিজির (সা) ফুপু আতিকার ছেলে, সেই অর্থে তিনি ছিলেন আবদুল মুত্তালিবের নাভি। হিশাম ও জুহায়ের নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন, ‘এই বয়কটের সমাপ্তি ঘটাতে আমরা কী করতে পারি?’ তাঁরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন, তাঁদের মতের পক্ষে প্রথমে একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে হবে। সুতরাং তাঁরা তাঁদের সমমনাদের একত্রে সমবেত করার উদ্যোগ নিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিল মুর্তিম ইবনে আলি, আৰু আল-বুখতুরি ইবনে হিশামসহ কয়েকজন। তাঁরা শলাপরামর্শ করে পরের দিন ‘মাদি’তে (পার্লামেন্টে) বিষয়টা উত্থাপন করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

পরিকল্পনামাফিক পরের দিন তাঁরা কাবায় গিয়ে নিজ নিজ আসন গ্রহণ করলেন। আলোচনার শুরুতেই জুহায়ের উঠে দাঁড়িয়ে প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। জুহায়ের: আমরা আর কতদিন আমাদের নিকট আত্মীয়স্বজনদের অনাহারে মরতে দেব? একটা জঘন্য রকমের খারাপ কাজ করছি। আবু জেহেল (অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে চেঁচিয়ে): তুমি নিজেকে কী মনে কর? আমরা সবাই এই চুক্তিতে রাজি হয়েছিলাম।

হিশাম (আবু জেহেলের কথা শেষ হতে না হতেই): না, আমি মানলাম না। আপনি একাই শুধু এতে রাজি ছিলেন। এটা ছিল একান্তই আপনার পরিকল্পনা। আবু জেহেল: আমার পরিকল্পনা বলতে তুমি কী বোঝাতে চাচ্ছ? আমরা বৈঠক করে সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। মুতিম: না, আমরা রাজি ছিলাম না। তুমি আমাদের ওপর জোর করে তোমার সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে দিয়েছিলে।

আবু জেহেল: না, আমি জোর করিনি।

জুহায়েরের পরে আবু আল-বুখতুরি উঠে দাঁড়ালেন। এভাবে এক এক করে প্রত্যেকেই প্রকাশ্যে আবু জেহেলকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করলেন। তাকে সমর্থন করার কেউ রইল না। একের পর এক চ্যালেঞ্জ আসতে দেখে আবু জেহেল বলল, “বুঝেছি, বুঝেছি। নিশ্চয়ই তোমরা সবাই আগে থেকেই পরিকল্পনা করে এসেছ।” তবে তাঁরা তা স্বীকার করলেন না। আসলে সেই সময় জনসমর্থন আবু জেহেলের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল।

৩) তারপর এমন এক ঘটনা ঘটে যার ফলে পুরো পরিস্থিতিই পাল্টে যায়। নবিজি (সা) একদিন আবু তালিবের কাছে গিয়ে বললেন, “হে আমার চাচা! আল্লাহ আমাকে জানিয়েছেন, তারা যে চুক্তিপত্র লিখে রেখেছিল তা উইপোকা ও পিঁপড়া খেয়ে ফেলেছে, শুধু ‘আল্লাহর নামে’ বাক্যাংশটুকু অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে।” চুক্তিপত্রটি কাবাঘরের ভেতরে সিলযুক্ত থলেতে তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল, সেখানে কারও প্রবেশ করার সুযোগ ছিল না। সুতরাং নবিজির (সা) পক্ষে এ বিষয়টি জানা ছিল এক কথায় অসম্ভব। নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালাই তাকে এ কথা জানান ।

আবু তালিব জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার প্রতিপালক তোমাকে এ কথা বলেছে?” নবিজি (সা) খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হ্যাঁ-সূচক জবাব দিলেন। চুক্তির পর এই প্রথমবারের মতো আৰু তালিব নিজ গোত্রের কয়েকজন অমুসলিম সহযোগী নিয়ে উপত্যকা ছেড়ে শহরের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, এখানেও আমরা জাহেলি যুগে নিজ গোষ্ঠীপ্রীতির প্রমাণ দেখতে পাই । বনু হাশিম গোত্রের নির্বাসিতরা সবাই মুসলিম ছিল না। কিন্তু এই বয়কটের সময় তারা নিজ গোত্রের একজনকে (মুহাম্মদকে) সুরক্ষা দেওয়ার জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল আবু লাহাব, যে কাপুরুষের মতো প্রকাশ্যে নিজ গোত্রের নিন্দা করে বলেছিল, “বনু হাশিমের সঙ্গে আমার আর কোনো সম্পর্ক নেই।”

 

বয়কটের সমাপ্তি | উমর ও হামজার ইসলাম গ্রহণ এবং বয়কট | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আবু তালিব হারামের কাছে গিয়ে বললেন, “হে আমার সম্প্রদায়। এসো, আমরা সবকিছু ভুলে গিয়ে চুক্তিটি এনে দেখি, আমরা কোনো সমঝোতায় আসতে পারি কি না।” এ কথায় কুরাইশরা খুশি হয়ে উঠল। তারা ভাবল, আবু তালিব নিশ্চয়ই এবার মুহাম্মদকে (সা) তাদের কাছে হস্তান্তর করবে। তাই তারা কাবাঘরের ভেতর থেকে থলেসহ চুক্তিপত্রটি নিয়ে এল। এবার আবু তালিব বললেন, “আমার ভাতিজাকে তাঁর প্রতিপালক বলেছেন, চুক্তিপত্রটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। একমাত্র ‘আল্লাহর নামে’ বাক্যাংশটি ছাড়া বাকি সবই পোকায় খেয়ে ফেলেছে । এখন তোমাদের কাছে আমার চ্যালেঞ্জ, এ কথা যদি ঠিক হয় তাহলে আমরা মক্কায় ফিরে যাব। আর যদি ঠিক না হয়, তাহলে আমি তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব।” লক্ষ করুন, আবু তালিব নিশ্চিত ছিলেন যে নবিজি (সা) যে সত্য বলছেন।

মক্কার কুরাইশরা বলল, “অবশ্যই!” তারা উৎসাহের সঙ্গে কাপড়টি খুলল এবং অবাক হয়ে দেখল, সত্যিই ‘আল্লাহর নামে’ বাক্যাংশটি ছাড়া চুক্তিপত্রটির কিছুই অবশিষ্ট নেই। সুবহানআল্লাহ! তারা ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, “নিশ্চয়ই এখানে জাদু করা হয়েছে।” কিন্তু যেহেতু তারা আগেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাই কিছুই করতে পারল না। ফলে চুক্তিটি বাতিল হয়ে গেল; বনু হাশিম ও বনু মুত্তালিব মক্কায় ফিরে এল।

সেই সময় আৰু তালিব চমৎকার প্রাঞ্জল আরবিতে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটিকে ‘আবি তালিবের লামিয়াহ’ বলা হয়, কারণ এর প্রতিটি ছত্র আরবি ‘লাম’ অক্ষর দিয়ে শেষ হয়। প্রায় ১০০ লাইনের কবিতাটি সেই যুগের অন্যতম সেরা কবিতা হিসেবে স্বীকৃত। ইবনে কাসিরের বর্ণনা অনুসারে, কাব্যশৈলী, বিষয়বস্তু, সাহিত্যিক মান ও ছন্দের বিচারে সেটি ছিল সেই সময়ের মক্কার ‘সাতটি ঝুলন্ত কবিতা’র চেয়েও উন্নততর। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘সাতটি ঝুলন্ত কবিতা’ ছিল। ৬ষ্ঠ শতাব্দীর আরবের সাত সেরা কবির সাতটি সেরা কবিতার সংকলন যা লিনেনের ওপর সোনালি অক্ষরে লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। নবিজি (সা) ও সাহাবিরা বয়কট শুরু হওয়ার আনুমানিক আড়াই বছর পরে মক্কায় ফিরে আসেন। এখন দাওয়াতের দশম বছর এবং নবিজির (সা) বয়স প্রায় ৪৯ বছর।

আরো পড়ূনঃ

Leave a Comment