মক্কায় প্রত্যাবর্তন | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

মক্কায় প্রত্যাবর্তন | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩, নবি করিম (সা) জেরুসালেমে ফিরে আবারও বোরাকে চড়ে বসলেন। এ হচ্ছে সেই একই বোরাক যার ওপর সওয়ার হয়ে তিনি মক্কা থেকে জেরুসালেমে গিয়েছিলেন। তিনি মিরাজে যাওয়ার আগে বোরাকটিকে সেখানে বেঁধে রেখেছিলেন। কয়েকটি বর্ণনা অনুসারে (যা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়), মক্কায় ফেরার পথে নবিজি (সা) কুরাইশদের তিনটি কাফেলা পার হয়ে এসেছিলেন, তিনি সেগুলো চিনতে পেরেছিলেন। একটি কাফেলায় তিনি পরিচিত এক কুরাইশকে দেখতে পান। দ্বিতীয় কাফেলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি তৃষ্ণার্ত বোধ করলে সেখানকার জলাধার (যা ছিল জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত) থেকে পানি পান করেন। তৃতীয় কাফেলাটিতে তিনি এক ব্যক্তিকে দেখতে পান যিনি তাঁর হারিয়ে যাওয়া উটের সন্ধান করছিলেন।

মক্কায় প্রত্যাবর্তন | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মক্কায় প্রত্যাবর্তন | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মক্কায় ফিরে এসে নবিজি (সা) প্রথমে একটু ঘুমিয়ে নেন, তারপর হারামে জেগে ওঠেন। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ইসরা মক্কা থেকে বায়তুল মাকদিস পর্যন্ত গিয়ে আবার সেখান থেকে মক্কায় ফিরে এসে সমাপ্ত হয়, যা কোরানের বর্ণনার সঙ্গেও মিলে যায়: “পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে তাঁর নিদর্শন দেখাবার জন্য রাতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদ আল-হারাম থেকে মসজিদ আল-আকসায়, যেখানকার পরিবেশকে আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাবার জন্য । তিনি তো সব শোনেন, সব দেখেন।” [১৭:১] নবিজি (সা) ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর নিজের জবানিতেই সাহাবিদের কাছে ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “পরের দিন সকালে যখন আমি ঘুম থেকে উঠলাম, তখন আমি লোকদেরকে কীভাবে ঘটনাটি (কী হয়েছিল তা) বলব, তা নিয়ে এক ধরনের উদ্বেগ অনুভব করলাম।

এ থেকে আমরা নবিজির (সা) স্বাভাবিক মানবিক সত্তার পরিচয় পাই। অনুমান করা যায়, আল্লাহ তায়ালা ঘটনাটি সবাইকে বলার জন্য মণিজিকে (সা) নির্দেশ দিয়েছিলেন। কারণ আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তাঁর পক্ষ থেকে সবাইকে তা বলার কথা নয়। তিনি আরও বলেছেন, “আমি যখন কিছুটা উদ্বিগ্ন বসে ছিলাম, তখন ‘আল্লাহর শত্রু’ আবু জেহেল সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে সে অবস্থায় দেখতে পেল।”

আবু জেহেল নবিজিকে (সা) ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞেস করল: তোমার কী হয়েছে? কিছু ঘটেছে কী?  নবিজি (সা): হ্যাঁ, একটা ঘটনা ঘটেছে।

আবু জেহেল: সেটা কী? 

নবিজি (সা): গত রাতে আমাকে এখান থেকে জেরুসালেমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

আবু জেহেল বিস্মিত হয়ে): তুমি কি এই জগতে আছ (অর্থাৎ তুমি কি ঠিকঠাক আছ)? [নবিজি (সা) এ ব্যাপারে পরবর্তীকালে সাহাবিদের কাছে বর্ণনা করেছেন, “আবু জেহেল ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছিল না, সে আমার সঙ্গে সেই মুহূর্তেই ঠাট্টা-বিদ্রুপ শুরু করবে, না কি লোকজন ডেকে এনে সবার সামনে তা করবে, যাতে আমি যা বলেছি তা থেকে সরে আসতে না পারি।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

নবিজি (সা): হ্যাঁ, আমি এখানে আপনাদের সবার মধ্যেই জেগে আছি। আবু জেহেল: আমি যদি এখন তোমার সম্প্রদায়ের (কুরাইশ) লোকদেরকে ডেকে আনি তবে কি তুমি আমাকে যা বলেছ তা ঠিকঠিক করে তাদেরকে বলবে? নবিজি (সা)। হ্যাঁ, আমি তা করব।

নবিজির (সা) মুখে এ কথা শোনার পর আবু জেহেল চিৎকার করে বলতে লাগল, “সবাই বেরিয়ে এসো। আমার একটা ঘোষণা আছে।” সেই সময় মক্কা ছিল একটি ছোট শহর। শহরের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব আৰু জেহেলের ডাকে সব লোক সেখানে কৌতূহল নিয়ে জড়ো হলো। আবু জেহেল নবিজিকে (সা) উদ্দেশ করে বলল, “তুমি আমাকে যা বলেছ, এখন তা সবাইকে বলো।”

তখন নবিজি (সা) উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ করে বললেন, “গত রাতে আমি বায়তুল মাকদিসে গিয়েছিলাম এবং মসজিদুল আকসায় নামাজ পড়েছি।” লক্ষ করুন, এখানে কিন্তু মিরাজের উল্লেখ নেই। সম্ভবত আল্লাহ তায়ালা তখন তাঁকে শুধু ইসরার কথা উল্লেখ করতে বলেছিলেন। তিনি মিরাজের ঘটনা। পরে শুধু মুসলিমদের কাছে প্রকাশ করার জন্য রেখে দেন। নবিজির (সা) কথায় উপস্থিত জনতা নানাভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে। কেউ হাততালি দিতে থাকে, কেউ মাথায় হাত রাখে, কেউ চাপা হাসি হাসতে থাকে। তারা কী করবে তা ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারছিল না।  (সা) যেহেতু আগে কখনও মিথ্যা বলেছেন বলে কারও জানা ছিল না, তাই লোকেরা বিষয়টা শুনে শুরুতে হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

তাদের মধ্যে একজন, যে আগে একবার জেরুসালেমে গিয়েছিল, জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি এর (বায়তুল মাকদিসের) বর্ণনা দিতে পারবে?” কারণ তারা প্রত্যেকেই জানত, নবিজি (সা) আগে কখনো বায়তুল মাকদিসের ধারে-কাছেও যাননি। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বায়তুল মাকদিসের বর্ণনা দিতে শুরু করলেন। কিন্তু লোকজন তাঁকে একের পর এক প্রশ্ন করতে করতে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেল যে তিনি স্পষ্টভাবে আর কিছু স্মরণ করতে পারছিলেন না। হাদিসের বর্ণনা অনুসারে, তিনি উপর্যুপরি প্রশ্নের বেড়াজালে বিভ্রান্ত হয়ে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়েন। হাদিসে ব্যবহৃত শব্দটি ‘কুরবা’; এর আক্ষরিক অর্থ আতান্ত হওয়া। প্রশ্নগুলো যুক্তিসিদ্ধ হলেও তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কারণে সবকিছু মনে করতে পারছিলেন না। আসলে কোনো মানুষের পক্ষেই সবকিছু স্মরণে রাখা সম্ভব নয়।

নবিজি (সা) আরও বর্ণনা করেছেন, “আমি লোকদের প্রশ্নের কী জবাব দেব তা নিয়ে ভাবছিলাম। একপর্যায়ে আমি দেখতে পেলাম, বায়তুল মাকদিস দূর থেকে আমার দৃষ্টিতে উদ্ভাসিত হচ্ছে। আস্তে আস্তে তা বড় হতে হতে আকিল ইবনে আবি তালিবের বাড়ির ওপরে চলে এল। প্রিসঙ্গক্রমে, এটি ছিল আৰু তালিবের বাড়ি, যেখানে নবিজি (সা) বড় হয়েছিলেন। তারপর তারা যত প্রশ্ন করেছে, আমি সবগুলোইর যথাযথ উত্তর দিতে পেরেছি, কারণ আমি তখন দিব্যদৃষ্টিতে আমার সামনে বায়তুল মাকদিস দেখতে পাচ্ছিলাম।” অবশেষে তাদের মধ্যে একজন বলল, “মুহাম্মদ (সা) বায়তুল মাকদিসের যে বর্ণনা দিয়েছেন তা সম্পূর্ণ নির্ভুল।” ইবনে হিশামের বর্ণনা অনুসারে, এ সময় নবিজি (সা) তাদের বলেন, “আমি আপনাদের কিছু লক্ষণ (প্রমাণ) দেব।”

 

মক্কায় প্রত্যাবর্তন | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-৩ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

তিনি তিনটি কাফেলার বর্ণনা দেন এইভাবেঃ

  • প্রথম কাফেলাটি অমুক অমুকের, তারা শীঘ্রই ফিরে আসবে।
  • দ্বিতীয় কাফেলাটি অমুক অমুকের, তারা একটি উট হারিয়ে ফেলেছে। 
  • তৃতীয় কাফেলাটি অমুক অমুকের, তাদের একটি বড় পানির কলস ছিল, যা থেকে তিনি (নবিজি) পান করেছিলেন।

এ কথা শুনে আবু জেহেল বলল, “যদি তুমি একটি কাফেলাকে এরকম জায়গায় দেখে থাক, তবে সেটার তো ইতিমধ্যে মক্কায় পৌঁছে যাওয়া উচিত।” এসব কথাবার্তা চলতে চলতেই খবর পাওয়া গেল, প্রথম কাফেলাটি মক্কায় প্রবেশ করছে। আবু জেহেল সরেজমিনে গিয়ে দেখল, নবিজির (সা) বর্ণনা পুরোপুরি সঠিক। তখন সে ফিরে এসে বলল, “এটা পরিষ্কার একটা জাদু।” ইবনে হিশামে বর্ণিত আছে, “মুসলিমদের মধ্যে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে কেউ কেউ এই ঘটনা মেনে নিতে পারেনি; তাই তারা ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে।” তবে এই বর্ণনার সঙ্গে কোনো ইসনাদ নেই। এটা শুধু ইবনে হিশামেই আছে, অন্য কোনো সিরাহ গ্রন্থে নেই।

ইবনে হিশামের এই বর্ণনার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন থেকে যায় । শুরুতেই বলতে হবে, মক্কার যুগে কোনো মুসলিমেরই মুরতাদ হওয়ার (ধর্ম ত্যাগ করার) কোনো ঘটনা আমাদের জানা নেই। সহিহ বুখারির একটি হাদিস অনুসারে, হিজরতের সপ্তম বছরে রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে (যিনি তখন মুসলিম ছিলেন না) জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তাদের (মুহাম্মদের অনুসারীদের) মধ্যে কেউ কি ধর্ম গ্রহণের পরে ধর্মত্যাগ করেছে?” আবু সুফিয়ান উত্তরে বলেছিলেন, “না।” সুতরাং এটাই বাস্তব যে মক্কার সময়ে কেউ ইসলাম ত্যাগ করেনি। অতএব এটা নিশ্চিত যে ইবনে হিশামের এই বর্ণনা সঠিক নয়।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment