মদিনা সংবিধান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় | চুক্তি ও মদিনার সংবিধান | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

মদিনা সংবিধান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় | চুক্তি ও মদিনার সংবিধান, ১) এই সংবিধানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাটি হলো, নবিজি (সা) এখানে ধর্মের ভিত্তিতে সম্পর্কের সংজ্ঞা নির্ণয় করেছেন। আরবের ইতিহাসে এটি একটি অনন্য ঘটনা। তিনি বলেন, আনসার ও মুহাজির একই উম্মাহ; তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। কোনো ব্যক্তি ইমান আনার সঙ্গে সঙ্গে উম্মাহর অংশ হয়ে যাবেন। সুতরাং ‘আপনার বাবা কে ছিলেন তা দিয়ে আপনার পরিচয়’—এই জাতীয় বংশমর্যাদার ধারণা বা গোত্রব্যবস্থা মদিনায় আর কাজ করছিল না।

মদিনায় এখন আপনি নিজের পরিচয়েই পরিচিত। এই ধারণাটি সেই সময়ে ছিল সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। বেলাল (রা) ছিলেন একজন ক্রীতদাস। আর আবু বকর (রা) ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। মদিনা সংবিধান অনুসারে তাঁদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, দুজনে একই উম্মাহর অংশ। লক্ষ করুন, ‘উম্মাহ’ শব্দটি পবিত্র কোরানে বর্ণিত আছে [২৩:৫২]। “উম্মাহ’ শব্দটির মূল ধাতু ‘উম’, যার অর্থ ‘মা’। আবার ‘উম্ম’ শব্দটি এসেছে ‘আম্মা’ থেকে, যার অর্থ ‘কিছুর চেষ্টা করা’।

অতএব ‘আম্মা’ আমাদের আরাধ্য বিষয়। যখন কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করে, তখন সেই আরাধ্য তার হলো মা; ভাই মা এখানে ‘উম্মি’। আমরা যদি উম্মাহ শব্দটির অর্থের গভীরে যাই তাহলে দেখতে পাব, উম্মাহর প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে বন্ধন এত দৃঢ় হয় যেন তাদের সবার মা একজন, যেন তারা একটি পরিবার। অবশ্য উম্মাহ কথাটির আরও অনেক অর্থ রয়েছে। ইব্রাহিমকেও (আ) উম্মাহ বলা হতো, কারণ তাঁর ইমানের মান ও ভিত্তি এতই মজবুত ছিল যেন তিনি নিজে একাই পুরো একটি উম্মাহ।

 

মদিনা সংবিধান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় | চুক্তি ও মদিনার সংবিধান | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মদিনা সংবিধান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় | চুক্তি ও মদিনার সংবিধান | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

২) সংবিধানের বিভিন্ন ধারার মাধ্যমে নবিজি (সা) ইহুদিদের বিষয়ে অত্যন্ত ন্যায়নিষ্ঠার পরিচয় দেন। তিনি তাদের সঙ্গে আচরণে সম্মান বজায় রাখেন, তাদেরকে পূর্ণ অধিকার দেন। লক্ষ করুন, মদিনা সংবিধানে বলা হয়েছে, মুমিনদের পাশে ইহুদিরা আরেকটি উম্মাহ। অর্থাৎ ‘তোমরা একটি উম্মাহ, আমরাও একটি উম্মাহ, এবং আমরা একে অপরে মিলে দুটি উম্মাহ’। এখানে ইবনে ইসহাক যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন তা ‘মাআ’, যার অর্থ ‘সহ/সঙ্গে’। এটা অবশ্যই ইহুদিদেরকে সম্মান দেওয়ার একটি উদাহরণ।

তারা যদি সংবিধানের বিধানগুলো মেনে চলত, তাহলে সম্মানের সঙ্গে বসবাস করতে পারত। তাহলে তারাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতো। মুসলিমদের সাফল্য এলে তাদেরও সাফল্য আসত। কিন্তু তারা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছিল। সংবিধানে ধারাটি খুব পরিষ্কারভাবে বর্ণিত ছিল: ‘আমাদের বিরুদ্ধে পৌত্তলিকদের পক্ষ অবলম্বন করবে না’—কিন্তু বনু কুরায়জা সেই কাজটিই করেছিল। সংবিধানে আরো উল্লেখ ছিল, ইহুদি ও মুসলিমদের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে নবিজি (সা) তা নিষ্পত্তি করবেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

৩) এই সংবিধানের মধ্য দিয়ে নবিজি (সা) রাজনৈতিকভাবে মদিনার কার্যত (‘ডি ফ্যাক্টো’) নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। মদিনায় তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তাই তিনি তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য একটি সংবিধান তৈরি করতেই পারেন। সংবিধানে ইহুদি ও পৌত্তলিকদেরও স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে; কিন্তু যদি এমন কিছু ঘটে যা অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত হয় তাহলে তাদের অবশ্যই নবিজির (সা) কাছে আসতে হবে। এই সংবিধানের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আইনি রূপ পেল এবং মহানবি মুহাম্মদ (সা) পুরো মদিনার অবিসংবাদিত নেতা ও শাসক হিসেবে গৃহীত হলেন।

 

মদিনা সংবিধান থেকে আমাদের জন্য শিক্ষণীয় | চুক্তি ও মদিনার সংবিধান | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

৪) লক্ষ করুন, এখানে কোনো জিজিয়ার° উল্লেখ নেই। কারণ, আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে তখন পর্যন্ত জিজিয়ার বিধি-বিধানগুলো নাজিল হয়নি।

৫) ইসলামি শরিয়া পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলেও অনেকটাই নিশ্চিত করে। সন্দেহ নেই, আধুনিক সেক্যুলার রাষ্ট্রে যে মাত্রার স্বাধীনতা দেয়, ক্লাসিক্যাল ইসলামিক ফিকহ ততটা দেয় না। যেমন, একজন অমুসলিমের ধর্মপ্রচারের মাধ্যমে অন্যদের ধর্মান্তরিত করার অধিকার নেই। তবে বাইরে অনেক কিছু করার অনুমতি/স্বাধীনতা আছে। এমনকি অমুসলিমদের নিজেদের মধ্যে মন ক্রয়-বিক্রয়ের অনুমতিও রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment