মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১, কুরাইশদের আরেকটি কৌশলটি ছিল মিথ্যা অভিযোগ করা এবং অপবাদ দেওয়া। এটা করতে গিয়ে কুরাইশরা যতটা নিচে নেমে গিয়েছিল আগে কখনও তারা ততটা নিচে নামেনি। তাদের মিথ্যাচারগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটি পবিত্র কোরানে উল্লেখ আছে।

মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

ইসলামবিরোধীরা নবিজিকে (সা) নিয়ে আজ অবধি যেসব মিথ্যাচার করে সেগুলোর কোনোটিই কোরানে উল্লিখিত ওই মিথ্যা অভিযোগগুলোর বাইরে কিছু নয়। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি: “কাফেররা যখন এই উপদেশবাণী (কোরান) শোনে তখন ওরা তোমার দিকে (আগ্রাসী দৃষ্টি দিয়ে) এমনভাবে তাকায় যেন ওরা তোমাকে আছড়ে মেরে ফেলবে, আর বলে, ‘(মুহাম্মদ) সে তো এক পাগল’।”

[সুরা কলম, ৬৮:৫১] “(এই কিতাব আমার প্রতি নাজিল না হওয়া পর্যন্ত) আমি তো তোমাদের মধ্যে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, তবুও কি তোমরা বুঝবে না?” [সুরা ইউনুস, “এ কোনো গণকের কথাও নয়; যদিও তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করো।” [সুরা হাক্কা, ৬৯:৪২] “তবুও ওরা বলবে, ‘আমাদের দৃষ্টি মোহাবিষ্ট হয়ে গেছে, কিংবা আমরা হচ্ছি জাদুগ্রস্ত সম্প্রদায়’।”

[সুরা হিজর, ১৫:১৫] “(রসুলদের ব্যাপারে) এমনই (হয়ে এসেছে), ওদের পূর্ববর্তী মানুষদের কাছে এমন কোনো রসুল আসেনি, যাদের না তারা ‘জাদুকর কিংবা পাগল’ “আমরা জানি কী কথা তারা শুনতে চায়, যখন তারা তোমার কথা শোনে। কেননা, এইসব মিথ্যাচারী যখন একান্তে নিজেদের মধ্যে কথা বলে তখন (একে অন্যকে) বলে, ‘তোমরা তো এক জাদুগ্রস্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছ।” (সুরা বনি ইসরাইল, ১৭:৪৭ ) সাধারণভাবে অমুসলিমের মধ্যে যারা গভীরভাবে ইসলাম ধর্ম নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন তাঁরা এই মত পোষণ করেন যে, মুহাম্মদ (সা) নিজেকে নবি ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন, যা এক প্রকার পাগল হয়ে গিয়েছিলেন বলার শামিল, কারণ তাঁরা নবিজির (সা) আন্তরিকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ করতে পারেননি।

তবে কোনো ব্যক্তির পক্ষে শুধু একটি বিষয়ে পাগলের মতো আচরণ করা: আর অন্য সব বিষয়ে (যেমন, পারিবারিক মানুষ, সামাজিক নেতা ইত্যাদি হিসেবে) স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আচরণ করা অসম্ভব। তাঁরা এ-ও বলেন যে, মুহাম্মদ (সা) একজন উচ্চমার্গের কবি, যার রয়েছে আরবি ভাষার ওপর অগাধ দখল।

এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাদের পবিত্র কোরানে জানাচ্ছেন, “আমি রসুলকে কাব্যরচনা করতে শেখাইনি, আর এ তাঁর (নবি মর্যাদার) পক্ষে শোভনীয়ও নয়।” [সুরা ইয়াসিন, ৩৬:৬৯] একটি ভাষ্য অনুযায়ী, নবিজি (সা) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সম্ভবত দুই বা সর্বোচ্চ তিন লাইন কবিতা বলেছেন। আরেক ভাষ্য অনুসারে, তিনি জীবনে কখনই পুরো একটি কবিতা পড়েননি, সর্বোচ্চ অর্ধেক পর্যন্ত পড়েছিলেন।

রসুলের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগের বিষয়টি বুঝতে হলে আমাদের খালিদ ইবনে ওয়ালিদের পিতা ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার কাহিনিটি অবশ্যই জানতে হবে। সে সময়ে মক্কায় আরবি ভাষার সবচেয়ে বড় বিশারদ ছিলেন বনু মখজুম গোত্রের প্রধান ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা। ভাষার ওপর তাঁর দখল এত বেশি ছিল যে, তাঁকে তৎকালীন মক্কার সেরা কবি হিসেবে গণ্য করা হতো, অনেকটা ‘মক্কার শেকসপিয়ার’।

একবার নবি করিম (সা) কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন। আল-ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা প্রথমবারের মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে পুরো তেলাওয়াতটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন। এতে তিনি এতটাই বিমোহিত হয়েছিলেন যে আচার-আচরণের মধ্যেও তাঁর পরিবর্তিত মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছিল। সন্দেহ নেই, কোরানের সুর, শৈলী, ভাষা ইত্যাদি অনন্য ও নজিরবিহীন। এরই মধ্যে নবিজির (সা) তেলাওয়াত শুনে ওয়ালিদের মুগ্ধ হওয়ার খবরটা লোকমুখে মক্কা শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

সেই সময় মক্কার জনসংখ্যা ছিল খুব কম। সব খবরই সেখানে দ্রুত ছড়াত। ওয়ালিদ কোরানের সৌন্দর্য নিয়ে একটি সুন্দর গদ্য রচনা করেন: আল্লাহর কসম, আমি মুহাম্মদের (সা) মুখ থেকে একটু আগে যা শুনেছি, তা কোনো পুরুষ বা জিনের মুখ থেকে উৎসারিত হওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় । এর ছন্দ, মধুময়তা আর সৌন্দর্য সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে। এ রকম কিছু আমার জীবনে আর কখনোই শুনিনি। লোকেরা তাদের শ্রেষ্ঠ কবির পরাজয় স্বীকারে কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল।

আবু জেহেল খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার কাছে গিয়ে হাজির। আবু জেহেল। লোকেরা আপনার মুখে কোরানের প্রশংসা শুনে বেশ সন্ত্রস্ত হয়ে আছে। আপনি যতক্ষণ পর্যন্ত কোরানের বিরুদ্ধে কিছু না বলবেন, ততক্ষণ তারা আপনার ওপর সন্তুষ্ট হবে না।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

ওয়ালিদঃ তুমি আমাকে কী বলতে বলো? আমি তাই-ই বলব। [আৰু তালিবের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে এর তুলনা করুন। তিনি বলেছিলেন, ‘তোমাদের যা ইচ্ছা তাই-ই করতে পার।’] আবু জেহেল তাঁকে পাগল বলুন।

ওয়ালিদ: কিন্তু তিনি তো পাগল নন। সবাই জানে যে তিনি পাগল নন। আমরা অনেক পাগল মানুষ দেখেছি। কিন্তু তাঁর মধ্যে পাগলামির কোনো লক্ষণ নেই । আবু জেহেল বলুন তিনি ভাগ্যগণনাকারী।

ওয়ালিদ: তিনি ভাগ্যগণনাকারীও নন। তাঁর কাছে ভাগ্যগণনার সরঞ্জামাদি নেই । আবু জেহেল তাকে যাদুকর বলুন।

ওয়ালিদ: তিনি জাদুকরও নন। আবু জেহেল বলুন সে কবি।

ওয়ালিস: আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের মধ্যে সেরা কবি। আমি তোমাকে বলছি, আমরা যে কবিতার সাথে পরিচিত, এ তা নয়।

আবু জেহেল: আপনার কিছু না কিছু বলা দরকার। আপনি কিছু না বললে আমরা কোনোভাবেই সন্তুষ্ট হব না।

ওয়ালিন: আমাকে কয়েকদিন ভাবতে দাও ।

 

মিথ্যা অভিযোগ ও অপবাদ | কুরাইশদের বিরোধিতা-১ | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

কী বলবেন তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা নিজের বাড়িতে পায়চারি করতে লাগলেন। এভাবে ভাবতে ভাবতে তিনি মোটামুটিভাবে একটা ধারণায় পৌঁছলেন। তবে তিনি তা জনসমক্ষে বলতে পারার আগেই আল্লাহ তাঁর রসুলের (সা) কাছে আয়াত নাজিল করে দেন—ওয়ালিদের ঘরের মধ্যে কী ঘটছিল, তাঁর অন্তরে কী অনুভূতি হচ্ছিল, এবং তাঁর মুখের অভিব্যক্তি কেমন ছিল (যা এমনকি তার পরিবারও জানত না)। কোরানের অলৌকিকতার দিকটি লক্ষ করুন। বাস্তব অবস্থার আলোকে ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা কিছু বলার আগেই আল্লাহর রসুল (সা) তা প্রকাশ করে দে

“যাকে আমি অনন্য ধরনের (করে) সৃষ্টি করেছি, (তার সাথে বোঝাপড়া করার জন্য) তুমি আমাকেই ছেড়ে দাও, তাকে আমি বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ দান করেছি, (তাকে আরও দান করেছি) নিত্যসঙ্গী ( একদল) পুত্রসন্তান, আমি তার জন্য (সচ্ছলতার উপকরণ) সুগম করে দিয়েছি, তারপরও সে লোভ করে যে, তাকে আমি আরও অধিক দিতে থাকব, না, তা হবে না; কেননা সে আমার আঘাতগুলোর বিরুদ্ধাচরণে বদ্ধপরিকর ছিল, অচিরেই আমি তাকে (শান্তি) চূড়ায় আরোহণ করাব; সে তো (সত্যগ্রহণের ব্যাপারে কিছুটা) চিন্তা-ভাবনাও করেছিল, তারপর সে (নিজের গোঁড়ামিতে থাকার) সিদ্ধান্ত করল, তার ওপর অভিশাপ, (সত্য চেনার পরও) কেমন করে সে পুনরায় এ সিদ্ধান্ত করল! আবারও তার ওপর অভিশাপ।

কীভাবে সে এমন সিদ্ধান্ত করল, সে (লোকদের প্রতি) চেয়ে দেখল, (দম্ভভরে) সে তার ভুকুঞ্চিত করল, (অবজ্ঞাভরে) মুখটাকে বিকৃত করে ফেলল, অতঃপর সে পিছিয়ে গেল এবং অহংকার করল। সে (আরও) বলল, ‘এ তো (আসলে) পূর্বের লোকদের থেকে প্রাপ্ত জাদু- (বিদ্যার খেল) ছাড়া কিছুই নয়, এ তো মানুষেরই কথা ছাড়া আর কিছুও) নয়; অচিরেই আমি তাকে ‘সাকার’-এ (জাহান্নামে প্রবেশ করাব।” [সুরা মুদাসসির, ৭৪:১১-২৬] উপরের আয়াতগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সরাসরি আল-ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরার সঙ্গে কথা বলছেন। এটা একটা অলৌকিক ঘটনা। এই ঘটনা কেউ জানতে পারার কথা ছিল না, কিন্তু এটা কোরানে আছে।

বর্ণিত আছে যে আবু জেহেল মক্কার বাইরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকত এবং আগত হজযাত্রীদের বলত, “সাবধানে থেকো, শহরে একজন পাগল লোক আছে।” কখনও কখনও আবু লাহাব এতে যোগ দিয়ে বলত, “সে আমার নিজের ভাতিজা হলেও আমি বলছি সে পাগল হয়ে গেছে। আমি তোমাদের সতর্ক করে বলছি, তাঁর কথা শুনবে না, কারণ তাতে তোমরা সম্মোহিত হয়ে যেতে পার। সে একজন জাদুকর, যে তোমাদের জাদু করে ফেলতে পারে। অতএব যখনই তাঁকে দেখবে, তখনই ঘুরে চলে যাবে। কানে আঙুল দেবে, তাঁর কথা শুনবে না।”

তবে আবু জেহেল, আবু লাহাব প্রমুখের এই কীর্তিকলাপের কারণে মক্কায় আগত একাধিক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাদের একজন বলেছিলেন, “আমি একজন ডাক্তার। সে যদি পাগল হয় তাহলে আমি তাকে নিরাময় করব।” এরপর তিনি নবি করিমের (সা) কাছে গিয়ে বললেন, “আমি শুনেছি আপনি নাকি পাগল, মাথায় কিছু সমস্যা আছে। আমি আপনাকে চিকিৎসা দিয়ে ভালো করে তুলব।” এ কথা শুনে নবিজি (সা) বললেন, “আমি পাগল নই; বরং আপনি আমার কথা শুনুন।” নবিজি (সা) ‘খুতবা আল-হাজাহ’ দিয়ে তাঁর কথা শুরু করলেন:

“নিশ্চয়ই সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, আমরা তাঁর প্রশংসা করি এবং আমরা তাঁর কাছে সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি। আমরা নিজের ভেতরের মন্দ এবং মন্দ কর্মের পরিণতি থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে পথ দেখান তিনি কখনও বিপথগামী হবেন না, আর যে পথভ্রষ্ট হয় তার জন্য কোনো পথপ্রদর্শক নেই।”

এটুকু পড়ার পর লোকটি বলে উঠলে, “থামুন। আপনি এইমাত্র যা বলেছেন তার পুনরায় বলুন।” নবিজি (সা) এমনকি খুতবাও আবার পুরোটা পড়া শেষ করার আগেই লোকটি বললেন, “আল্লাহর কসম, আমি আমার জীবনে এর চেয়ে সুন্দর কিছু আর কখনও শুনিনি।” তিনি তখনই ইসলাম গ্রহণ করলেন। তবে এটিও ঠিক যে বহু লোকই আবু জেহেলের কথা শুনে রসুলকে এড়িয়ে গিয়েছিল।

আরো পড়ুনঃ

Leave a Comment