মহানবি মুহাম্মদের বংশক্রম | বংশানুক্রম এবং হাতির বছর | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

মহানবি মুহাম্মদের বংশক্রম | বংশানুক্রম এবং হাতির বছর, আরবদের ইতিহাসে একটি বিশেষায়িত জ্ঞানের ব্যবহার ছিল, যা এখন আর দেখা যায় না; তা হলো ‘ইলমুল আনসার’ বা বংশবিজ্ঞান। আরবের মানুষরা নিজ নিজ বংশের প্রতিটি শাখাপ্রশাখা ও নামধাম আক্ষরিক অর্থেই মুখস্থ করে রাখত। আর এ বিষয়টি নিয়ে তারা খুব গর্ব বোধ করত। তাদের মধ্যে যারা বংশানুক্রমের নামধাম খুটিনাটি খুব ভালো জানত তাদেরকে সমাজে ‘শিক্ষিত’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

মহানবি মুহাম্মদ (সা) ছিলেন আদনানের বংশধর। বিশিষ্ট সিরাহ-লেখক ইবনে ইসহাক এবং ইবনে হিশামের মতো ইবনে কালবি (মৃ. ২৪০ হিজরি) ছিলেন একজন প্রাথমিক যুগের ইতিহাসবিদ এবং বংশবিজ্ঞানের ওপর সমসাময়িক কালের অন্যতম সেরা গবেষক ও পণ্ডিত। ইবনে কালবির গবেষণা অনুসারে আদনান যিশুখ্রিষ্টের এক প্রজন্ম আগে অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৩০ সালের দিকে বেঁচে ছিলেন। কারণ তাঁর পুত্র মাআদ ইসা ইবনে মরিয়মের সমসাময়িক ছিলেন।

 

মহানবি মুহাম্মদের বংশক্রম | বংশানুক্রম এবং হাতির বছর | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

 

মহানবি মুহাম্মদের বংশক্রম | বংশানুক্রম এবং হাতির বছর | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

অতএব এই পটভূমিতে মহানবি মুহাম্মদের (সা) বংশক্রমকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি:

প্রথম ভাগ:

আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে মুহাম্মদ (সা) এবং আদনানের মধ্যে ২০টি প্রজন্মের ব্যবধান। এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই, সন্দেহেরও কোনো অবকাশ নেই।

দ্বিতীয় ভাগ:

এটি আদনান থেকে ইসমাইল (আ) পর্যন্ত। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রাক-ইসলামিক উৎসগুলো থেকে কিছুটা তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে পারি। তবে আমাদের নিশ্চিত হওয়ার কোনো উপায় নেই। এ বিষয়ে ইহুদি ও খ্রিষ্টান উৎস থেকেও কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। কারণ ইসমাইলের (আ) বংশ নিয়ে তাদের (ইহুদি ও খ্রিষ্টান) তেমন কোনো মাথাব্যাথা ছিল না। পুরো বাইবেলে ইসমাইলের (আ) বংশের একদমই উল্লেখ নেই। তাহলে কোথা থেকে আমরা এই তথ্য পাব? আরবি লোককাহিনি থেকে? আরবি লোককাহিনিও তো সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। কাজেই বলা যায়, আদনান ও ইসমাইলের (আ) মধ্যে সময়ের ব্যবধান সম্পর্কে সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয়।

তৃতীয় ভাগ:

ইসমাইল (আ) থেকে আদম (আ) পর্যন্ত বংশক্রম জানার জন্য একটি উৎস আছে। সেটি হলো তাওরাত বা ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’। আমরা কি ওল্ড টেস্টামেন্টের উপর নির্ভর করতে পারি? পারি না। কিন্তু এটিই আমাদের কাছে সেই সময়কার তথ্যের একমাত্র উৎস। আমাদের মুসলমানদের অনেকের ঘরেই মুহাম্মদ (সা) থেকে আদম (আ) পর্যন্ত বংশক্রমের একটা তালিকা বা চার্ট ঝুলানো থাকে । অনলাইনেও এটি পাওয়া যায়। এর অর্ধেক সত্য, কিছুটা কল্পকাহিনি এবং বাকিটা জনশ্রুতি। অতএব ওই তিন সময়কালকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়:

  • মুহাম্মদ (সা) থেকে আদনান পর্যন্ত ইতিহাস সঠিক।
  • আদনান থেকে ইসমাইল (আ) পর্যন্ত কিছুটা সঠিক আর কিছুটা কল্পকাহিনি।
  • ইসমাইল (আ) থেকে আদম (আ) পর্যন্ত যা কিছু জানা যায় তার সবই এসেছে ইহুদি-খ্রিষ্টান উৎস থেকে। ইসলামি সূত্রে ওই সময়কালের কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না।

ইহুদি-খ্রিষ্টান উৎস থেকে জানা যায় যে, আদম (আ) ও মুহাম্মদের (সা) মধ্যে ৫৫ প্রজন্মের ব্যবধান, যা গণনা করলে প্রায় ৬ হাজার বছরের ইহুদি ক্যালেন্ডারের সঙ্গে পুরোপুরিভাবে মিলে যায়। অর্থোডক্স ইহুদি ও ফান্ডামেন্টালিস্ট খ্রিষ্টানরা বিশ্বাস করে যে, মানুষের ইতিহাস আনুমানিক ৬ হাজার বছরের; এটিও মিলে যায়।

তবে উল্লেখিত ধারণাকে প্রত্নতত্ত্ব, মানুষের দেহাবশেষ এবং গুহাগাত্রের চিত্রকলার আলোকে আধুনিক বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা খুবই সমস্যাপূর্ণ একটি কাজ। আমি (ইয়াসির কাদি) বিষয়টি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছি। কয়েক বছর আগে ফ্রান্সে একটি গুহায় পাথরের গায়ে আঁকা আদিম চিত্রকর্ম আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে শিল্পীর হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। বাস্তবতা হলো এই যে, সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত আদিম চিত্রকলা ও আদিবাসী কাঠামোসমূহ কমপক্ষে ৩০ হাজার বছরের পুরানো।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

চিত্রকর্মের খোদাই করা অংশ, হাতের ছাপ (যা নিশ্চিতভাবেই হোমো স্যাপিয়েনের) বা সেইসব প্রাণীর দেহাবশেষ যারা পৃথিবী থেকে অনেক আগেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এগুলো যে ৩০ হাজার বছর আগের তা বৈজ্ঞানিকভাবে ধারণা করা যায়। এই আবিষ্কারের ব্যাপারটি যথেষ্ট প্রচার পেয়েছিল। এ নিয়ে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক’ একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করেছিল।

স্পষ্টতই ৬ হাজার বছরের ধারণাটি কোনো বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায় না। আমি বিষয়টির অতটা গভীরে যাব না। তবে মুসলিম হিসেবে আমাদের ৬ হাজার বছর সময়ের ব্যাপারটি বিশ্বাস করার প্রয়োজন নেই। বিজ্ঞানের আবিষ্কার অনুসারে ২০ বা ৩০ হাজার বছরের ইতিহাসে বিশ্বাস করতে আমাদের (মুসলিমদের) কোনো সমস্যা নেই। এবং সে ক্ষেত্রে আদনান ও ইসমাইলের (আ) মধ্যে এবং ইসমাইল (আ) ও আদমের (আ) মধ্যে অনুমিত সময়কাল এত কম হতে পারে না।

এই দুই সময়কালে নিশ্চয়ই আরও অনেক বেশি সংখ্যক প্রজন্ম ছিল ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রা) এক ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারেন যে, সে তার নিজের থেকে শুরু করে আদম (আ) পর্যন্ত বংশপঞ্জি বলতে পারত। ব্যাপারটি শুনে ইমাম মালিক (রা) মন্তব্য করেছিলেন, “এটা সে কীভাবে জানবে? কে তাকে তার এই বংশতালিকার কথা বলেছে?” আদম (আ) পর্যন্ত তো দূরের কথা, ইসমাইল (আ) পর্যন্ত বংশতালিকা জানার ব্যাপারেও ইমাম মালিক সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

এক হাদিস (যদিও এর পরম্পরা কিছুটা দূর্বল) অনুসারে, নবি করিম (সা) এক ব্যক্তিকে নুহ (আ) পর্যন্ত তার বংশতালিকা বলতে শুনে বলেছিলেন, “এই লোকটি মিথ্যা বলেছে।” তারপর তিনি পবিত্র কোরানের সুরা ফুরকান থেকে এই আয়াতটি তেলাওয়াত করে শোনান: “আমি আদ, সামুদ, রাসের অধিবাসী ও তাদের মধ্যবর্তীকালের বহু সম্প্রদায়কেও ধ্বংস করেছি।” [২৫:৩৮] হাদিসটি দুর্বল হলেও ইতিহাসের বিষয় বলে আমরা এটি গ্রহণ করতে পারি। উপরে উল্লেখিত আয়াত অনুসারে, তাদের মধ্যে অনেকগুলো প্রজন্ম ছিল । যেহেতু আল্লাহ তায়ালা ‘অনেক’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, ভাই আমার মতে এটি কোনোভাবেই ১০, ১৫ কিংবা ২০ নয় ।

 

মহানবি মুহাম্মদের বংশক্রম | বংশানুক্রম এবং হাতির বছর | মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ জীবন

 

পবিত্র কোরানে উল্লেখিত অনেক প্রজন্ম থাকার ধারণাটি আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গেও পুরোপুরি মিলে যায়। বিজ্ঞানও বলছে, সেখানে অনেকগুলো প্রজন্ম ছিল। এ বিষয়ে আরও অনেক প্রমাণ আছে যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ৬ হাজার বছরের ব্যাখ্যাটা মোটেই সঠিক নয়। নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমি এবং বিচার দিবসের মধ্যে পার্থক্য এই দুটি আঙুলের (তর্জমা এবং মধ্যমার) মতো।” অর্থাৎ এই দুই আঙুলের মধ্যে পার্থক্য যতটা সামান্য, নবিজির (সা) আগমন আর বিচার দিবসের মধ্যে দূরত্বও তেমনি কম ।

এখন হিজরি ১৪৩৭ সাল। অর্থাৎ মহানবি মুহাম্মদের (সা) হিজরতের পর এক হাজার চারশো সাইত্রিশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এখনও বিচার দিবস আসেনি (যদিও সেই সময় আসা পর্যন্ত আমরা বেঁচে থাকতে চাই না)। সুতরাং এই সামান্য পরিমাণ যদি এক হাজার বছর হয়, তবে ৬ হাজার বছরের ব্যাপারটি কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যায় না।

এ সংক্রান্ত আরও বেশ কিছু নজির রয়েছে। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে আছে যে, আল্লাহ তায়ালা যখন আদম সন্তানদের সৃষ্টি করেছিলেন, তখন আদম (আ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে একটি উজ্জ্বল আলোক দেখতে পেয়েছিলেন। সেটা দেখে আদম (আ) অবাক হয়ে বললেন, “হে আল্লাহ! এ কে?” আল্লাহ জবাবে বললেন, “এটি তোমার পুত্র দাউদ, যে শেষ সময়ের দিকে বেঁচে থাকবে।”

এর অর্থ কী? দাউদ (আ) সম্ভবত আমাদের এখনকার সময় থেকে তিন-চার হাজার বছর পূর্বে জন্মেছিলেন। যদি দাউদ (আ) শেষ সময়ের দিকের হন, তবে আদম (আ) এবং দাউদের (আ) মধ্যে সময়ের ব্যবধান কত প্রজন্মের? এখন আমরা যদি বাইবেলে বর্ণিত ৬ হাজার বছরের ধরণাটি মেনে নিই, তাহলে দাউদ (আ) কোনো মতেই শেষ সময়ের হতে পারেন না। এ থেকে মনে হয়, মুহাম্মদ (সা) এবং আদমের (আ) মধ্যে অনেক অনেক প্রজন্ম ছিল। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈজ্ঞানিক ধারণা গ্রহণ করতে কোনো অসুবিধা নেই।

আরো পড়ুনঃ

 

Leave a Comment