নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য | দ্বিতীয়বারের ওহি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য | দ্বিতীয়বারের ওহি, কিছু স্কলারের দাবি অনুসারে, মুহাম্মদ (সা) ইকরা (সুরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত) নাজিল হওয়ার মধ্য দিয়ে নবি হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে সুরা মুদ্দাসসির নাজিল হওয়ার মাধ্যমে রসুল হয়েছিলেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে নবি কে? আর রসুলই বা কে? নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য কী? মুহাম্মদ (সা) কী ছিলেন?

 

 

নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য | দ্বিতীয়বারের ওহি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য | দ্বিতীয়বারের ওহি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

নবি ও রসুলের সংজ্ঞা নিয়ে অনেক ধরনের মত আছে। এ বিষয়ে আমরা সংক্ষেপে শুধু চারটি মতের কথা উল্লেখ করব:

১) একদল স্কলারের মতে নবি ও রসুলের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নবি ও রসুল একটি আরেকটির প্রতিশব্দ, ঠিক যেমন তওবা ও ইসতিগফার একটি আরেকটির প্রতিশব্দ। কিন্তু নানা কারণে এই মত গ্রহণ করা যায় না। একটি কারণ হলো, পবিত্র কোরানে সুরা হজে বলা হয়েছে, “আমি তোমার পূর্বে যেসব নবি ও রসুল প্রেরণ করেছিলাম তাঁরা যখনই কিছু…।” [22:52] যদি নবি ও রসুল একই হতো, তাহলে আরবিতে এত স্পষ্ট ভাষায় দুটো আলাদা শব্দের উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল না। অতএব এই মতটিকে সবচেয়ে জোরালো মত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

২) নবি এমন ব্যক্তি, যিনি আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে ওহির দ্বারা অন্তঃপ্রেরণাপ্রাপ্ত হন, তবে তাঁকে মানুষের কাছে তা প্রচার করতে বলা হয়নি। অন্যদিকে রসুল এমন ব্যক্তি, যাঁকে ওহির বাণীগুলো মানুষের কাছে প্রচার করতে বলা হয়েছে। এই মতটিতেও বেশ কয়েকটা সমস্যা আছে। প্রথমত, উপরোক্ত আয়াতে (22:52) পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, নবিকেও প্রেরণ করা হয়েছে।

সহিহ বুখারিতে আছে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “আমি দোজখে সব নবিকে দেখেছি। সেখানে একটি বিশাল উম্মাহসহ এক নবি ছিলেন এবং সেখানে একজন নবি ছিলেন, যার একটি ছোট দল ছিল; এবং সেখানে একজন নবি ছিলেন, যাঁর পাচজন উম্মত ছিল; এবং সেখানে একজন নবি ছিলেন, যার দুইজন উম্মত ছিল; এবং সেখানে একজন নবি ছিলেন, যাঁর পেছনে কোনো উম্মত ছিল না।” এখান থেকে প্রতীয়মান হয় যে, নবিরাও মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী প্রচার করেছিলেন এবং তাঁদের অনুসরণকারীও ছিল।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

আরও একটা কারণে এই মতটা সঠিক বলে মনে হয় না; জ্ঞান গোপন রাখলে এমনকি স্কলারদেরও শাস্তির কথা বলা হয়েছে। যে কোনো সাধারণ মুসলিমের ক্ষেত্রেও আল্লাহর বাণী প্রচার করা দায়িত্বের পর্যায়ে পড়ে। তাহলে কীভাবে কেউ আল্লাহর দ্বারা ওহিপ্রাপ্ত হয়ে তা প্রচার করবেন না? অতএব এই মতও খুব একটা জোরালো নয়।

৩) রসুল এমন ব্যক্তি যাঁকে নতুন ‘শরিয়া’ দেওয়া হয়েছে। আর নবি এমন ব্যক্তি, যিনি তাঁর আগের রসুলের শরিয়া অনুসরণ করেন। এই মতটি একদিকে সঠিক বলে মনে হলেও এটি দিয়ে ইতিহাসের সব বিষয়কে মেলানো যায় না। উদাহরণস্বরূপ, এই সংজ্ঞা অনুসারে ইউসুফকে (আ) একজন রসুল বলা যাবে না। অন্যদিকে পবিত্র কোরান স্পষ্টভাবেই [ ৪০:৩৪] ইউসুফকে (আ) রসুল হিসেবে উল্লেখ করেছে। আরেকটি উদাহরণ হলো, নবি যদি এমন কেউ হন, যিনি পূর্ববর্তী রসুলদের শরিয়া অনুসরণ করেন, তাহলে আদম (আ) রসুল হতেন। কিন্তু সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুসারে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “সর্বপ্রথম রসুল হলেন নুহ (আ)।” এই হাদিস অনুসারে, আদম (আ) ছিলেন নবি, রসুল নন।

একই হাদিস অনুসারে, ইদ্রিস (আ) রসুল নন। অন্যদিকে আমরা জানি যে, দাউদ (আ) ও সুলায়মান (আ) রসুল ছিলেন, যদিও তাঁরা মুসার (আ) শরিয়া অনুসরণ করতেন। আবার দাউদ (আ) রসুল হলেও তাঁর ধর্মগ্রন্থ জাবুরে আল্লাহ তায়ালার প্রশংসা, তাসবিহ ও তাহমিন ছাড়া কিছুই নেই। কোনো আইন নেই। দাউদের (আ) দৃষ্টান্ত থেকে দেখা যাচ্ছে, রসুলকে নতুন আইন নিয়ে আসতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অতএব ওপরের উদাহরণগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে এই মতটাও সত্য নয় ।

 

নবি ও রসুলের মধ্যে পার্থক্য | দ্বিতীয়বারের ওহি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

৪) ইবনে তাইমিয়ার প্রস্তাবিত মতামতটিই সঠিক বলে মনে হয়। তিনি নবি ও রসুলের ভাষাগত অর্থ পর্যালোচনা করে মত দিয়েছেন। নবি কথাটি আরবি শব্দ। (ক্রিয়াপদ) ‘নানা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ তথ্য বা বার্তা। অতএব নবি হচ্ছেন এমন ব্যক্তি, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যা কিছু জানাতে চান তা বার্তা আকারে পৌঁছে দেন। নবি আল্লাহর কাছে প্রাপ্ত বার্তা বা বাণী মানুষের মধ্যে প্রচার করেন এবং তাদের শিক্ষা দেন। ‘নবি’ শব্দটি থেকে এমনিতেই বোঝা যায় যে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়া বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে রসুল কথাটি এসেছে আরবি শব্দ (ক্রিয়াপদ) ‘আরসালা’ থেকে, যার অর্থ পাঠানো (যেমন প্রতিনিধি, দূত, রাষ্ট্রদূত ইত্যাদি)। রসুল হলেন সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ এমন জাতি বা জনগোষ্ঠীর কাছে পাঠান যারা সাধারণভাবে বিরুদ্ধ মনোভাবাপন্ন (বন্ধুসুলভ নয়), এবং যারা সহজে বিশ্বাস করতে চায় না। অন্যদিকে, নবি এমন জনগোষ্ঠীকে শিক্ষা দেন যারা তাঁকে ইতিমধ্যেই গ্রহণ করে নিয়েছে।

নবি ও রসুলের এই ব্যাখ্যা আমাদের সব ধরনের উদাহরণের সঙ্গে খাপ খায়। আদমের (আ) সন্তানদের মধ্যে কেউ কি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল? উত্তর হলো না। ইদ্রিসের (আ) সম্প্রদায়ের লোকেরা কি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল? উত্তর: না। কিন্তু নুহের (আ) ক্ষেত্রে কী ঘটেছিল? তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা কিন্তু তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। সহিহ বুখারির হাদিস অনুসারে নুহ (আ) ছিলেন রসুল। ইউসুফও (আ) ছিলেন রসুল, কারণ তাঁকে মিশরের অবিশ্বাসীদের কাছে পাঠানো হয়েছিল। দাউদ (আ) ও সুলায়মানকে (আ) রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে হয়েছিল, তাই তাঁরা রসুল ছিলেন।

আরেকটি উপযুক্ত উদাহরণ ইয়াহিয়া (আ) ও ইসা (আ)। তাঁরা দুজন ছিলেন পরস্পরের খালাত ভাই। কিন্তু তাঁদের একজন ছিলেন নবি অন্যজন রসুল। তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকেরা ইয়াহিয়াকে (আ) গ্রহণ করেছিল আর ইসাকে (আ) প্রত্যাখ্যান করেছিল। অতএব নবি ও রসুলের এই সংজ্ঞাটিই সঠিক বলে মনে হয়।

ইবনে তাইমিয়ার মত অনুসারে, সাধারণত প্রত্যেক রসুলের একটি নতুন শরিয়া থাকার বিষয়টি কোনো স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নয়, শুধু একটি লক্ষণ বা বিশেষত্ব; এর ব্যতিক্রমও রয়েছে।

আরো পড়ুনঃ

Leave a Comment