সাওর গুহায় গমন | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সাওর গুহায় গমন | মদিনায় হিজরত, মধ্যরাতে নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) উটে চড়ে সাওর গুহার উদ্দেশে রওনা দিলেন। মক্কার উত্তর দিকে মদিনা অবস্থিত। আর এই গুহাটির অবস্থান দক্ষিণ দিকে, অর্থাৎ ঠিক উল্টো দিকে। উটে চড়ে গেলে মক্কা থেকে আড়াই-তিন ঘণ্টা দূরে। নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) এই গুহায় গিয়ে অত্যন্ত গোপনে তিন দিন তিন রাত থাকার পরিকল্পনা করেন। আবু বকর আগে থেকেই একজন পথপ্রদর্শক ঠিক করে রেখেছিলেন। তাঁর সঙ্গে কথা ছিল যে, তিন দিন তিন রাত গুহায় থাকার পর কুরাইশদের কাছে অপরিচিত এমন এক পথ দিয়ে মদিনায় নিয়ে যাবেন। সেটি ছিল অচেনা সরু পথ, চওড়া রাস্তা নয়। তাঁরা অনেকটা ঘুরপথে, অর্থাৎ এখনকার সময়ের জেদ্দা এলাকা হয়ে, সেখান থেকে মদিনায় যাত্রা করলেন।

 

সূরা হাজ্জ্ব

 

সাওর গুহায় গমন | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

তিরমিজি তাঁর সুনানে বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সা) যখন মধ্যরাতে মক্কা ত্যাগ করার সময় শহরের শেষ দোকানপাটগুলো পার হচ্ছিলেন, তখন তিনি ঘুরে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্মভূমির দিকে শেষবারের মতো তাকালেন। আমরা জানি, এখানে তিনি অনেক বছরের জন্য আর ফিরে আসতে পারবেন না। তিনি প্রিয় শহর মক্কার উদ্দেশে বললেন, “তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে বরকতময় স্থান। তুমি আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। আজ যদি আমার সম্প্রদায় আমাকে বের করে না দিত, তাহলে।

আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না।” ঠিক এরকম ঘটনা যে ঘটতে পারে তা ওয়ারাকা ইবনে নওফেল প্রায় সাড়ে তের বছর আগেই আশঙ্কা করেছিলেন। ওয়ারাকা অন্য নবিদের অতীতে কী ঘটেছিল তা জানতেন বলেই হয়তো আগে থেকে অনুমান করতে পেরেছিলেন যে, মহানবি মুহাম্মদের (সা) ক্ষেত্রে কী ঘটতে পারে।

ইবনে কাসির বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সা) যাত্রার সময় আল্লাহর কাছে নিরাপত্তার জন্য আর্জি পেশ করে একটি দীর্ঘ ও সুন্দর দোয়া করেন। তিনি নিজের জন্য, তাঁদের যাত্রা সহজ করে দেওয়ার জন্য এবং সর্বোপরি আল্লাহর রহমত কামনা করে প্রার্থনা করেন। শুধু ইবনে কাসিরই এই বর্ণনাটি করেছেন, অন্য কোনো উৎসে এটি পাওয়া যায়নি।

আয়েশার (রা) বর্ণনা অনুসারে, তিন দিন ও তিন রাত গুহায় থাকাসহ যাত্রার পুরো পরিকল্পনাটি আবু বকরই (রা) করেছিলেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তিনি তিনজন ব্যক্তিকে তিনটি বিশেষ কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান:

  • প্রথমজন ছিলেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ। তিনি ছিলেন শক্তিশালী যুবক, তাঁর বুদ্ধিমত্তা ছিল প্রখর। তিনি সবকিছু চট করে বুঝতে পারতেন। আবু বকর তাঁকে বলে গিয়েছিলেন:

(১) তিনি যেন প্রতিদিন সকালে তাঁদের দুজনের জন্য গুহায় কিছু খাবার ও পানীয় নিয়ে যান, কারণ তাঁরা কয়েক দিন সেখানেই থাকবেন ।

(২) তিনি যেন মক্কার লোকদের ওপর নজর রাখেন। তারা কী করছে, কী বিষয়ে কথা বলছে, তাঁদের দুজনকে খোঁজার জন্য কোথায় কোথায় লোক পাঠাচ্ছে, ইত্যাদি। আবদুল্লাহ প্রতিদিন এই কাজটি খুব নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। তিনি প্রতিদিন বাজারে ও জনসমাগমে গিয়ে সেখানে কী বলাবলি হচ্ছে তা কান পেতে শোনার চেষ্টা করতেন। তাঁর বয়স কম ছিল বলে কেউ তাঁর প্রতি মনোযোগ দেয়নি। তা ছাড়া তিনি বেশ বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজটি করেছেন।

[আনুষঙ্গিক বিষয়: আসমা ছিলেন আবু বকরের (রা) সবচেয়ে বড় সন্তান, তারপরে আবদুল্লাহ, তারপরে আয়েশা, তারপরে আবদুর রহমান, তারপরে মুহাম্মদ, এবং সবশেষে উম্মে কুলসুম (যার জন্ম আবু বকরের মৃত্যুর পরে)। আবু বকর (রা) মৃত্যুশয্যায় আয়েশাকে (রা) বলেছিলেন, “তুমি তোমার দুই ভাই ও দুই বোনের যত্ন নিও।” আয়েশা (রা) অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “দুই বোন?” কারণ তখনও উম্মে কুলসুমের জন্ম হয়নি। আবু বকর (রা) জবাবে বলেছিলেন, “আমার মনে হয় আমার স্ত্রী গর্ভবতী, তিনি একটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেবেন।” তাঁর স্ত্রী দৃশ্যত গর্ভবর্তী ছিলেন না। কিন্তু আবু বকরের মনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছ থেকে সম্ভবত ইনটুইশন’ সৃষ্টি হয়েছিল, যা আট মাস পরে সত্য বলে প্রমাণিত হয়।]

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

  • দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন আমির ইবনে ফুহায়রা। তিনি ছিলেন আবু বকরের (রা) একজন মুক্ত দাস। তাঁর কাজ ছিল তাঁর ভেড়ার পাল চড়াতে চড়াতে আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরের পদচিহ্ন (খাবার দিতে যাওয়া-আসার পথের) মুছে ফেলা।
  • তৃতীয় ব্যক্তিটি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে উরাইতি (অথবা আরকাত)। সিরাজের বইগুলোতে উরাইকিত ও আরকাত উভয় নামেরই উল্লেখ আছে; সঠিক নামটি আমরা জানি না। তিনি কুরাইশ ছিলেন না, তিনি ছিলেন দূরের কোনো এক বেদুইন গোত্রের লোক। তাঁর কাজ ছিল নবিজি (সা) ও আবু বকরকে (বা) কুরাইশদের কাছে অপরিচিত কোনো পথ দিয়ে মক্কা থেকে মদিনায় নিয়ে যাওয়া। এখন মক্কা ও মদিনার মধ্যে ‘তারিক আল-হিজরাহ’ নামে যে মহাসড়ক আছে, তাঁরা দুজন সেই পথ দিয়ে যাননি।

এখানে লক্ষ করুন, সে দিনগুলোতেও মহাসড়ক ছিল, যেখান দিয়ে ভালোভাবে যাতায়াত করা যেত। ওই সড়কগুলোতে ভ্রমণকারীদের সুবিধার জন্য জলকূপ ও অন্যান্য ব্যবস্থা ছিল। এমনকি মাইলফলকও ছিল। সুতরাং লোকেরা জানত যে, এটা এমন পথ যেখান দিয়ে ভালোভাবে ও নিরাপদে যাওয়া যায়। তবে নবিজি (সা) ও আবু বকরের (রা) পক্ষে প্রচলিত রাস্তা দিয়ে যাওয়া ঠিক হতো না। তাই তাঁরা ছোট ছোট রাস্তা দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতকে ভাড়া করেছিলেন। আবু বকর (রা) পরে নিজেই ওই যাত্রার বিবরণ দিয়েছেন।

যা-ই হোক, নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) সাওর গুহায় গিয়ে পৌঁছলেন। উল্লেখ্য, সাওর ছিল খুব ছোট একটি গুহা। এর প্রবেশপথটি ওপরের দিকে থেকে। শরীরকে একটু বাঁকিয়ে গুহায় ঢুকতে হতো। গুহাটি সেই সময় দেখতে ছিল একটা ফাটলের মতো। তবে সময়ের সাথে সাথে এর আকার কিছুটা বড় হয়েছে। এখনকার সময়ে এটি একটি ছোট চেম্বারের মতো হয়ে গেছে। সেই সময়ে আক্ষরিক অর্থেই গুহাটিতে শুধু দুজনেরই বসার জায়গা ছিল।

নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) গুহার ভেতরে অবস্থানকালে একসময় দেখতে পেলেন যে, কুরাইশরা গুহার ওপর দিয়ে হেঁটে ওঠানামা করছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, কুরাইশরা সেখানে কীভাবে গেল? বর্ণিত আছে, কুরাইশরা যখন বুঝতে পারল যে নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) স্বাভাবিক পথ ধরে যাননি, তখন তারা আবু বকরের (রা) বাড়ি থেকে শুরু করে উটের পায়ের চিহ্ন খুঁজে বের করার জন্য এক অভিজ্ঞ লোককে ভাড়া করেছিল। সেই লোক কুরাইশদেরকে সাওর গুহার কাছে নিয়ে যায়। গুহাটি যে পাহাড়ের পাদদেশে সেখানে গিয়ে লোকটি বলল, “আমি এই পর্যন্ত আসার চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি। এর পরে তো পাহাড়, তাই আমি আর কিছু খুঁজে পাব না।”

এখান থেকেই কুরাইশরা একটা সূত্র পেয়ে যায়। খবর পেয়ে সব নেতৃস্থানীয় কুরাইশ (আবু জেহেল, ওয়ালিদ ইবনুল মুগিরা প্রমুখ) সেখানে গিয়ে হাজির হয়। এই সময়েই সেই বিখ্যাত ঘটনাটি ঘটে, যখন আবু বকর (রা) কুরাইশদের বড় বড় নেতাদের গুহার কাছে দেখতে পেয়ে নবিজিকে (সা) ফিসফিস করে বলেন, “তারা যদি এখন নিজেদের পায়ের দিকে (নিচে) তাকায়, তাহলে আমাদেরকে দেখতে পাবে।” [যেহেতু গুহায় ঢোকার পথটি ছিল ওপরের দিকে।] নবিজি (সা) উত্তরে বলেছিলেন, “(হে আবু বকর,) মন খারাপ করো না, আল্লাহ তো আমাদের সাথেই আছেন।” [ ৯:৪০] আল্লাহ তায়ালা এমন ব্যবস্থা করেছিলেন যাতে কুরাইশরা গুহার দিকে না তাকায়।

 

সাওর গুহায় গমন | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

এই ঘটনা সম্পর্কে মাকড়সা, গাছ, কবুতর ইত্যাদি নিয়ে কিছু কাহিনি প্রচলিত আছে ।

  • একটি মাকড়সা গুহার মুখে জাল বুনেছিল, যা দেখে মনে হয় গুহাটির ভেতরে কেউ প্রবেশ করেনি।
  • একটি গাছ গুহার প্রবেশপথের মুখের ওপর ঝুঁকে ছিল। 
  • দুটি কবুতর গুহার ওপরে বাসা তৈরি করেছিল।

এসব বর্ণনার মধ্যে মুসনাদ ইমাম আহমদে বর্ণিত মাকড়সার কাহিনিটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, যদিও এর সভ্যতার ক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বলতা অন্য দুটি কাহিনি (গাছ ও কবুতর) তৃতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের সিরাজের বইগুলোতে বর্ণনা করা হয়েছে, সেসব বর্ণনায় অসম্পূর্ণতা আছে। এসব কাহিনি বর্ণনা করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু আমরা নিশ্চিত নই, এগুলো কতটা সত্য।

যা-ইহোক, কুরাইশরা গুহাটি পার হয়ে গেল, তারা বুঝতে পারল না সেখানে নবিজি (সা) ও আবু বকর (রা) বসে ছিলেন। তৃতীয় রাতে তাঁরা দুজন পরিকল্পনা অনুযায়ী গুহা থেকে বেরিয়ে আবদুল্লাহ ইবনে উরাইকিতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন: তারপর সেখান থেকে মদিনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলেন। মদিনায় যাওয়ার পথে বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল বলে জানা যায় যার মধ্যে দুটি ঘটনা সত্য। প্রথমটি সুরাকা ইবনে মালিকের কাহিনি, দ্বিতীয়টি উম্মে মাবাদের কাহিনি । সুরাকার কাহিনি বর্ণনা করার আগে একটি বিষয় জানা খুব জরুরি। তা হলো, কুরাইশরা নবিজিকে (সা) জীবিত মৃত ধরে আনার জন্য ইতিমধ্যে একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। এটা সেই সময়ের মাপকাঠিতে বিরাট সম্পদ।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment