সারিয়া আল-নাখলা | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সারিয়া আল-নাখলা | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি, সারিয়া আল-নাখলা সংঘটিত হয়েছিল দ্বিতীয় হিজরি সালের রজব মাসে। নবিজি (সা) এই অভিযানের জন্য বেছে বেছে ৮ জন মুহাজিরকে নিয়ে একটি দল গঠন করেন। ওই দলে কোনো আনসার ছিল না। লক্ষ করুন, এখন পর্যন্ত প্রতিটি অভিযানে মুহাজিররাই অংশগ্রহণ করছে। নবিজি (সা) তাঁর ফুপাতো ভাই আবদুল্লাহ ইবনে জাহশকে (২) এই দলটির নেতৃত্বের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর হাতে একটি খাম আটকানো চিঠি দিয়ে যে নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘তোমরা দুইদিন ধরে উত্তর-পূর্ব দিকে যাবে, দ্বিতীয় দিনের সকালে চিঠিটি খুলবে।’ নবিজির (সা) কথামতো দুদিন সফর করার পরে দলনেতা আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ চিঠিটি খোলেন ।

সারিয়া আল-নাখলা | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

সারিয়া আল-নাখলা | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

চিঠিতে নবিজি (সা) তাঁকে বলেছিলেন, “আমার এই চিঠিটি পড়ার পর তোমরা নাখলা (মক্কার পূর্ব দিকের তায়েফের অভিমুখে) চলে যাবে।” সুতরাং তাঁদেরকে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ দূরত্ব অতিক্রম করে নাখলায় যেতে হচ্ছে। চিঠিতে তিনি আরও বলেন, “তোমরা কুরাইশদের গতিবিধি লক্ষ করবে এবং তাদের প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। আর তোমার কোনো সাথি না যেতে চাইলে তাঁকে বাধ্য করবে না; যে-কেউ চাইলে (মদিনায় ) ফিরে আসতে পারে।” এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন এই অদ্ভুত চিঠি? এর কারণটি হলো, অভিযানের ব্যাপারে চূড়ান্ত গোপনীয়তা রক্ষা করা এক ধরনের বিভ্রম সৃষ্টি করা। এমনকি মুহাজিরদের দলেরও কেউ জানতেন না তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন।

এক হাদিসে আছে, নবি করিম (সা) বলেছেন, “যুদ্ধ একটি ছলচাতুরি সান জু তাঁর বিখ্যাত বই দ্য আর্ট অব ওয়ার-এ লিখেছেন, “সব যুদ্ধের ভিত্তিই হলো ছলচাতুরি। অতএব, যখন আমরা আক্রমণ করতে পারব তখন আমাদের দেখাতে হবে যে আমরা তা করতে অক্ষম; ক্ষমতা ব্যবহার করার সময় আমাদের নিষ্ক্রিয়তা প্রদর্শন করতে হবে: যখন আমরা শত্রুর কাছাকাছি থাকি তখন অবশ্যই তাদেরকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আমরা অনেক দূরে আছি; আর যখন খুব দূরে আছি তখন অবশ্যই তাদেরকে বিশ্বাস করাতে হবে যে আমরা কাছেই রয়েছি।”

এ ছাড়া, নবিজি (সা) মুহাজিরদের ফিরে আসার অনুমতি দিচ্ছেন, কারণ তারা আক্ষরিক অর্থেই শত্রু অঞ্চল মক্কায় নিরস্ত্র অবস্থায় যাচ্ছেন। আটজন প্রতিরক্ষাহীন মানুষ কোনোভাবেই পুরো শহরের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবেন না। আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ চিঠিটি পড়া শেষ করে তাঁর সাথিদের বললেন, “যে শাহাদাতবরণ করতে চায় এবং আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহী, সে আমার সঙ্গে আসুক।

আর যে এটি চায় না সে মদিনায় ফিরে যেতে পারে। আর আমার কথা বলতে গেলে, আমি মক্কার দিকে রওয়ানা হতে যাচ্ছি।” আমরা দেখতে পাচ্ছি, আবদুল্লাহ ইবনে জাহশ সত্যি সত্যিই মনে করছেন যে, এই অভিযান কোনোভাবেই সফল হবে না। কিন্তু ‘নবিজি (সা) যদি এটি চান, তবে তা-ই হোক। আটজনের কেউই পিছিয়ে থাকলেন না; সবাই নবিজির (সা) নির্দেশনা অনুসারে আবদুল্লাহ ইবনে জাহশের নেতৃত্বে মক্কা অভিমুখে এগিয়ে চললেন। তাঁদের দুজনের জন্য একটি করে মোট চারটি উট ছিল ।

তাঁরা মক্কা যাওয়ার পথে একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলেন, তাঁদের একটি উট নিখোঁজ। সেটি ছিল সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস এবং উতবা ইবনে গাজওয়ানের উট। এ অবস্থায় সাদ এবং উত্তরা উভয়েই জোর দিয়ে তাদের অন্য সাথিদের বললেন, “আমাদের এখানে মরুভূমিতে রেখে তোমরা এগিয়ে যাও। আমরা আমাদের উটটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করব। এই অভিযান থেমে যেতে পারে না।” সুতরাং সিদ্ধান্ত হলো, সাদ এবং উতবা তাঁদের উট খুঁজে বের করবেন অথবা অন্য কোনো উপায়ে মদিনায় ফিরে যাবেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

তারপর বাকি ছয়জন সেখান থেকে নাখলার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন । তাঁরা রজব মাসের শেষ দিন (অর্থাৎ ৩০ তারিখে) নাখলায় পৌঁছলেন। সেখানে তাঁবু খাটানোর আগেই তাঁরা দেখতে পেলেন দূর থেকে একটি কাফেলা আসছে। কাফেলাটি কী করে তা দেখার জন্য তাঁরা প্রথমে আত্মগোপন করলেন। এটি ছিল কুরাইশদের একটি ছোট কাফেলা যারা ব্যবসায়িক কাজ সেরে একটু আগেভাবেই মক্কায় ফিরে আসছিল। ফেরার সময় কাফেলার উটগুলো মালামালে বোঝাই থাকে।

কুরাইশরাও নিশ্চিত ছিল যে, পথে তাদের কিছুই হবে না; তাই তাদের সাথে কোনো সামরিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। কাফেলাটিকে এ অবস্থায় দেখে মদিনা থেকে আগত মুহাজিররা কী করা উচিত তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করে দিলেন। সেখানে প্রায় ৮-৯টি উট ছিল যা মাত্র তিনজন পুরুষ পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং মুহাজিররা ভাবলেন, এই মালামালগুলো আয়ত্ত করা খুব কঠিন হবে না; আর তা করতে পারলে তা হবে একটি বড়সড় অর্থসম্পদের প্রাপ্তি।

তবে এখানে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার ব্যাপার ছিল:

১. নবি করিম (সা) তাঁদের তথ্য সংগ্রহ করতে বলেছেন। যদিও তিনি বলেননি, ‘লড়াই করবে না’, তবু অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল তথ্য সংগ্রহ করা। আবার অন্যদিকে এখানে প্রচুর সম্পদ। একদিকে তাঁরা ভাবছেন, এই ধনসম্পদ উম্মাহর অনেক কাজে আসবে। অন্যদিকে ভাবছেন, নবিজি (সা) তো তাঁদের আক্রমণ করতে বলেননি।

২. আরেকটি বড় সমস্যা হলো, দিনটি ছিল রজব মাসের ৩০ তম দিন, অর্থাৎ পবিত্র মাস। এই পবিত্র মাসে যুদ্ধে জড়ানো নিষেধ। তখন মাগরিবের (অর্থাৎ সূর্যাস্তের) সময় হতে ১-২ ঘণ্টা বাকি ছিল। মাগরিবের পরই শাবান মাস (যা পবিত্র মাসগুলোর মধ্যে পড়ে না) শুরু হয়ে যাবে।

এ অবস্থায় কী করা হবে তা নিয়ে তাঁরা আবার আলোচনা শুরু করলেন। তাঁরা বললেন, “আমরা যদি সূর্যাস্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করি তাহলে কাফেলাটি হাতছাড়া হয়ে যাবে। আবার আমরা যদি এখন তাদের ওপর আক্রমণ করি, তাহলে পবিত্র মাসে যুদ্ধ করার দোষে আমরা দোষী হব।” আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই সময় অবধি মুসলিমরা কোনো অভিযানে সফল হতে পারেনি। আর এখানে নানা ধরনের পণ্যে বোঝাই ৮-৯টি উট হাতে পাওয়ার সমূহ সুযোগ এসেছে; তা পেলে মুসলিমদের অনেক উপকারে আসবে। এসব ভেবে তাঁরা একপর্যায়ে কাফেলাটিকে আক্রমণ করে বসেন। সংঘর্ষে তিনজন প্রহরীর (উটচালকের) মধ্যে একজন মারা যায়। তাঁরা বাকি দুজনকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক করে সব উট ও মালামালসহ একই পথে মদিনায় ফিরে যান।

তাঁরা একজনকে হত্যা করেছেন একথা শুনে নবিজি (সা) বুঝতে পারেন এই ঘটনা খুব নেতিবাচক প্রচারণা পাবে। তিনি তাঁদেরকে বললেন, “আমি তো তোমাদের যুদ্ধ করার আদেশ দিইনি।” তিনি ওই অভিযান থেকে পাওয়া কোনো মালামাল গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশরা বলতে শুরু করে, “মুসলিমদের দেখো! তারা ইব্রাহিমের শরিয়ত ভঙ্গ করেছে। তারা পবিত্র মাসের বিধান মানেনি। পবিত্র মাসে তারা একজন নিরীহ ব্যক্তিকে  হত্যা করার মাধ্যমে রক্তপাত ঘটিয়েছে।” কুরাইশরা এই ঘটনাকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে পুরো আরব উপদ্বীপে ছড়িয়ে দেয়। ইবনে ইসহাকসহ অন্যরা বর্ণনা করেছেন, নবিজি (সা) এই পুরো ঘটনায়

প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেছিলেন। কারণ কুরাইশদের সমালোচনার সঠিক ভিত্তি ছিল। মুসলিমরা সত্যিই পবিত্র মাসে রক্তপাত ঘটিয়েছিল। এ অবস্থায় নবিজি (সা) কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এমনকি ইহুদিরাও এই ঘটনায় খুশি হয়েছিল। লক্ষ করুন, ইহুদিরা মুসলমানদের পক্ষে থাকবে না তা শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সমালোচনার মাত্রা বাড়ার পর আল্লাহ কোরানে নাজিল করেন।

“পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, বলো, ‘সেই সময় যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায় (পাপ)। কিন্তু আল্লাহর কাছে তার চেয়েও বড় অন্যায় আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মসজিদুল হারামে (কাবা শরিফে) যেতে বাধা দেওয়া ও সেখানকার অধিবাসীদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া। আর ফিতনা হত্যার চেয়েও আরও ভীষণ অন্যায়।” [সুরা বাকারা, 2:217] কত প্রাঞ্জল ভাষায়ই না আল্লাহ বিষয়টি প্রকাশ করেছেন! আল্লাহ রক্তপাতের সমালোচনা করেছেন, তিনি তার অনুমোদন দেননি। মুসলিমদের যে এই পবিত্র মাসে রক্ত ঝরানো উচিত হয়নি তা তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন। কিন্তু তিনি এমন একটি রায় দিয়েছেন যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আমাদের পালনকর্তা হলেন ‘আল-হক’ (৩), এবং তিনি হকের (সত্যের) সঙ্গেই বিষয়টির সুরাহা দিয়েছেন।

 

সারিয়া আল-নাখলা | বদরের যুদ্ধের প্রস্তুতি | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আল্লাহ কুরাইশদের এই বলে সমালোচনা করেছেন, ‘তোমরা মানুষকে মসজিদুল হারামে আসতে বাধা দিয়েছ, আল্লাহকে অস্বীকার করেছ, এবং লোকদের মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছ! এসব তো আল্লাহর দৃষ্টিতে আরও অনেক খারাপ কাজ। যে রক্তপাত হয়েছে তার চেয়ে তোমাদের সৃষ্ট ফিতনা আরও অনেক বড়।’

[আনুষঙ্গিক বিষয়: ইবনে আব্বাস বলেছেন যে, এই আয়াতে ‘ফিতনা’ শব্দের অর্থ শিরক। এই শব্দটিকে আমরা আরও বড় পরিসরে ব্যাখ্যা করতে পারি। ফিতনার মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা, গোত্রের মধ্যে ভাঙন, মুসলিমদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাড়িয়ে দেওয়া—এ সবই পড়বে। আর আল্লাহ এই ফিতনা সৃষ্টি ও শিরক করাকে রক্তপাতের চেয়েও নিকৃষ্ট হিসেবে রায় দিয়েছেন।]

যা-ই হোক, এই আয়াতটি নাজিল হওয়ার পরে নবিজি (সা) ওই অভিযান থেকে পাওয়া মালামাল এবং দুজন যুদ্ধবন্দিকে গ্রহণ করতে রাজি হন, এবং এই দুজনের মুক্তিপণ পাঠানোর জন্য কুরাইশদের কাছে একটি বার্তা পাঠান। তবে  তিনি এ-ও বলেন, “আমাদের দুজন সাহাবি (সাদ ও উতবা) নিরাপদে আমাদের কাছে না পৌঁছানো পর্যন্ত আমরা এই দুই বন্দিকে মুক্তি দেব না।” সাদ ও উত্তৰা শেষ পর্যন্ত তাঁদের উটটি খুঁজে পেয়েছিলেন, এবং তাঁরা এক কিংবা দুই সপ্তাহ পরে মদিনায় ফিরে আসেন।

যে দুজন বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাদের একজন, আল-হাকাম ইবনে কায়সান, যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তবে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি ঘটেছিল তাঁর জন্য মুক্তিপণ আদায়ের পরই। মুক্তিপণ আদায় করার পরে তিনি আবার মদিনায় ফিরে আসেন। এরকম ঘটনা শুধু একবারই ঘটেনি। পরবর্তী সময়ে অনেক যুদ্ধে একাধিকবার যুদ্ধবন্দিরা ইসলাম গ্রহণ করেছে; তবে তা হয়েছে তাদের মুক্তিপণ আদায়ের পরে। আল-হাকাম ইবনে কায়সান পরবর্তী সময়ে নবিজির (সা) জীবদ্দশায় কোনো একটি যুদ্ধে শাহাদতবরণ করেন।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment