মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2, নবিজি (সা) অন্য নবিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সপ্তম আকাশ থেকে আরও ওপরের দিকে এগিয়ে গেলেন। তাঁর কথায়, “তখন আমি আমার সামনে সিদরাতুল-মুনতাহা দেখতে পেলাম।” সিদরাতুল-মুনতাহা কী? আরবিতে ‘সিদরাহ’ বলতে বোঝায় বৃহৎ শাখাবিশিষ্ট বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে থাকা এক প্রকার প্রশস্ত গাছ, যা মরুভূমিতে জন্মায়। সুস্বাদু ফল ও মিষ্টি মাপের জন্য এই গাছ পরিচিত। আর ‘মুনতাহা’ শব্দটির অর্থ ‘একেবারে শেষ প্রান্ত’।

সুতরাং সিদরাতুল-মুনতাহা হলো ‘শেষ প্রান্তের গাছ’। নবিজি (সা) বলেছেন, “এই গাছের ফলগুলো ছিল হাজরের অধিবাসীদের ব্যবহৃত পানির পাত্রের মতোই বড়, এর পাতাগুলো ছিল হাতির কানের মতো।” লক্ষ করুন, নবিজি (সা) বিষয়টাকে ব্যাখ্যা করতে এমন রূপক ব্যবহার করেছেন যাতে সাহাবিরা সহজেই বুঝতে পারে।

 

মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

সহিহ বুখারির একটি হাদিসে আছে, নবিজি (সা) বলেছেন, “অতঃপর জিব্রাইল (আ) সিদরাতুল মুনতাহা পৌঁছানো পর্যন্ত আমার সঙ্গে ঊর্ধ্বমুখে যেতে থাকলেন। এটি (সিদরাতুল মুনতাহা) এমন একটি রঙে আচ্ছাদিত ছিল, যা আমার অচেনা।” আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা নিজেই কোরানে বলেছেন: “তখন সিদরাহ গাছটা আচ্ছাদিত ছিল, যা দিয়ে আচ্ছাদিত থাকে।” [সুরা নজম, ৫৩:১৬]  গাছটা কী দিয়ে আচ্ছাদিত ছিল তা আল্লাহ তায়ালা নির্দিষ্টভাবে বলেননি। এ

খানে লক্ষণীয়, আমাদের পরিচিত বর্ণালির বাইরে সেখানে আরও কিছু রং ছিল। নবিজি (সা) সেখানে এমন কিছু রং দেখতে পেয়েছেন, যা এই পৃথিবীতে দেখা যায় না। বিষয়টা বৈজ্ঞানিকভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। পৃথিবীতে আমরা রঙের যে বর্ণালি দেখতে পাই তা এখানকার আলোর উৎস থেকে যা কিছু সৃষ্টি। নবিজি (সা) যে রংগুলো দেখেছেন তা কেবল ভিন্ন ধরনের আলোর দ্বারা সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা যায়। সম্ভবত মিরাজের সময় নবিজি (সা) ভিন্ন এক জগতের ভিন্ন এক স্তরে বিরাজ করছিলেন। সহিহ বুখারি অনুসারে, নবি করিম (সা) আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আরও ওপরে যাওয়ার আগে সিদরাতুল মুনতাহাই হলো তাঁর দেখা আল্লাহর শেষ সৃষ্টি।

সহিহ মুসলিমে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদের বর্ণনা অনুসারে নবিজি (সা) বলেছেন, “আমি সিদরাতুল মুনতাহার থামলাম, যা ষষ্ঠ আকাশে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে ওপরে পাঠানো সবকিছুই (যেমন দোয়া, নামাজ, উত্তম আমল, ভালো কথা ইত্যাদি) সিদরাতুল মুনতাহাতে গিয়ে থেমে যায়। আবার এখান থেকেই পৃথিবীতে আগত সমস্ত কিছু (যেমন বৃষ্টি) উৎপন্ন হয় এবং নেমে আসে। নবিজির (সা) অভিজ্ঞতাকে আল্লাহ তায়ালা আরও বর্ণনা করেছেন, “তাঁর দৃষ্টিবিভ্রম হয়নি বা দৃষ্টি লক্ষ্যচ্যুতও হয়নি। তিনি তো তাঁর প্রতিপালকের অন্যতম নিদর্শনগুলো দেখেছিলেন।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

[সুরা নজম, ৫৩:১৭-১৮) নবিজি (সা) সিদরাতুল-মুনতাহা দেখার মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ সৃষ্টি দেখতে পেয়েছিলেন। তাবারির বর্ণনা করা একটি হাদিস অনুসারে ধারণা করা যায়, সিদরাতুল-মুনতাহা আসলে স্থির নয়, বরং আমাদের এই দৃশ্যময় জগতের বাইরে ক্রমাগত পরিবর্তনশীল জাঁকজমকপূর্ণ প্রকাণ্ড একটি বৃক্ষ।

কালানুক্রম সংক্রান্ত আরেকটি আপাত অসঙ্গতি লক্ষ করুন। সহিহ বুখারির হাদিস অনুসারে নবিজি (সা) ইব্রাহিমকে (আ) সপ্তম আকাশে অতিক্রম করেন, তারপর তিনি সিদরাতুল-মুনতাহা দেখতে পান। আবার সহিহ মুসলিমের হাদিস অনুসারে, তিনি ষষ্ঠ আকাশে সিদরাতুল-মুনতাহা দেখেন। এখানে আমরা স্পষ্ট একটি অসঙ্গতি দেখতে পাচ্ছি। ইমাম আল-নওয়াবি এই বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, পাছের কাণ্ডটি ষষ্ঠ আকাশে শুরু হয়েছে, শাখাগুলো সপ্তম আকাশের শেষের দিকে গিয়ে শেষ হয়েছে, যেহেতু অবস্থানের নিরিখে সিদরাতুল-মুনতাহাই আল্লাহ তায়ালার শেষ সৃষ্টি। এর বাইরে ও তাঁর আরশ ছাড়া আর কিছু নেই। বিশিষ্ট তাবেয়িন (ইবনে আব্বাসের ছাত্র) বলেছেন, “সিরাহ সপ্তম আকাশে শেষ হয়েছে।” এর অর্থ হলো, এটি নিশ্চয়ই অন্য কোথাও শুরু হয়েছে। এ থেকে আরও প্রতীয়মান হয় যে, সিদরাহ একটি বিশাল বৃক্ষ। 

 

মিরাজ: সিদরাতুল মুনতাহা | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মিরাজ: চারটি 

নদী তারপর নবিজি (সা) বললেন, “সিদরাতুল মুনতাহার পাদদেশে চারটি নদী নেমে এসেছে। এর মধ্যে দুটি লুকানো, বাকি দুটি দৃশ্যমান। আমি জিব্রাইলকে (আ) বললাম, ‘এই নদীগুলো কী?’ তিনি জবাব দিলেন, ‘লুকানো নদীগুলো শুধু জান্নাতেই আছে (অর্থাৎ আপনি এগুলো পৃথিবীতে দেখতে পাবেন না)। পৃথিবীতে যে দুটো নদী দেখা যায় সেগুলো হলো, নীল (নাইল)’ এবং ফোরাত (ইউফ্রেটিস)।”

এখানে নবিজি (সা) এমন একটি কথা বলেছেন যার গভীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। এখন আমরা জানি, সভ্যতার পরিক্রমায় এই দুটি নদীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পৃথিবীর সবচেয়ে পুরাতন সভ্যতা মেসোপটেমিয়া (উর, ব্যাবিলন ইত্যাদি), যা মূলত ফোরাত নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় সভ্যতাটি গড়ে উঠেছিল নীল নদের অববাহিকায়। অনাদিকাল থেকেই এই দুটি নদী জীবন ও সভ্যতার নিত্যসঙ্গী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। জিব্রাইলের (আ) ভাষ্যে উভয় নদীই আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্ত ।

অন্যদিকে, জান্নাতের দুটি নদী (যা লুকানো আছে) হলো, আল-কাওসার ও সালসাবিল। এই দুটি নদীর কথা পবিত্র কোরানেও উল্লেখ আছে “নিঃসন্দেহে আমি তোমাকে কাউসার (ইহকাল ও পরকালের কল্যাণের প্রাচুর্য দান করেছি।” [সুরা কাওসার, ১০৮:১] “সেখানে থাকবে সালসাবিল নামক এক নহর (ঝরনা/নদী)।” [সুরা দাহ, ৭৬:১৮)

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment