সূরা ফাতিহা সূচি [ কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা ] সূরা নং ১। পবিত্র কুরআন

সূরা ফাতিহা সূচি ,সূরা আল ফাতিহা (আরবি: سورة الفاتحة‎‎) মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কুরআনের প্রথম সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ৭ এবং রুকু সংখ্যা ১। ফাতিহা শব্দটি আরবি “ফাতহুন” শব্দজাত যার অর্থ “উন্মুক্তকরণ”। এটি আল্লাহ্ এর পক্ষ থেকে বিশেষ প্রতিদান স্বরূপ। সূরা ফাতিহা অন্যান্য সূরার ন্যায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম দিয়ে শুরু হয়েছে। আল ফাতিহা সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে বিধায় মক্কী সূরা হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে ভেঙে পড়া যায় না বলে একে অখণ্ড সূরা নামেও ডাকা হয়। সূরা ফাতিহাকে ভেঙে পড়ার বিধান নেই।

সূরা ফাতিহা সূচি

সূরা ফাতিহা

 

নামকরণ

ফাতিহা শব্দটি আরবি “ফাতহুন” শব্দজাত যার অর্থ “উন্মুক্তকরণ”। এ সূরার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই এর এই নামকরণ করা হয়েছে। যার সাহায্যে কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা হয় তাকে ‘ফাতিহা’ বলা হয়। অন্য কথায় বলা যায়, এ শব্দটি ভূমিকা এবং বক্তব্য শুরু করার অর্থ প্রকাশ করে।

হাদিসে এ সুরার আরও চারটি নাম পাওয়া যায় যার একটি হলো উম্মুল। তবে ইসলামী লেখালিখিতে এ সুরার অন্ততঃ ২৩ অভিধা রয়েছে। একে সাবআ মাসানী বা বহুল পঠিত সাত আয়াত বলা হয়।

এই সূরাটির অন্য কয়েকটি নাম রয়েছে। যেমন- ফাতিহাতুল কিতাব, উম্মুল কিতাব, সূরাতুল-হামদ, সূরাতুস-সালাত, আস্‌-সাব্‌’য়ুল মাসানী।

নাযিল হওয়ার সময়-কাল

এটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত লাভের একেবারেই প্রথম যুগের সূরা। বরং হাদীসের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা থেকে জানা যায়, এটিই মুহাম্মাদের (সা.) ওপর নাযিলকৃত প্রথম পূর্ণাঙ্গ সূরা। এর আগে মাত্র বিচ্ছিন্ন কিছু আয়াত নাযিল হয়েছিল। সেগুলো সূরা ‘আলাক্ব’, ‘মুয্‌যাম্‌মিল’ ও ‘মুদ্‌দাস্‌সির’ ইত্যাদিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

বিষয়বস্তু

আসলে এ সূরাটি হচ্ছে একটি দোয়া। যে কোন ব্যক্তি এ গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে আল্লাহ প্রথমে তাকে এ দোয়াটি শিখিয়ে দেন। গ্রন্থের শুরুতে এর স্থান দেয়ার অর্থই হচ্ছে এই যে, যদি যথার্থই এ গ্রন্থ থেকে তুমি লাভবান হতে চাও, তাহলে নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক আল্লাহর কাছে দোয়া এবং সাহায্য প্রার্থনা করো।

মানুষের মনে যে বস্তুটির আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা থাকে স্বভাবত মানুষ সেটিই চায় এবং সে জন্য দোয়া করে। আবার এমন অবস্থায় সে এই দোয়া করে যখন অনুভব করে যে, যে সত্তার কাছে সে দোয়া করছে তার আকাংখিত বস্তুটি তারই কাছে আছে। কাজেই কুরআনের শুরুতে এই দোয়ার শিক্ষা দিয়ে যেন মানুষকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, সত্য পথের সন্ধান লাভের জন্য এ গ্রন্থটি পড়, সত্য অনুসন্ধানের মানসিকতা নিয়ে এর পাতা ওলটাও এবং নিখিল বিশ্ব-জাহানের মালিক ও প্রভু আল্লাহ হচ্ছেন জ্ঞানের একমাত্র উৎস— একথা জেনে নিয়ে একমাত্র তার কাছেই পথনির্দেশনার আর্জি পেশ করেই এ গ্রন্থটি পাঠের সূচনা কর।

এ বিষয়টি অনুধাবন করার পর একথা সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, কুরআন ও সূরা ফাতিহার মধ্যকার আসল সম্পর্ক কোন বই ও তার ভূমিকার সম্পর্কের পর্যায়ভুক্ত নয়। বরং এ মধ্যকার আসল সম্পর্কটি দোয়া ও দোয়ার জবাবের পর্যায়ভুক্ত। সূরা ফাতিহা বান্দার পক্ষ থেকে একটি দোয়া। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন তার জবাব । বান্দা দোয়া করে, “হে মহান প্রভু ! আমাকে পথ দেখাও”। জবাবে মহান প্রভু এই বলে সমগ্র কুরআন তার সামনে রেখে দেন,

এই নাও সেই হিদায়াত ও পথের দিশা যে জন্য তুমি আমার কাছে আবেদন জানিয়েছো “।

সূরা হুদ

বৈশিষ্ট্য

এই সূরাটি আল কুরআনের একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সূরা। প্রথমতঃ এ সূরা দ্বারাই পবিত্র কোরাআন আরম্ভ হয়েছে এবং এ সূরা দিয়েই সর্বশ্রেষ্ঠ এবাদত সালাত আরম্ভ করতে হয়। যে সকল সাহাবী সূরা আল-ফাতিহা সর্বপ্রথম নাযিল হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন, তাদের সে বক্তব্যের অর্থ বোধহয় এই যে, পরিপূর্ণ সূরারূপে এর আগে আর কোনো সূরা নাযিল হয়নি। এ জন্যই এ সূরার নাম “ফাতিহাতুল-কিতাব” বা “কুরআনের উপক্রমণিকা” রাখা হয়েছে।

‘সূরা আল্-ফাতিহা’ এদিক দিয়ে সমগ্র কোরআনের সার-সংক্ষেপ। এ সূরায় সমগ্র কোরআনের সারমর্ম সংক্ষিপ্ত আকারে বলে দেয়া হয়েছে। কোরআনের অবশিষ্ট সূরাগুলো প্রকারান্তরে সূরা ফাতিহারই বিস্তৃত ব্যাখ্যা। তাই এ সূরাকে সহীহ হাদীসে ‘উম্মুল কিতাব’, ‘উম্মুল কুরআন’, ‘কোরানে আযীম’ বলেও অভিহিত করা হয়েছে। হযরত রসূলে কারীম এরশাদ করেছেন যে –

যার হাতে আমার জীবন-মরণ, আমি তাঁর শপথ করে বলছি, সূরা আল-ফাতিহার দৃষ্টান্ত তাওরাত, ইনজীল, যাবুর প্রভৃতি অন্য আসমানী কিতাবে তো নেই-ই, এমনকি পবিত্র কোরআনেও এর দ্বিতীয় নেই।”

ইমাম তিরমিযী আবু হুরাইরাহ থেকে বর্ণনা করেছেন যে, রসূলে কারীম আরো বলেছেন যে –

সূরায়ে ফাতিহা প্রত্যেক রোগের ঔষধবিশেষ।

 

 

আয়াতসমূহ ও অর্থ

بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।
  1. ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ رَبِّ ٱلْعَالَمِينَ ۝
    আলহামদুলিল্লা-হি রাব্বিল আ-লামীন।
    সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।
  2. ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝
    আর রাহমা-নির রাহীম।
    অনন্ত দয়াময়, অতীব দয়ালু।
  3. مَالِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ ۝
    মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন।
    প্রতিফল দিবসের মালিক।
  4. إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ۝
    ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কানাছতা’ঈন।
    আমরা শুধু আপনারই দাসত্ব করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য কামনা করি।
  5. ٱهْدِنَا ٱلصِّرَاطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ ۝
    ইহদিনাসসিরা-তাল মুছতাকীম।
    আমাদের সরল পথনির্দেশ দান করুন।
  6. صِرَاطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ۝
    সিরা-তাল্লাযীনা আন’আম তা’আলাইহিম।
    তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন।
  7. غَيۡرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيۡهِمۡ وَلَا اَ۬لضَّآلِّينَ ص۝
    গাইরিল মাগদূ বি’আলাইহীম ওয়ালাদ্দাল্লীন। (আমিন )
    এবং তাদের পথে নয় যারা আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট । ( কবুল করুন )

সূরা ইউসূফ

ভাবানুবাদ

১:পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহর নামে।

২:সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্যে।

৩:অনন্ত দয়াময়, অতীব দয়ালু।

৪:বিচার দিবসের মালিক।

৫:আমরা শুধু আপনারই দাসত্ব করি এবং শুধু আপনারই নিকট সাহায্য কামনা করি।

৬:আমাদের সরল পথনির্দেশ দান করুন।

৭:তাদের পথে, যাদের আপনি অনুগ্রহ করেছেন, এবং তাদের পথে নয় যারা আপনার ক্রোধের শিকার ও পথভ্রষ্ট । ( কবুল করুন )

 

 

সূরা ফাতিহা আয়াত ১

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।
In the Name of Allâh, the Most Beneficent, the Most Merciful.

بِسْمِ اللّهِ الرَّحْمـَنِ الرَّحِيمِ
Bismi Allahi alrrahmani alrraheemi

YUSUFALI: In the name of Allah, Most Gracious, Most Merciful.
PICKTHAL: In the name of Allah, the Beneficent, the Merciful.
SHAKIR: In the name of Allah, the Beneficent, the Merciful.
KHALIFA: In the name of GOD, Most Gracious, Most Merciful.

সূরা ফাতিহা আয়াত ২

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ তা’আলার যিনি সকল সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা।
All the praises and thanks be to Allâh, the Lord of the ’Alamîn (mankind, jinns and all that exists).

حَمْدُ للّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
Alhamdu lillahi rabbi alAAalameena

YUSUFALI: Praise be to Allah, the Cherisher and Sustainer of the worlds;
PICKTHAL: Praise be to Allah, Lord of the Worlds,
SHAKIR: All praise is due to Allah, the Lord of the Worlds.
KHALIFA: Praise be to GOD, Lord of the universe.

২। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য যিনি জগতসমূহের পালনকর্তা ২০।

২০। আরবী শব্দ ”রব”-এর সাধারণতঃ অনুবাদ করা হয় ”প্রভু” বা ”প্রতিপালক”। এই শব্দটির আরও অর্থ হয় ”লালনকারী”, ”ভরণপোষণকারী” ”পরিপূর্ণতা দানকারী” ইত্যাদি। আল্লাহ্‌ তাঁর সৃষ্ট সকল জগতের লালন পালন করেন।

সূরা ফাতিহা আয়াত ৩

যিনি নিতান্ত মেহেরবান ও দয়ালু।
The Most Beneficent, the Most Merciful.

الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِالْغَيْبِ وَيُقِيمُونَ الصَّلاةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ
Alrrahmani alrraheemi

YUSUFALI: Most Gracious, Most Merciful;
PICKTHAL: The Beneficent, the Merciful.
SHAKIR: The Beneficent, the Merciful.
KHALIFA: Most Gracious, Most Merciful.

সূরা ফাতিহা আয়াত ৪

যিনি বিচার দিনের মালিক।
The Only Owner (and the Only Ruling Judge) of the Day of Recompense (i.e. the Day of Resurrection)

مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ
Maliki yawmi alddeeni

YUSUFALI: Master of the Day of Judgment.
PICKTHAL: Master of the Day of Judgment,
SHAKIR: Master of the Day of Judgment.
KHALIFA: Master of the Day of Judgment.

সূরা ফাতিহা আয়াত ৫

আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।
You (Alone) we worship, and You (Alone) we ask for help (for each and everything).

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
Iyyaka naAAbudu wa-iyyaka nastaAAeenu

YUSUFALI: Thee do we worship, and Thine aid we seek.
PICKTHAL: Thee (alone) we worship; Thee (alone) we ask for help.
SHAKIR: Thee do we serve and Thee do we beseech for help.
KHALIFA: You alone we worship; You alone we ask for help.

সূরা ফাতিহা আয়াত ৬

আমাদেরকে সরল পথ দেখাও,
Guide us to the Straight Way

اهدِنَــــا الصِّرَاطَ المُستَقِيمَ
Ihdina alssirata almustaqeema

YUSUFALI: Show us the straight way,
PICKTHAL: Show us the straight path,
SHAKIR: Keep us on the right path.
KHALIFA: Guide us in the right path;

সূরা ফাতিহা আয়াত ৭

সে সমস্ত লোকের পথ, যাদেরকে তুমি নেয়ামত দান করেছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি তোমার গজব নাযিল হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে।
The Way of those on whom You have bestowed Your Grace , not (the way) of those who earned Your Anger (such as the Jews), nor of those who went astray (such as the Christians). ,,

صِرَاطَ الَّذِينَ أَنعَمتَ عَلَيهِمْ غَيرِ المَغضُوبِ عَلَيهِمْ وَلاَ الضَّالِّينَ
Ihdina alssirata almustaqeema Sirata allatheena anAAamta AAalayhim ghayri almaghdoobi AAalayhim wala alddalleena

YUSUFALI: The way of those on whom Thou hast bestowed Thy Grace, those whose (portion) is not wrath, and who go not astray.
PICKTHAL: The path of those whom Thou hast favoured; Not the (path) of those who earn Thine anger nor of those who go astray.
SHAKIR: The path of those upon whom Thou hast bestowed favors. Not (the path) of those upon whom Thy wrath is brought down, nor of those who go astray.
KHALIFA: the path of those whom You blessed; not of those who have deserved wrath, nor of the strayers.

 

সার-সংক্ষেপ ১

সূরা ফাতেহাকে তিনটি অংশে বিভক্ত করা যায়। প্রথম ৪টি আয়াতে শুধুমাত্র স্রষ্টার প্রশংসা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশে আ’ল্লাহ্‌র এবাদত করার ইচ্ছা ব্যক্ত করা হয়েছে (আয়াত ৫)। তৃতীয় অংশে হেদায়েত চাওয়া হয়েছে। সূরা ফাতেহা বা”মুখবন্ধ”। সূরা ফাতেহাকে কোরান শরীফের প্রারম্ভে স্থাপন করা হয়েছে। এর কারণ নিম্নরূপ।

এই বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা মহান আ’ল্লাহ্‌। তিনিই এর সৃষ্টিকর্তা এবং তিনিইএর রক্ষাকর্তা। পৃথিবীতে তিনি আদম সন্তানকে প্রেরণ করেছেন তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে। প্রতিনিধির কাজ হচ্ছে আল্লাহ্‌র কাজের প্রতিনিধিত্ব করা, একমাত্র তাঁরই উপর নির্ভর করে সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা এবং আ’ল্লাহ্‌র কাছে নিজের কাজের জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকা।

ইসলাম অর্থ হচ্ছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ সর্বশক্তিমানের কাছে। সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে, আ’ল্লাহ্‌র উপরে নির্ভরশীলতা, জীবনের সর্বাবস্থাকে আল্লাহ্‌র দান হিসেবে গ্রহণ করার ক্ষমতা থেকেই জন্ম নেয় আত্মসমর্পনের মনোবৃত্তি। স্রষ্টার সাথে মানুষের এই সম্পর্ককেই ভাষার মাধুর্যে, সুন্দর বাচনভঙ্গিতে, উপযুক্ত শব্দ চয়নের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত আকারে এই সূরায় তুলে ধরা হয়েছে।

প্রথম চারটি আয়াতে আ’ল্লাহ্‌র প্রশংসা করা হয়েছে। ভক্তি ও ভালোবাসাই হচ্ছে প্রশংসার পূর্বশর্ত। যদি আমরা আল্লাহ্‌কে ভালবাসতে পারি, ভক্তি করতে পারি, তাঁর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারি, শুধুমাত্র তখনই আমরা সর্বান্তকরণে মহান আ’ল্লাহ্‌র প্রশংসা করতে পারবো।

ভক্তি, ভালোবাসা ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অন্তরে জন্মলাভ করবে আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ এবং সর্বোপরি আল্লাহর প্রশংসায় নিজের অহমবোধকে বিলিয়ে দেয়ার ইচ্ছা। যদি এই প্রশংসা হয় আন্তরিক, আমাদের হৃদয়ের গভীর থেকে উত্থিত, তবে তা আমাদের সত্তাকে আল্লাহর ইচ্ছার সাথে বিলীন করে দেয়। তখনই, শুধুমাত্র তখনই আমরা এই বিশ্বজগতের সব কিছুতেই তাঁর হাতের পরশ অনুভব করতে পারবো।

তাঁর সদিচ্ছা, রহমত, আমাদের সর্ব অনুভবকে আচ্ছন্ন করতে সক্ষম হবে। ফলে আমাদের আত্মা সকল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে। আমাদের সত্তায় বিরাজ করবে এক অনাবিল শান্তি। আত্মার এই বিশেষ অবস্থার সৃষ্টি হয় আ’ল্লাহ্‌কে প্রশংসা করার ক্ষমতা থেকে।

তাই আধ্যাত্মিক জগতের উন্নতির প্রথম ধাপই হচ্ছে স্রষ্টার প্রশংসায় মুখর হওয়া। তাই সূরা ফাতেহার প্রথম চারটি আয়াত শুরু হয়েছে আল্লাহ্‌র প্রশংসার মাধ্যমে। আল্লাহ্‌র সাথে মানুষের সম্পর্কের এটাই হচ্ছে প্রথম ধাপ।

সূরা ফাতিহা

এই প্রশংসায় আল্লাহ্‌র কোনও লাভ নাই। লাভ যা তা আমাদের। আমাদের লাভ আত্মিক উন্নতি। অন্ধকার থেকে আলোর জগতে যাত্রা। আমরা মহান আল্লাহ্‌র মহত্ব আমাদের হৃদয়ে অনুভব করতে পারবো। সেই কারণে সূরা ফাতেহার প্রথম চারটি আয়াতে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র প্রশংসা করা হয়েছে।

দ্বিতীয় অংশে [আয়াত৫] আল্লাহর এবাদত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে। যখন আমরা আল্লাহর মহত্ব হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তখনই আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে আল্লাহ্‌র প্রশংসা করতে পারি।

এই অনুভবের ক্ষমতা থেকেই জন্ম নেয় এক স্রষ্টার আনুগত্য করার ইচ্ছা বা আগ্রহ। জন্ম নেয় কৃতজ্ঞ হওয়ার প্রবণতা।

তৃতীয় অংশে বা শেষ অংশে আল্লাহ্‌র কাছে হেদায়েত চাওয়া হয়েছে যেন তিনি আমাদেরকে আমাদের জীবন পরিচালনার দিক-নির্দেশনা প্রদান করেন, তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনা করতে পারার যোগ্যতা যেন তিনি আমাদের দান করেন।

[আয়াত ৬+৭], যেন তাঁর আনুগত্যের ধ্যানে তন্ময় থেকে আমাদের আত্মা তার কাঙ্ক্ষিত মঞ্জিলে পৌঁছাতে পারে। আল্লাহ্‌ অভাবমুক্ত। আমাদের প্রশংসাবাক্য তাঁর প্রয়োজন নাই। আমাদের অভাব জানানোর জন্য তাঁর কাছে কোন আর্জিরও প্রয়োজন নাই।

কারণ তিনি সর্বজ্ঞ। আমাদের প্রয়োজন আমাদের থেকে তিনি বেশি জানেন। তাঁর অনুগ্রহ পুণ্যাত্মা, পাপী সবার জন্য সমভাবে বহমান। আমরা চাই বা না চাই কেউই তাঁর রহমত থেকে বঞ্চিত হয় না।

আমাদের প্রার্থনা আমাদের নিজেদের আত্মিক উন্নতির জন্য, শান্তির নিশ্চিত আলয়ে পৌঁছানোর জন্য।

সূরা ফতেহায় স্রষ্টার কাছে আমাদের এই আকুতি সুন্দরভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই আকুতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশই হচ্ছে আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রথম ধাপ। আত্মার আলোকিত জগতে অগ্রযাত্রার প্রথম প্রদক্ষেপ। স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ককে এই সাতটি আয়াতে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

সূরা ইউনুস

আরবী শব্দ “রহমান” ও “রহীম” ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়ে “Most gracious” ও “Most Merciful”। বাংলার অনুবাদ করা হয়েছে দয়াময় ও পরম করুণাময়। কিন্তু এ দু”টো শব্দ অনুবাদ করা বেশ দুঃসাধ্য। আরবী ভাষা এত সমৃদ্ধ, এত বাঙ্ময়, যে এ দু”টো শব্দের মধ্যে তুলনা করা ইংরেজি বা বাংলা ভাষার শব্দ ভাণ্ডারের সাহায্যে সম্ভব নয়।

ইংরেজি ভাষাতে অপেক্ষাকৃত ভালো [Comparative degree] তখনই বোঝানো যায় যখন অনেকের মধ্যে তুলনা চলে। কিন্তু আ’ল্লাহ্‌ এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি অতুলনীয়। তিনি সময় বা স্থানের উর্দ্ধে। সুতরাং তাঁর দয়া বা কৃপার গভীরতা কখনই তুলনামূলকভাবে বোঝানো সম্ভব নয়।

“দয়া”-পাপী-তাপীর জন্য ক্ষমা। যে ক্ষমার [forgiveness] শীতল বারিধারায় পাপীরা শান্তি লাভ করে। যখনই বান্দা তার কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় এবং সৃষ্টার কাছে ক্ষমা প্রার্থী হয়-তখনই মহান আ’ল্লাহ্‌র দয়া বা ক্ষমা বা রহমত আমাদের বিধৌত করে।

তাই তিনি “রহিম”। তাঁর দয়ার আমরা প্রার্থী। এখানে রহিম কথাটির দ্বারা আ’ল্লাহ্‌র দয়াকে প্রকাশ করা হয়েছে।

কিন্তু “রহমত” কথাটির অর্থ অনেক ব্যাপক। এই রহমত বা দয়া কারও চাইবার অপেক্ষা রাখে না। এই রহমত সমগ্র বিশ্ব জাহানের জন্য। তাই এই বিশ্ব চরাচরে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যা কিছু সৃষ্টি হবে, সব কিছুর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য।

আল্লা’হ্‌র এই করুণাধারা তাঁর সৃষ্টিকে ঘিরে থাকে তাকে রক্ষা করে, সংরক্ষণ করে, সুপথে পরিচালিত করে। ফলে সৃষ্টি হয় বিকশিত, প্রস্ফুটিত। পরিপূর্ণ রহমত হচ্ছে সম্পূর্ণ, পূর্ণাঙ্গ-যা আবহমান কাল থেকে তাঁর সৃষ্টির উপর বর্ষিত হচ্ছে। এ জন্যই রহমত শব্দটি শুধুমাত্র আল্লা’হ্‌র জন্য নির্দিষ্ট।

আ’ল্লাহর করুণাকে দু”ভাগে ভাগ করা যায়। (১) তিনি রহমান অর্থাৎ তার করুণা আয়াস নিরপেক্ষ অবদান। বিনা ক্লেশে, জাতি-ধর্ম ও পাপী পূণ্যবান নির্বিশেষে জীবনমাত্রই যা লাভ করে; যথা, পানি, বায়ু, সূর্যকিরণ, ইত্যাদি (২) আয়াসলভ্য অবদান, পরিশ্রমের বিনিময়ে জীব যা লাভ করে; যথা-ক্ষেতের ফসল, প্রাণীর আহার, আত্মার বিকাশ [মেধার বিকাশ] ইত্যাদি।

আ’ল্লাহ্‌র যে দয়া দ্বারা জীব প্রথমক্ত অবদানগুলো লাভ করে তাঁর সেই গুণবাচক নাম রহমান। আর যে গুণ দ্বারা জীব শেষোক্ত অবদানগুলি লাভ করে আ’ল্লাহ্‌র সেই গুণবাচক নাম রাহীম।

সূরা ফাতিহা

রহমান শব্দটি শুধুমাত্র আ’ল্লাহ্‌র জন্য নির্দিষ্ট। কোনও সৃষ্টিকে ”রহমান” বলা চলে না। কারণ আ’ল্লাহ্‌ ব্যতীত এমন কোনও সত্তা নাই যার রহমত বা দয়া সমগ্র বিশ্বচরাচরে সমভাবে বিস্তৃত হতে পারে।

এ শব্দটি একক সত্তার সাথে সংযুক্ত, একক সত্তার জন্য নির্দিষ্ট। কিন্তু “রহীম”[Merciful,বা দয়াময়] শব্দটি সাধারণভাবে আ’ল্লাহ্‌ ব্যতীতও ব্যবহার করা যায়। কারণ কোন ব্যক্তির পক্ষে অন্য ব্যক্তির প্রতি দয়া প্রদর্শন করা সম্ভব। এ জন্য “রহীম” শব্দটি মানুষের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

আ’ল্লাহ্‌র অপার করুণা বুঝতে পারা, হৃদয়ঙ্গম করা, হৃদয়ে ধারণ করা, অনুভব করা, এর সম্বন্ধে চিন্তা করা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।

তাইতো প্রতিটি সূরার প্রারম্ভে [৯ম সূরা ব্যতীত]” বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” দিয়ে শুরু হয় যেনো প্রতিটি মুসলমান আ’ল্লাহ্‌কে পাওয়ার জন্য, তাঁর করুণা পাওয়ার জন্য জীবন উৎসর্গ করে এবং শুধু তাঁরই করুণার প্রত্যাশী হয়।

সূরা তাওবা

যদি আমরা আমাদের হৃদয়ে প্রভুর ভালবাসা ও যত্ন, তাঁর করুণা ও দয়া এবং তাঁর ক্ষমতা, ন্যায়নীতি অনুধাবন করতে পারি তবে আমাদের হৃদয় মন ভক্তিপূর্ণ হয়ে তাঁর চরণে লুন্ঠিত হতে বাধ্য। আমরা সর্বান্তকরণে তাঁর আরাধনায় নিমগ্ন হব ফলে তাঁর করুণায় আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি [Short Coming] বুঝতে পারবো ও তাঁর অসীম ক্ষমতা হৃদয়ঙ্গম করতে পারবো। হৃদয় দিয়ে সর্বশক্তিমানকে অনুভব করার অর্থ তাঁর মহত্ব, তাঁর ক্ষমতা, তাঁর দয়া ও করুণা নিজের ভিতরে অনুভব করা।

এর ফলে আমরা শুধু যে সর্বান্তকরণে, ভক্তিপ্লুত হৃদয়ে তাঁর এবাদত করবো তাই-ই নয়; সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে, দুঃখ-কষ্টে সর্ব অবস্থাতেই শুধু তাঁরই সাহায্য কামনা করবো। আমরা আমাদের হৃদয়ের ভিতর থেকে অনুভব করবো তিনি ব্যতীত আর কেউই আনুগত্য পাওয়ার যোগ্য নয়। আর কেউই আমাদের সাহায্যের ক্ষমতা রাখে না। এখানে বহুবচন আমরা ব্যবহার করা হয়েছে। এই ”আমরা” হচ্ছে বৃহত্তর মানব গোষ্ঠি যারা পরহেজগার, যারা আল্লাহর সান্নিধ্য চায়। অর্থাৎ আমরা এক বিশ্বভ্রাতৃত্বের অংশ যারা আল্লাহ্‌র করুণার প্রত্যাশী। ফলে এই বিশ্বাস আমাদের এই শক্তিকে উজ্জীবিত করে যে, আমরা একা নই।

সূরা আল আ’রাফ

 

”দান কর” কথাটি পরিচালিত কর” এই অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ আমাদের সরল পথে পরিচালিত কর, কারণ আমরা উদভ্রান্ত, উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছি সংসারের হাজারো প্রলোভনে। এখানে ”দান কর” কথাটি দ্বারা প্রথমতঃ বুঝানো হচ্ছে প্রভু আমাদের সঠিক পথের সন্ধান দেবেন। দ্বিতীয়তঃ প্রভু আমাদের সেই সঠিক পথে পরিচালিত করবেন, যে পথ তাঁর পছন্দের, তাঁর অনুমোদিত। কারণ আমাদের জ্ঞানের পরিধি অত্যন্ত ক্ষুদ্র। বিশ্বনিয়ন্তার হস্তক্ষেপ ব্যতীত সঠিক সরল পথের হদিস করা সম্ভব নয়।

এই সরল পথ কখনও কখনও আপাতঃদৃষ্টিতে সঙ্কীর্ণ ও বিপদশঙ্কুল মনে হতে পারে, যে কারণে অনেকেই এই পথকে পরিহার করতে চায় [৯:১১]। সঙ্কীর্ণ ও শঙ্কুল হওয়ার কারণ পৃথিবীতে জীবন ধারণের পথ লোভ-লালসা, হিংসা-দ্বেষ, দুঃখ-কষ্টে ভরা। চাকচিক্যময় পৃথিবী আমাদের সঠিক পথের চিহ্নকে ঢেকে দিতে চায়। আমাদের পরিচালিত করে ক্ষমতা, অহংকার, লোভ-লালসা ভরা অন্ধকারময় জগতে। এ দুটো পথের মধ্যে আমরা কিভাবে পার্থক্য করবো ?

কিভাবে সঠিক পথকে খুঁজে নিতে পারবো? এর একটাই উপায় আর তা হচ্ছে সর্বশক্তিমানের কাছে পথের দিশা চেয়ে প্রার্থনা করা, তাঁর হেদায়েতের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করা। এই প্রার্থনার শক্তি অসীম, এর ফলে আল্লাহ্‌র নূর আমাদের হৃদয়কে আলোকিত করবে [Spiritual Insight], তাঁর আলোয় আমরা সঠিক পথের দিশা খুঁজে পাব। এই সেই পথ যে পথের যাত্রীরা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ লাভ করেছে। এদের সাথে আমরা পার্থক্য করতে পারবো তাদের-যারা অন্ধকার পথের যাত্রী। কারণ আল্লাহ্‌র কাছে অনুগ্রহ প্রার্থনার ফলে আমরা যে অন্তর্দৃষ্টি [Spiritual Insight] লাভ করবো তা আমাদের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য করতে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে, ভালো-মন্দের পার্থক্য করতে শেখাবে।

সূরা আল আ’রাফ

 

লক্ষ করুন ”Grace” শব্দটি, যার বাংলা অনুবাদ হতে পারে ”করুণা” বা ”অনুগ্রহ” যা শুধুমাত্র আল্লাহ্‌র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিন্তু Wrath- ”ক্রোধ” বা ”রোষ” শব্দটি হচ্ছে নৈর্ব্যক্তিক। যে কারও জন্য প্রযোজ্য। ”Grace” বা করুণা যা আমাদের সর্ব অবয়ব আমাদের সর্বসত্তাকে আচ্ছন্ন ও আবৃত্ত করে রাখে। অপরপক্ষে Wrath বা ”ক্রোধ” আমাদের কৃতকর্মেরই ফল। এটি ততটুকু যন্ত্রণাদায়ক যতটুকু আমাদের কৃতকর্ম। ”Grace” মানুষকে দেয় অপার শান্তি, জীবনকে ভরিয়ে তোলে শান্তির ঐক্যতানে [Peace and harmony]।

এখানে দু”ধরণের বিপথগামী লোকের কথা বলা হয়েছে। প্রথম দল যারা আল্লাহ্‌র রোষে পতিত কারণ তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহ্‌র আইন অমান্য করে। ফলে এরা অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হয় অর্থাৎ তাদের আত্মা অন্ধকারে আবৃত হয়, বঞ্চিত হয় অন্তর্দৃষ্টি থেকে। দ্বিতীয় দল বিপথগামী কারণ আল্লাহ্‌র বাণীর প্রতি তাদের অবহেলা ও অমনোযোগ ইচ্ছাকৃত নয় বরং চিন্তাহীনতার জন্য। প্রত্যেক দলই তাদের নিজেদের কৃতকর্মের ফল ভোগ করবে। এই দু”দলের বিপরীত আর এক দল লোকের কথা বলা হয়েছে-

যারা আল্লাহ্‌র করুণা ধারায় সঞ্জীবিত। যাদের পথ আল্লাহ্‌র নূরে আলোকিত। এই দলের লোকেরা আল্লাহ্‌র ইচ্ছার কাছে সমর্পিত। ফলে তাদের চলার পথের ভুল-ভ্রান্তি থেকে আল্লাহ তাদের রক্ষা করেন। চলার পথের নানা প্রলোভনকে তারা জয় করতে সক্ষম হন। এখানে অন্ধকারময় জগৎটা কোন জীবনের পথ বলে অনুবাদ করা ঠিক নয়; বরং বলা উচিত যে, জীবনে চলার পথে উপরে উল্লেখিত দু”রকমের বিপদজনক অবস্থায় আমরা পড়তে পারি। সেই বিপদ সঙ্কুল অবস্থা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এবং সঠিক পথে চলার শক্তির জন্যই আমাদের আকুল আবেদন।

সূরা আল মায়েদা

 

সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা

এ সূরার প্রথম ও তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ্‌র গুণবাচক নামসমূহের মধ্যে আর-রাহমানআর-রাহীম উল্লিখিত হয়েছে। রহম শব্দের অর্থ হচ্ছে দয়া, অনুগ্রহ। এই ‘রহম’ ধাতু হতেই ‘রহমান’ ও ‘রহীম’ শব্দদ্বয় নির্গত হয়েছে। ‘রহমান’ শব্দটি আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্য কারও জন্য ব্যবহার করা জায়েয নেই। অন্যদিকে ‘রহীম’ সৃষ্টজগতের কারও কারও গুণ হতে পারে। তবে আল্লাহ্‌র গুণ হলে সেটা যে অর্থে হবে অন্য কারও গুণ হলে সেটা একই অর্থে হবে না।

সূরাটির দ্বিতীয় আয়াতে আল-হামদু কথাটি আশ-শুক্-র্ থেকে অনেক ব্যাপক, যা আধিক্য ও পরিপূর্ণতা বুঝায়। ‘আশ-শুক্-র্ লিল্লাহ’ বলার অর্থ হতো এই যে, আমি আল্লাহ্‌র যে নিয়ামত পেয়েছি, সেজন্য আল্লাহ্‌র শুকরিয়া আদায় করছি। অপরদিকে ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ এর সম্পর্ক শুধু নিয়ামত প্রাপ্তির সাথে নয়। মানুষ যখন আল্লাহ্‌ ছাড়া অপর কারো গুণ সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে তার প্রশংসা করতে শুরু করে, তখন মানুষ তার ভক্তি-শ্রদ্ধার জালে বন্দী হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সে মানুষের দাসত্ব ও মানুষের পূজা করতে আরম্ভ করে। এই অবস্থা মানুষকে শিরকের পথে পরিচালিত করতে পারে। সে জন্য যাবতীয় ‘হামদ’ একমাত্র আল্লাহ্‌র জন্যই করার শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

সৃষ্টিজগতকে আলাম এবং বহুবচনে আলামীন বলা হয়। সূরা আশ-শু’আরার ২৩-২৪ আয়াতদুটিতে বলা হয়েছে,
ফিরআউন বলল :

রাব্বুল আলামীন কি?” মূসা বললেন : “যিনি আকাশসমূহ-ভূপৃষ্ঠ এবং এ দু’টির মধ্যবর্তী সমস্ত জিনিসের রব।

রব হচ্ছেন যিনি সৃষ্টি করা, প্রতিটি জিনিসের পরিমাণ নির্ধারণ করা, পথ প্রদর্শন ও আইন বিধান দেওয়া, লালন-পালন করা, রিযিক্‌ দান করা, জীবনদান করা, মৃত্যু প্রদান করা, সন্তান দেয়া, আরোগ্য প্রদান করা ইত্যাদি সবকিছু করার ক্ষমতা রাখেন। চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ্‌কে ‘বিচার দিনের মালিক’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। বিচার দিন সম্পর্কে সূরা আল-ইনফিতারের ১৭-১৯ নং আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে,

আর কিসে আপনাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? তারপর বলি, কিসে আপনাকে জানাবে প্রতিদান দিবস কী? সেদিন কোনো মানুষ অন্য মানুষের জন্য কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখবে না। আর সেদিন সকল বিষয় হবে আল্লাহর কর্তৃত্বে।

পঞ্চম আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্যসব উপাস্যের ইবাদাত করা ও সেগুলোর কাছে সাহায্য চাওয়াকে অস্বীকার করা হয়েছে। ইবাদত হল ভয়-ভীতি, আশা-আকাঙ্খার সাথে সেইসব কথা বা কাজ সম্পাদন করা, যা আল্লাহ পছন্দ করেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন। যেসব কথা ও কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন তা থেকে বিরত থাকাও ইবাদাত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা অথবা কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য কামনা করা শির্ক হিসেবে গণ্য হয়।

সূরাটির ষষ্ঠ আয়াতে হিদায়াত চাওয়া হয়েছে। স্নেহ ও করুণা এবং কল্যাণ কামনাসহ কাউকে মঙ্গলময় পথ দেখিয়ে দেয়া ও মনজিলে পৌঁছিয়ে দেয়াকে আরবী পরিভাষায় হিদায়াত বলে। ‘হিদায়াত’ শব্দটির দুইটি অর্থ। একটি পথ প্রদর্শন করা, আর দ্বিতীয়টি লক্ষ্য স্থলে পৌঁছিয়ে দেয়া। সিরাত শব্দের অর্থ হচ্ছে রাস্তা বা পথ। আর মুস্তাকীম হচ্ছে, সরল সোজা।

সূরাটির শেষ আয়াত এর পূর্বের আয়াতের ‘সরলপথ’-এর ব্যাখ্যা।

সূরা আল-ফাতিহার প্রথম তিনটি আয়াতে আল্লাহ্‌র প্রশংসার বর্ণনা করা হয়েছে এবং প্রশংসার সাথে সাথে ঈমানের মৌলিক নীতি ও আল্লাহ্‌র একত্ববাদের বর্ণনাও সূক্ষভাবে দেয়া হয়েছে। তৃতীয় আয়াতে এর দু’টি শব্দে প্রশংসার সাথে সাথে কিয়ামত ও পরকালের কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ আয়াতের এক অংশে প্রশংসা এবং অপর অংশে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়েছে। مَـالِكِ يَوْمِ الدِّينِ – এর মধ্যে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, মানুষ পরকালেও আল্লাহ্‌র মুখাপেক্ষী। প্রতিদান দিবসে আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো সাহায্য পাওয়া যাবে না।

একজন বুদ্ধিমান ও বিবেকবান ব্যক্তি মনের গভীরতা থেকেই এ স্বতঃস্ফুর্ত স্বীকৃতি উচ্চারণ করছে যে, আমরা তোমাকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করি না। এ মৌলিক চাহিদাই إِيَّاكَ نَعْبُدُ তে বর্ণনা করা হয়েছে। অভাব পূরণকারী একক সত্তা আল্লাহ্‌, সুতরাং নিজের যাবতীয় কাজে সাহায্যও তার নিকট প্রার্থনা করবে। এ মৌলিক চাহিদাই বর্ণনা وإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ -এ করা হয়েছে। মোটকথা, এ চতুর্থ আয়াতে একদিকে আল্লাহ্‌র প্রশংসার সাথে একথারও স্বীকৃতি রয়েছে যে, ইবাদত ও শ্রদ্ধা পাওয়ার একমাত্র তিনিই যোগ্য। অপরদিকে তার নিকট সাহায্য ও সহায়তার প্রার্থনা করা এবং তৃতীয়তঃ আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত না করার শিক্ষাও দেয়া হয়েছে। শেষ তিনটি আয়াতে মানুষের দোয়া ও আবেদনের বিষয়বস্তু এবং এক বিশেষ প্রার্থনা পদ্ধতি শিক্ষা দেয়া হয়েছে।

সূরা ইউসূফ

সম্পর্কিত হাদিস:

একটি হাদীসে মুহাম্মাদের এক সঙ্গীর গল্প বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি এক বিষাক্রান্ত আদিবাসী প্রধানের ঔষধ হিসাবে আল-ফাতিয়াহ পাঠ করেছিলেন। হাদীস অনুসারে মুহাম্মদ পরে সঙ্গীকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি কীভাবে জানলেন যে এটি রুক্বায়াহ [ঔষধ]?” মুহাম্মদ আল বুখারী তার সংগ্রহে রেকর্ড করেছেন:

আবু সাইদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত:

যখন আমরা আমাদের একটি যাত্রায় ছিলাম, আমরা এমন এক জায়গায় ফিরে গেলাম যেখানে একজন দাসী মেয়ে এসে বলল,

“এই গোত্রের প্রধান বিচ্ছু দ্বারা আহত হয়েছিল এবং আমাদের লোকেরা উপস্থিত নেই; তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে তাকে চিকিৎসা করতে পারে (কিছু পাঠ করে)?”

তারপরে আমাদের একজন লোক তার সাথে চলে গেল। যদিও আমরা মনে করিনি যে তিনি এই জাতীয় কোনও চিকিৎসা জানতেন। কিন্তু তিনি কিছু পাঠ করে চিকিৎসা করলেন এবং অসুস্থ লোকটি সুস্থ হয়ে উঠল এবং তারপরে তিনি তাকে ত্রিশটি ভেড়া উপহার দিয়েছিলেন এবং (পুরস্কার হিসাবে) আমাদেরকে দুধ পান করান।

তিনি ফিরে আসলে, আমরা আমাদের বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনি কি কিছু পাঠ করে চিকিৎসা করা জানেন?” তিনি বলেছিলেন, “না, তবে আমি কেবল সূরা আল-ফাতিহা আবৃত্তি করে চিকিৎসা করেছি।” আমরা বললাম, আমরা মদীনা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বা নবীকে জিজ্ঞাসা করার আগ পর্যন্ত কিছু না বলতে (এ সম্পর্কে), আমরা রাসূলের নিকট উল্লেখ করেছিলাম (আমরা যে মেষগুলি নিয়েছিলাম তা গ্রহণ করা বৈধ ছিল কি না তা জানতে) ।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি কীভাবে জানতে পেরেছিলেন যে এটি (আল-ফাতিহা) চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে? আপনার পুরস্কার বিতরণ করুন এবং আমার জন্য এটির একটি অংশও অর্পণ করুন।”

— মুহাম্মদ আল বুখারী, সহীহ আল বুখারী

 

অনুরূপ সংস্করণ পাওয়া যায়: আল বুখারী: ০০৭.০৭১.৬৪৫ — ঔষধ; আল বুখারী: ০০৭.০৭১.৬৩৩ — ঔষধ; আল বুখারী: ০০৭.০৭১.৬৩২ — ঔষধ

মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ লিপিবদ্ধ করেছেন আবু হুরায়রাহ বলেছিলেন যে মুহাম্মাদ বলেছেন:

কেউ যদি এমন প্রার্থনা দেখে যেখানে সে উম্মুল কুরআন তিলাওয়াত করে না, তবে এর ঘাটতি রয়েছে [তিনি এই তিনবার বলেছেন] এবং তা সম্পূর্ণ হয় না।

— মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম

 

অনুরূপ একটি কাহিনী আল বুখারীতে পাওয়া যায়: ০০১.০১২.৭২৩ —সালাতের বৈশিষ্ট্যসমূহ।

মুসলিম ইবনে আল হাজ্জাজ লিপিবদ্ধ করেছেন:

“হযরত জিব্রাইল (আঃ) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসে ছিলেন, তখন তিনি তাঁর উপরে একটি শব্দ শুনলেন এবং মাথা উঠালেন। তিনি বললেন: ‘এটি আকাশের একটি দরজা যা আজ খোলা হয়েছে এবং যা আজকের আগে কখনও খোলা হয়নি।’ সেখান থেকে একজন ফেরেশতা নেমে এসেছিলেন। এবং তিনি (হযরত জিব্রাইল) বলেছেন: ‘এটি এমন এক ফেরেশতা যিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন, যিনি এর আগে কখনও অবতরণ করেননি।’ তিনি (সেই ফেরেশ্তা) শান্তির শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেনঃ দুটি নূরের সুসংবাদ দাও; যার পূর্বে আপনার কোন নবীকে দান করা হয়নি: কিতাবের সূরা ফাতিহা (সূচনা অধ্যায়) এবং সূরা বাকারার শেষ। আপনি তাদের এটি দেওয়া ছাড়া একটি শব্দও পাঠ করবেন না।

— মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ, সহিহ মুসলিম

সুরা আল-ফাতিহার উপকার ও ফযীলত:

হাদীসসমূহে বর্ণিত ফজিলত ও উপকারিতা (আরবি: فضائل ) এর কারণে কিছু সূরাকে ইসলামের অনুগামীরা বিশেষ গুরুত্ব দেয়। বিভিন্ন হাদীসের কাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা সুন্নি ও শিয়া মুসলিমদের মধ্যে পরিবর্তিত হয় এবং একটি হাদীসের নিশ্চিত সত্যতার বিভিন্ন স্তরের শ্রেণিবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন পদ রয়েছে।

সুন্নি অনুযায়ী উপকার:

অন্যতম সেরা সূরা

আহমদ ইবনে হাম্বল তাঁর মুসনাদে (হাদিস সংকলনে) লিপিবদ্ধ করেছেন যে আবু সা’ইদ বিন আল-মু’আললা বলেছেন: “যখন নবী আমাকে ডেকেছিলেন তখন আমি প্রার্থনা করছিলাম, সুতরাং নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তাকে উত্তর দিলাম না। আমি তখন তার কাছে গেলাম এবং সে বলল, ‘তোমাকে আসতে বাধা দেয় কি?’ আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি প্রার্থনা করছিলাম।’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহ কি বলেননি,’ হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে (তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমে) এবং (তাঁর) রাসূলের উত্তর দিন, যখন তিনি আপনাকে তাঁর কাছে ডাকেন, যা আপনাকে জীবন দান করে। ” ? ‘

তিনি তখন বলেছিলেন,

আপনি মসজিদ ছেড়ে যাওয়ার আগে আমি আপনাকে কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা শিখিয়ে দেব।

তিনি আমার হাতটি ধরেছিলেন এবং যখন তিনি মসজিদ ছেড়ে যাচ্ছেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বলেছিলেন: “আমি আপনাকে কোরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ সূরা শিখিয়ে দেব।” উত্তরে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’ “আল-হামদু লিল্লাহি রাব্বিল-আলামীন,” এটি সাতটি বারবার আবৃত (আয়াত) এবং আমাকে দান করা মহিমান্বিত কুরআন। ” (আল বুখারী, আবু দাউদ, আন-নাসাই এবং ইবনে মাজাহও এ হাদীসটি লিপিবদ্ধ করেছেন।)

রোগ নিরাময়ের জন্য আল-ফাতিহা ব্যবহৃত হয়েছিল:

আল বুখারী তার সংগ্রহে লিপিবদ্ধ করেছেন: আবু সা ‘ইদ আল খুদরী বলেছেন: “আমরা যখন আমাদের একটি যাত্রায় ছিলাম, তখন আমরা এমন এক জায়গায় ফিরে গেলাম যেখানে একজন দাসী এসে বলল,” এই গোত্রের প্রধান বিচ্ছু দ্বারা আহত হয়েছিল এবং আমাদের লোকেরা উপস্থিত নেই; তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে যে তাকে চিকিৎসা করতে পারে (কিছু পাঠ করে)? ” তারপরে আমাদের একজন লোক তার সাথে চলে গেল যদিও আমরা মনে করি নি যে তিনি এই জাতীয় কোনও চিকিৎসা জানেন। কিন্তু তিনি কিছু পাঠ করে চিকিৎসা করলেন এবং অসুস্থ লোকটি সুস্থ হয়ে উঠল এবং তারপরে তিনি তাকে ত্রিশটি ভেড়া উপহার দিয়েছিলেন এবং আমাদেরকে দুধ পান করান (পুরস্কার হিসাবে)। তিনি ফিরে আসলে, আমরা আমাদের বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলাম,

আপনি কি কিছু পাঠ করে চিকিৎসা করা জানেন?

তিনি বলেছিলেন,

না, তবে আমি কেবল সূরা আল-ফাতিহা আবৃত্তি করে চিকিৎসা করেছি।

আমরা বললাম, আমরা মদীনা পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বা নবীকে জিজ্ঞাসা করার আগ পর্যন্ত কিছু না বলতে (এ সম্পর্কে), আমরা রাসূলের নিকট উল্লেখ করেছিলাম (আমরা যে মেষগুলি নিয়েছিলাম তা গ্রহণ করা বৈধ ছিল কি না তা জানতে) । নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি কীভাবে জানতে পেরেছিলেন যে এটি (আল-ফাতিহা) চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে? আপনার পুরস্কার বিতরণ করুন এবং আমার জন্য এটির একটি অংশও অর্পণ করুন। ” (আল বুখারী ০০৬.০৬১.৫২৯ – কুরআনের ফজিলত)

(অনুরূপ সংস্করণগুলিতে পাওয়া গেছে: আল বুখারী: ০০৭.০৭১.৬৪৫ – ঔষধ; আল বুখারি: ০০৭.০৭১.৬৩৩ – ঔষধ; আল বুখারী: ০০৭.০৭১.৬৩২ – ঔষধ)

নামাজে প্রয়োজনীয়তা

মুসলিম ইবনে আল-হাজ্জাজ লিপিবদ্ধ করেছেন হযরত আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেছেন যে নবী বলেছেন:

“যে ব্যক্তি এমন কোন সালাত আদায় করে যাতে সে উম্মুল কুরআন (যেমন, আল-ফাতিহা) পড়ে না, তবে তার সালাত অসম্পূর্ণ।” (সহিহ মুসলিম) (আল বুখারীতে একই ধরনের কাহিনী পাওয়া গেছে: ০০১.০১২.৭২৩ – প্রার্থনার বৈশিষ্ট্য)

দুই নূরের একটি

মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ লিপিবদ্ধ করেছেন ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেছেন:

“হযরত জিব্রাইল (অর্থাৎ ফেরেশতা গ্যাব্রিয়েল) যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বসে ছিলেন, তখন তিনি তাঁর উপরে একটি শব্দ শুনলেন এবং মাথা উঠালেন। তিনি বললেন: ‘এটি আকাশের একটি দরজা যা আজ খোলা হয়েছে এবং যা আজকের আগে কখনও খোলা হয়নি।’ সেখান থেকে একজন ফেরেশতা নেমে এসেছিলেন। এবং তিনি (হযরত জিব্রাইল) বলেছেন: ‘এটি এমন এক ফেরেশতা যিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন, যিনি এর আগে কখনও অবতরণ করেননি।’ তিনি (সেই ফেরেশ্তা) শান্তির শুভেচ্ছা জানিয়ে বললেনঃ দুটি নূরের সুসংবাদ দাও; যার পূর্বে আপনার কোন নবীকে দান করা হয়নি: কিতাবের সূরা ফাতিহা (সূচনা অধ্যায়) এবং সূরা বাকারার শেষ। আপনি তাদের এটি দেওয়া ছাড়া একটি শব্দও পাঠ করবেন না। (সহিহ মুসলিম)

“যখন আপনি নিজের বিছানায় শুয়ে আছেন [ঘুমের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন] এবং আপনি [বইয়ের সূচনা অধ্যায়] এবং সূরা আল-ইখলাস তিলাওয়াত করেন, তখন আপনি মৃত্যু ব্যতীত সমস্ত কিছু থেকে সুরক্ষিত হয়ে পড়ে…” [দুর্বল ধায়েফ আত-তারগীব ওয়া তারহেব: ৩৪]

“ফাতিহা ও আয়াতুল কুরসী: কোন দাস কখনই তাদের ঘরে এইদুটি আবৃত্তি করবে না; এছাড়া সেদিন কোনও জিন বা মানবের কোন খারাপ দৃষ্টি তাদেরকে প্রভাবিত করবে না…” [ধাইফ আল জাম আমি আস-সাগীর:৩৯৫২; আলেম আলবানীর মতে দুর্বল। “ফাতিহা কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।” [দুর্বল ধইফ আল জাম আমি আস-সাগীর: ৩৯৪৯]

cropped cropped islamia gurukul logo সূরা ফাতিহা সূচি [ কোন বিষয়, গ্রন্থ বা জিনিসের উদ্বোধন করা ] সূরা নং ১। পবিত্র কুরআন

শিয়া অনুযায়ী উপকার:

মুহম্মদের একজন সাহাবী বর্ণনা করেছেন যে তিনি একবার মুহাম্মদের উপস্থিতিতে এই সূরাটি তেলাওয়াত করেছিলেন, তিনি বলেছিলেন, “যার হাতে আমার প্রাণ, তার দ্বারা এ জাতীয় অনুরূপ কিছু তাওরাতে (তাওরাত) , ইনজিল ( সুসমাচার), জাবুর (সাম) বা এমনকি কোরআনও অন্তর্ভুক্ত হয়নি।”

মুহাম্মদ একবার জাবির ইবনে আবদাল্লাহ আনসারিকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি আপনাকে এমন একটি সূরা শিখিয়ে দেব যার সাথে পুরো কুরআনে আর কোন তুলনা নেই?” জাবির জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, এবং হে আল্লাহর নবী আমার পিতা-মাতা আপনার উপর বন্দিত্বমোচন করতে পারেন।” সুতরাং মুহাম্মদ তাকে সূরা আল-ফাতিহা শিখিয়েছিলেন। তখন মুহাম্মদ জিজ্ঞাসা করলেন, “জাবির, আমি কি এই সূরা সম্পর্কে কিছু বলতে পারি?” জাবির জবাব দিলেন, “হ্যাঁ, এবং হে আল্লাহর নবী আমার পিতা-মাতা আপনার উপর বন্দিত্বমোচন করতে পারেন।” মুহাম্মদ বলেছিলেন, “এটি (সূরা আল-ফাতিহা) মৃত্যু ব্যতীত প্রতিটি অসুস্থতার নিরাময়।”

ইমাম আবুআবদিল্লাহ জাফর আস-সাদিক বলেছেন যে যার রোগ সুরা আল ফাতিহার দ্বারা নিরাময় করা যায় না, তবে সেই ব্যক্তির কোন চিকিৎসা নেই। একই বর্ণনায় লেখা আছে যে এই সূরাটি শরীরের যে অংশে ব্যথা হচ্ছে, সে অংশে ৭০ বার তেলাওয়াত করা হলে ব্যথা অবশ্যই দূর হবে। প্রকৃতপক্ষে এই সূরার শক্তি এতটাই বেশি যে বলা হয়ে থাকে যে, যদি কেউ এটি একটি মৃত দেহের উপরে ৭০ বার তেলাওয়াত করে, তবে সেই দেহটি চলতে শুরু করলে (অর্থাৎ জীবনে ফিরে আসে) তা আপনাকে অবাক করা উচিত নয়। সুরা ফাতিহা শারীরিক ও আধ্যাত্মিক অসুস্থতাও নিরাময় করে।

ইবলিস ৪টি অনুষ্ঠানে শোক প্রকাশ করে:

আম্বারী তাঁর “কিতাবাবুর-রাদ” গ্রন্থে মুজাহিদ ইবনে জাবরের কাছ থেকে উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ তা’আলার অভিশপ্ত ইবলিস চারবার শোক করেছিলেন: প্রথমে যখন তাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল; দ্বিতীয়ত যখন তাকে স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে ফেলে দেওয়া হয়েছিল; তৃতীয়ত যখন মুহাম্মদকে নবুওয়াত দেওয়া হয়েছিল; চতুর্থত যখন সূরা ফাতিহা নাযিল হয়েছিল এবং তা মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছিল।

 

আরও দেখুনঃ 

Leave a Comment