স্কলারদের যুক্তি-তর্ক | স্যাটানিক ভার্সেস-এর ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

স্কলারদের যুক্তি-তর্ক | স্যাটানিক ভার্সেস-এর ঘটনা, যেসব স্কলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষ্য মেনে নেননি তাঁদের বক্তব্য ও যুক্তি হলো, এটা কীভাবে সম্ভব যে নবিজি (সা) জিব্রাইল (আ) এবং শয়তানের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেননি? দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা মেনে নিলে তো ওহি নিজেই বিশুদ্ধ না থাকার সম্ভাবনা স্বীকার করতে হয়। তাই একজন স্কলার বলেন, “ইসনাদগুলো সূর্যের মতো (দৃশ্যমান) হলেও আমি এই কাহিনিটি গ্রহণ করব না।” আল-কাদি আইয়াদের কথায়, “নবিজি (সা) শয়তানের তেলাওয়াত গ্রহণ করেছেন, একথা আমরা কীভাবে গ্রহণ করব?” নবিরা হলেন ‘মাসুম’ (অর্থাৎ তাঁরা কোনো পাপ করতে পারেন না)। সুতরাং আমরা দ্বিতীয় বা তৃতীয় ভাষা মেনে নিতে পারি না।

 

স্কলারদের যুক্তি-তর্ক | স্যাটানিক ভার্সেস-এর ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

স্কলারদের যুক্তি-তর্ক | স্যাটানিক ভার্সেস-এর ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

অন্যদিকে ইবনে হাজারের ভাষ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ভাষ্যের কাহিনি অনুসারে নবিজির (সা) সম্মান ও সততা নিয়ে কোনো আপস হয়নি; সুতরাং আমরা তৃতীয় ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করব এবং দ্বিতীয় ভাষা গ্রহণ করব। দ্বিতীয় ভাষ্যের বিপক্ষের যুক্তিগুলো তাঁর কাছে বড় কোনো বিষয় নয়। তৃতীয় ভাষ্যের পক্ষের স্কলার ইবনে তাইমিয়া নিঃসন্দেহে আল্লাহর রসুলকে (সা) ‘মাসুম’ বা নিষ্পাপ বলে বিশ্বাস করতেন। তবে তাঁর মাসুম হওয়ার সংজ্ঞা অন্য মুসলিমদের চেয়ে আলাদা।

নবিরা কি ভুল করতে পারেন? তাঁর মতে নবিরা বড় ভুল, অশ্লীল পাপ বা মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। এ বিষয়ে তিনি অনেক উদাহরণ দিয়েছেন। যেমন, বদরের যুদ্ধের বন্দিদের বিষয়ে আল্লাহ সুরা আনফালে বলেছেন, “দেশে সম্পূর্ণভাবে শক্রনিপাত না করা পর্যন্ত বন্দি রাখা কোনো নবির পক্ষে সমীচীন নয়।” [৮:৬৭] ইবনে তাইমিয়া বলেছেন, নবিরা ছোটোখাটো পাপ করতে পারেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ তওবা করেন এবং ওই পাপের পনুরাবৃত্তি করেন না। এ ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ আদম (আ)।

ইবনে তাইমিয়ার মতে, আমাদের নবিজি (সা) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হলেও সর্বোপরি তিনি একজন মানুষ। তিনি পাপ করতে পারেন, তবে তৎক্ষণাৎ অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছেন। অনুতপ্ত হয়ে তওবা করার মাধ্যমেই নবিরা পরিপূর্ণতা পান। এর পক্ষে তিনি সুরা ফাতহের দ্বিতীয় আয়াত উদাহরণ হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন: “এ এজন্য যে, তিনি তোমার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিগুলো মাফ করবেন, তোমার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করবেন এবং তোমাকে সরল পথে পরিচালিত করবেন।”

[৪৮: 2/ ইবনে তাইমিয়া আরও বলেন, নবিরা মানুষ হিসেবে যতটা নিখুঁত হওয়া সম্ভব ততটা নিখুঁত। কিন্তু তাঁরা তো ফেরেশতা নন। ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য অনুসারে, ওহিটি ত্রুটিপূর্ণ নয়, এ ক্ষেত্রে ওহির বিশুদ্ধতা রক্ষা পেয়েছে। এই কাহিনির মধ্য দিয়ে নবিজি (সা) বরং সত্যবাদী হিসেবে আরও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

ইবনে তাইমিয়ার বক্তব্য অনুসারে, আমরা কেন ওই একই নীতি এই কাহিনিতে প্রয়োগ করতে পারব না? তিনি বলেন, আল্লাহ শয়তানকে দুটি আয়াত উপস্থাপন করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে শয়তান যা বলেছিল তা আল্লাহ তায়ালা বাতিল করে দিয়েছেন। ফলে নবিজি (সা) এর দায় থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন, এবং তিনি পুরো ব্যাপারটি প্রকাশ করেছেন। নিঃসন্দেহে এই কাহিনি ও সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো খুবই স্পর্শকাতর।

কিন্তু আমাদের এসব আয়াত নিয়ে কখনোই ভয় পাওয়া উচিত নয়, বিশেষত আমরা যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম অধ্যুষিত দেশে বাস করি। এখানে মানুষ বলতে পারে, “দেখো, তোমাদের ধর্মগ্রন্থেই এটা বলছে!” যেসব মুসলিম এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যকভাবে জানেন না, তাঁরা যখন অমুসলিমদের লেখা বইয়ে এগুলো দেখতে পান, তখন অবাক হয়ে বলেন, ‘আউজুবিল্লাহ! এটা কীভাবে সম্ভব?’ আসলে এই কাহিনিগুলো না এড়িয়ে গিয়ে আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। এগুলো একাডেমিকভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

(ইয়াসির কাদি) মত আল্লাহ আজ্জা ওয়াজাল সত্য জানেন। তবে জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিচরণকারী একজন নবীন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার (ইয়াসির কাদি) মতটি হলো, প্রথম ভাষ্যটি সত্য। নিচে উল্লিখিত কারণে আমরা দ্বিতীয় ও তৃতীয় ভাষ্য বাদ দিতে পারি:

১) ইবলিস নবিজিকে (সা) অন্তঃপ্রেরণা দিতে পারে এটা মেনে নিলে এটাও মেনে নিতে হবে যে ওহি নাজিলের প্রক্রিয়াটিতে হস্তক্ষেপ করা সম্ভব। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তো নিজেই কোরানে ওহির বিশুদ্ধতা সম্পর্কে গ্যারান্টি দিয়েছেন [৪১:৪২], [১৫:৯], [২৬:১৯২-১৯৩]’।

২) স্যাটানিক ভার্সেসের ঘটনা নিশ্চিতরূপে প্রমাণিত নয়। এ সংক্রান্ত প্রতিটি বর্ণনার মধ্যেই দুর্বলতা রয়েছে। কোনো বর্ণনার যোগসূত্রই নবি করিম (সা) পর্যন্ত পৌঁছেনি ।

৩) ইসনাদের বিশ্লেষণ আপাতত ধর্তব্য না হলেও লক্ষ করুন, কাহিনিটির অনেক ভাষ্য আছে। অন্য একটি ভাষ্য অনুসারে, নবিজি (সা) নাকি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন, তাই পুরো ব্যাপারটি গোলমাল করে ফেলেছেন। একটি ভাষ্যে তিনি কাবায় নামাজ পড়ছিলেন। কিন্তু আরেকটি ভাষ্য অনুসারে তিনি লোকসমাবেশে বসে তেলাওয়াত করছিলেন।

৪) কোনো সহিহ হাদিস গ্রন্থে এই ঘটনার উল্লেখ নেই। হাদিসের গ্রন্থগুলোর কথা বাদ দিলেও ইবনে হিশাম এবং ইবনে ইসহাকের দুটি বিখ্যাত সিরাহ গ্রন্থেও এটি পাওয়া যায়নি। শুধু পরবর্তীকালের কয়েকটি উৎস থেকেই পাওয়া যায় ।

 

স্কলারদের যুক্তি-তর্ক | স্যাটানিক ভার্সেস-এর ঘটনা | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

৫) আয়াতগুলোর প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, সুরা নাজমের ১৯-২০ আয়াতের অবমাননাকর প্রশ্নের পর নিন্দাসূচক কিছু বলা হবে। এমনকি ইংরেজিতেও আমরা কাউকে সম্মান করে কিছু বলার সময়ও ওই রকম ভাষায় (স্যাটানিক ভার্সেসের টেক্সট) কথা বলি না। তার পরের আয়াত দুটি (২১-২২) আবার নিন্দাসূচক! যদি স্যাটানিক ভার্সেস সন্নিবেশিত করা হয়, তাহলে এই কাহিনিটি অতটা অর্থবোধক হয় না। প্রথমে নিন্দা, তারপর প্রশংসা, আবার নিন্দা—ভাষাতাত্ত্বিক ও প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে এটা একদমই বেমানান ।

৬) মিশরের মুফতি মুহাম্মাদ আবদুহ (মৃ. ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন, ভাষাতাত্ত্বিকভাবে কাহিনিটি কোনো অর্থ তৈরি করে না। কারণ স্যাটানিক ভার্সেসে ব্যবহৃত ‘ঘারানিক’ শব্দটি প্রাক-ইসলামিক কবিতায় প্রতিমাকে বোঝাতে কখনো ব্যবহৃত হয়নি। শুধু এই কাহিনিটিতেই শব্দটি পাওয়া যায়। শয়তান যদি সত্যিই। মুশরিকদের বোকা বানাতে চাইত, তাহলে এমন শব্দ বেছে নিত না, যা তাদের কাছে অপরিচিত।

৭) মুশরিকরা কেন সেজদা করেছিল তা সহিহ বুখারিতে বিস্তারিত ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে বর্ণিত আছে। আমরা যদি শুধু কোরানের শক্তি বিবেচনায় নিই তাহলেই এর যথাযথ ব্যাখ্যা পেয়ে যাব। ইবনে আব্বাস (রা) বলেছেন, নবিজির (সা) আবেগময় কন্ঠে সুরাটি এতই শক্তিশালী ছিল যে শেষ অংশে এসে ওয়ালিদ ইববুল মুগিরা ও উমাইয়া ইবনে খালাফ ছাড়া উপস্থিত মুসলিম, মুশরিক, জিন সবাই আবেগের আতিশয্যে সেজদায় নত হয়।

এই কাহিনি কোথা থেকে এসেছে তা আধুনিক গবেষকদের জন্য একটি ভাবনার বিষয়। যে কোনো রূপকথারও তো ভিত্তি থাকে। একজন আধুনিক ইতিহাসবিদের মতে, কুরাইশরা সেজদা করার পর এতই বিব্রত বোধ করছিল যে, নবিজি (সা) তাদের প্রতিমাগুলোর প্রশংসা করতে রাজি হয়েছিলেন বলে তারা মুখরক্ষা করার মতো একটা কারণ দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা এই ব্যাখ্যা যাচাই করার কোনো ক্লাসিক্যাল যুক্তি খুঁজে পাই না। সত্য যে কোনো সাহাবি কাহিনিটি বর্ণনা না করলেও তাবেয়িনদের থেকে এটি বর্ণিত । যা-ই হোক, ওই দুটি আয়াত কোরানে নেই। আল্লাহ বলেছেন, তিনি তাঁর আয়াতগুলো স্পষ্ট করেছেন।

আরো পড়ুনঃ

Leave a Comment