হিজরতের রাত | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

হিজরতের রাত | মদিনায় হিজরত, সেই বিশেষ রাতে কী ঘটেছিল তা সম্পর্কে আমরা মুসনাদ ইমাম আহমদের বর্ণিত হাদিস থেকে অনেকটা জানতে পারি। ইবনে আব্বাস বলেছেন, আল্লাহ হিজরতের রাত সম্পর্কে কোরানের আয়াত নাজিল করেছেন: স্মরণ করো, কাফেররা তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল তোমাকে বন্দি, হত্যা বা নির্বাসিত করার জন্য। তারা ষড়যন্ত্র করে আর আল্লাহ পরিকল্পনা করেন। আর পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ।” [সুরা আনফাল, ৮:৩০]

ওদিকে কুরাইশরা সেই রাতেই দারুল নাদওয়াতে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হয়। সেখানে বনু হাশিম ছাড়া সব গোত্রের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিল। সম্ভাব্য ‘স্বার্থের দ্বন্দ্ব’ পরিহার করাই ছিল বনু হাশিমকে বাদ রাখার মূল কারণ। এমনকি তারা আবু লাহাবকেও ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানায়নি। কারণ তারা বনু হাশিমের একজন স্বজাতির প্রাণনাশের পরিকল্পনা করার জন্য সেখানে মিলিত হয়েছিল। তারা ধরে নিয়েছিল, আবু লাহাবের পক্ষে জাহেলি রীতিনীতির বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের গোত্রের কাউকে হত্যা করার সিদ্ধান্তে সমর্থন করা সম্ভব হবে না। তাই বৈঠকের আয়োজকরা কায়দা করেই আবু লাহাবকে বাদ রেখেছিল।

এর মানে এ নয় যে সে (আবু লাহাব) নবিজিকে (সা) ভালোবাসত। এটা ছিল সম্পূর্ণই তার বংশমর্যাদা ও জাহেলি আচার-আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবু লাহাব যদি তার ভাতিজা মুহাম্মদকে (সা) জেনেশুনে মরতে দিত, তবে তা হতো তার জন্য চিরকালের জন্য একটা লজ্জার বিষয়। তারা মুতিম ইবনে আদিকেও বৈঠকে যোগদানকারীদের তালিকা থেকে বাদ রেখেছিল। মুতিম যেহেতু নবিজিকে (সা) নিরাপত্তা দিয়ে আসছিলেন, তাই তারা তাঁকে আমন্ত্রণ জানায়নি।

 

হিজরতের রাত | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

হিজরতের রাত | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

বৈঠকে সমবেতরা বলাবলি করছিল, “মুসলিমরা একের পর এক দেশত্যাগ করছে। আমাদের ভয় হচ্ছে, আমরা যদি এই লোকটিকে (মুহাম্মদ) চলে যেতে দিই, তাহলে তা মক্কার জন্য এক বড় রাজনৈতিক হুমকি হয়ে উঠবে। লক্ষ করুন, হিতারতের ঠিক আগের রাতেই এই সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তারা যেমন পরিকল্পনা/চক্রান্ত করেছিল, আল্লাহও তেমনি পরিকল্পনা করেছিলেন। [সুরা আনফাল, ৮:৩০) একটি বর্ণনায় আছে, গোপন বৈঠক শুরু হওয়ার পর এক বৃদ্ধ ব্যক্তি ঘরের দরজায় এসে কড়া নেড়ে বলল, “আমি নাজদ থেকে এসেছি।

আমি সেখানকার একজন নেতা। আমার কাছে খবর পৌঁছেছে যে, আপনারা এখানে বৈঠক করছেন। আমাকে ভেতরে এসে আপনাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার অনুমতি দিন। আপনারা যা করার পরিকল্পনা করছেন, তা সম্পর্কে আমি বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে আপনাদের উপকার করতে পারি।” তবে এই বর্ণনার ভিত্তিটি দুর্বল। ইবনে আব্বাসের মত অনুসারে, ওই বৃদ্ধ ব্যক্তিটি ছিল শয়তান / ইবলিস।

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

ইবলিস ঘরে ঢুকে বৈঠকে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে কথোপকথনে জড়িয়ে পড়ে।

প্রথম ব্যক্তি: আসুন আমরা তাকে একটি বাড়িতে বন্দি করে রাখি। ইবলিস: আপনারা যদি এটা করেন, তবুও সেই বার্তা তার অনুসারীদের কাছে পৌঁছবে।

দ্বিতীয় ব্যক্তি: তাহলে আমরা তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেই।

ইবলিস: তাকে নির্বাসনে পাঠানোর মানে হলো তাকে তার অনুসারীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। এতে তারা আরও শক্তিশালী হবে। (আলোচনার এ পর্যায়ে আবু জেহেল কথা বলতে শুরু করে।)

আবু জেহেল: তোমরা এখনও কেউ আসল কথাটি বলছ না। সবাই মনে মনে ভাবছ, কিন্তু সাহস করে মুখ ফুটে বলছ না। চলো, আমরা তাকে হত্যা করি ।

নিজেদের বংশের কাউকে হত্যা করা ছিল জাহেলি আরবদের আইন ও আচার-আচরণের পরিপন্থি। এরকম ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি। এটা হলে তা হবে তাদের জন্য চরম অপমানের বিষয়; এ জন্য সবাই চিরকাল তাদের সমালোচনা করবে। এসব বিবেচনায় নিয়ে আবু জেহেল ভয়াবহ ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা আঁটল। সে বলল, “আমরা এই কাজ এমনভাবে করব যাতে এক গোত্র অন্য গোত্রের ওপর ক্ষুব্ধ না হতে পারে।

প্রত্যেক গোত্র থেকে একজন করে। প্রতিনিধি পাঠাতে হবে যাতে করে তার (মুহাম্মদের) রক্ত প্রত্যেকের তরবারিতে লেগে থাকে। কে তাকে হত্যা করেছে তা কেউ জানবে না। এভাবে একক কোনো গোত্রকে কেউ দোষারোপ করতে পারবে না। বনু হাশিমও আমাদের সব গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসবে না, বরং তারা ‘ব্লাড মানি’ গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।” লক্ষ করুন, বনু হাশিমকে এখানে যুদ্ধ করতে হবে শুধুমাত্র গোত্রপ্রীতির কারণে আর বংশমর্যাদা রক্ষার উদ্দেশ্যে।

 

হিজরতের রাত | মদিনায় হিজরত | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

আবু জেহেলের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইবলিস বলল, “এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত!” ঠিক তার পরপরই সেখানে উপস্থিত সব উপজাতির একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি দলকে নবি করিমের (সা) বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। একই সময়ে ফেরেশতা জিব্রাইল (আ) নবিজির (সা) কাছে গিয়ে তাঁকে বললেন, “আপনাকে এখনই হিজরত করতে হবে।”

ওই সন্ধ্যায়ই নবিজি (সা) আবু বকরের (আ) বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন এবং সেই রাতেই তাঁরা মক্কা ত্যাগ করেন। নবিজি (সা) বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময়ের একটি ঘটনা শুধু ইবনে ইসহাকে বর্ণিত আছে। কুরাইশরা যখন নবিজির (সা) ঘরটি ঘিরে ফেলে, তখন তিনি সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যান। সে সময়

তিনি কুরাইশদের ওপর ধুলো নিক্ষেপ করেন। কুরাইশরা কিছু দেখতে পায়নি, নবিজির (রা) বেরিয়ে যাওয়া টের পায়নি। তিনি সেই সময় খাদিজার (রা) বাড়িতে থাকতেন। আলি (রা), যিনি খুব অল্প বয়স থেকেই নবিজির (সা) সাথে তাঁর বাসায় থাকতেন, ইতিমধ্যে পরিপূর্ণ যুবকে পরিণত হয়েছেন। তাঁকে (আলি) বলা হয়েছিল নবিজির (সা) বিছানার পেছনে থাকতে, যাতে কুরাইশরা সেদিকে তাকালে একটা অবয়ব দেখয়ে পায়। ইবনে ইসহাক কোনো ইসনাদ ছাড়াই এই কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন।

আরও পড়ূনঃ

Leave a Comment