মিরাজ: ৫০ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

আমরা শুধু যে বিষয়টি জানি তা হলো, আল্লাহ তায়ালা শুরুতে নবিজিকে (সা) প্রতিদিন ৫০ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। নবিজি (সা) ওই নির্দেশ পেয়ে ফিরে আসার পথে মুসার (আ) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন: মুসা নবিজিকে (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে গিয়ে আরও কম বার নামাজের অনুমতি চাইতে বলেন। নবিজি (সা) মুসার (আ) কাছে পৌঁছানোর আগে নিশ্চয়ই ইব্রাহিমকে (আ) অতিক্রম করেছিলেন। এ বিষয়ে ইব্রাহিম (আ) কিছু বলেননি। না বলার কারণগুলো হতে পারে এরকম:

 

মিরাজ: ৫০ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

মিরাজ: ৫০ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 ১) ইব্রাহিম (আ) নবিগণের মধ্যে উচ্চতম স্তরের। অনুমান করা যায়, আল্লাহর আদেশ সম্পর্কে প্রশ্ন করা তাঁর স্বভাবের মধ্যে নেই। মুসা (আ) সেই স্তবের না হওয়ায় এ বিষয়ে দরকষাকষির সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন।

২) ইব্রাহিমের (আ) বড় আকারের উম্মাহ ছিল না। এ বিষয়ে নবিদের মধ্যে মুসা (আ) তখন পর্যন্ত ছিলেন সবচেয়ে অভিজ্ঞ। তখন মুহাম্মদের (সা) নবুয়তের অভিজ্ঞতা ছিল মাত্র ১১-১২ বছরের। অন্যদিকে মুসার (আ) বনি ইসরায়েলের সঙ্গে কমপক্ষে ৮০-৯০ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল।

৩) মুসা (আ) ধারণা করেছিলেন, আল্লাহর সঙ্গে মুহাম্মদের (সা) সাক্ষাতের সময় কিছু একটা ঘটতে চলেছে। কীভাবে ধারণা করেছিলেন? কারণ, সংক্ষিপ্ত হলেও আল্লাহর সঙ্গে তাঁরও সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। মুসাই (আ) ছিলেন। একমাত্র নবি যিনি পৃথিবীতে আল্লাহ আজ্জা ওয়াজালের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন। সুতরাং মুসাকে (আ) যেমন দশটি আদেশ” প্রদান করা হয়েছিল, তেমনি তিনি জানতেন যে, তাঁর উত্তরসূরি নবি মুহাম্মদকেও (সা) এই সাক্ষাতের সময় কিছু দেওয়া হবে।

মুসা (আ) নবিজিকে (সা) জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার প্রতিপালক তোমার উম্মতের জন্য তোমাকে কী বলেছেন?” নবিজি (সা) জবাবে বললেন, “তিনি বলেছেন, আমি যেন আমার উম্মতকে দিনে ৫০ ওয়াক্ত (বার) নামাজ পড়তে বলি।” এ কথা শুনে মুসা (আ) বললেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাও, তাঁকে এই সংখ্যা কমিয়ে দিতে বলো। বনি ইসরাইলের সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি, তোমার উম্মত এই আদেশ পালন করতে সক্ষম হবে না।”

 

islamiagoln.com google news
আমাদের গুগল নিউজে ফলো করুন

 

মুসনাদ ইমাম আহমাদে বর্ণিত আছে (যদিও এই হাদিসটি অতটা প্রচলিত নয়), নবিজি (সা) তখন জিব্রাইলের (আ) দিকে তাকালে তিনি মুসার (সা) পরামর্শের প্রতি মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করেন। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুসার (আ) মতো একজন নবির পরামর্শ সত্ত্বেও নবিজি (সা) দ্বিতীয় একটি মত গ্রহণ করেন। সুতরাং একজন সম্ভ্রান্ত নবির পরামর্শের প্রতি সর্বোত্তম ফেরেশতার সমর্থন পেয়ে নবিজি (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন।

এর পরের পর্যায়ের বিভিন্ন বর্ণনার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নবিজি (সা) কমপক্ষে পাঁচবার ওপরে আল্লাহর কাছে ও নিচে মুসার (আ) কাছে ফিরে আসেন। প্রতিবারই মুসা (আ) তাকে একই কথা বলেন, “তুমি তোমার প্রতিপালকের কাছে ফিরে যাও এবং তাঁকে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা আরও কমানোর জন্য অনুরোধ করো। কারণ আমি বনি ইসরাইলকে দিয়ে চেষ্টা করেছি, তারা তা করতে সক্ষম হয়নি। তোমার উম্মতও তা করতে সক্ষম হবে না।” কারও মতে, নবিজির (সা) আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ায় প্রতিবারে ৫ ওয়াক করে, আবার কারও মতে প্রতিবারে ১০ ওয়াক্ত করে নামাজের সংখ্যা কমানো হয়েছিল।

অবশেষে যখন নবিজি (সা) দৈনিক মাত্র ৫ ওয়াক্ত নামাজের বিধান নিয়ে আল্লাহর দরবার থেকে ফিরে এলেন, তখন মুসা (আ) তাঁকে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা আরও কমানোর জন্য আবার যেতে বললেন। এবার নবিজি (সা) বললেন, আমি অনেকবার গিয়েছি, আবার যেতে সত্যিই বিব্রত বোধ করছি। তবে আমি এখন সন্তুষ্ট ও খুশি।” নবিজি (সা) এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে একটি কন্ঠস্বর শোনা গেল, “আমার ফরজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে এবং আমি আমার বান্দাদের জন্য (ইবাদতের) বিষয়টি সহজ করে দিয়েছি। পাঁচবার হলেও বান্দাকে পঞ্চাশবারের জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে।”

এ থেকে বোঝা যায়, দৈনিক নামাজের সংখ্যা যে পাঁচ হবে তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আগে থেকেই নির্ধারণ করে রেখেছিলেন। তিনি আগেই জানতেন, নবিজি (সা) তাঁর কাছে নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ নিয়ে বারবার ফিরে আসবেন। সুতরাং নবিজি (সা) কখন থামবেন সে ‘ইলহাম’ আল্লাহ তায়ালা তাঁকে দিয়েছিলেন (অর্থাৎ তাঁর মনে সঞ্চারিত করেছিলেন)। এ কারণেই নামাজের ওয়াক্তের সংখ্যা পাঁচে নামিয়ে আনার পর নবিজি (সা) আর যেতে চাননি ।

 

মিরাজ: ৫০ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ | রাতের ভ্রমণ এবং ঊর্ধ্বলোকে আরোহণ-2 | মহানবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ ) জীবন

 

এই ঘটনা থেকে আমরা কয়েকটি বিষয়ে সম্যক ধারণা পেতে পারি:

১) এই ঘটনা থেকে আমরা নামাজের মর্যাদা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাই। প্রকৃতপক্ষে, আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে নবিজির (সা) এই ব্যক্তিগত সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্যই ছিল মুসলিমদের জন্য নামাজ প্রতিষ্ঠা করা। অন্য সব নির্দেশ আল্লাহ জিব্রাইলের (আ) মাধ্যমে নবিজির (সা) কাছে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু নামাজ প্রতিষ্ঠার এই নির্দেশ এতই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বিশেষ বার্তা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রসুলকে (সা) ডেকে পাঠিয়েছিলেন।

মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য যদি একটি নেয়ামতের কথাও উল্লেখ করতে হয়, তাহলে নামাজের কথাই বলতে হবে। নামাজের গুরুত্ব পবিত্র কোরানের বেশ কয়েকটি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন: ২:৩), (২০:১৪), (১১:১১৪), (১৯:৩১ ইত্যাদি। এ প্রসঙ্গে বেশ কিছু হাদিসও রয়েছে। প্রত্যেক নবির জন্যও নামাজ নির্ধারিত ছিল; এ থেকে নামাজের গুরুত্ব সম্যকভাবে উপলব্ধি করা যায়।

২) আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথমে প্রতিদিন ৫০ বার নামাজ পড়ার বিধান এসেছিল বলে (যদিও পরে তা কমিয়ে পাঁচবার করা হয়েছে) নবিজি (সা) নিজের জন্য ৫০ রাকাত নামাজ পড়া নির্দিষ্ট করে নিয়েছিলেন। ৫০ রাকাতের হিসাবটা এরকম:

ফরজ                                  :   ১৭ রাকাত

সুনান আল-রাতিবা            :১২ রাকাত

তাহাজ্জুদের আগে             : ২ রাকাত

তাহাজ্জুদের জন্য              : ৮ রাকাত

বিতর                                  : ৩ রাকাত

সালাত আল-দুহা               : ৮ রাকাত

————————————————————-

মোট                                   : ৫০ রাকাত

: ৫০ রাকাত

নবি করিমের (সা) জন্য এই ৫০ রাকাত নামাজ ছিল তাঁর নিয়মিত রুটিনের অংশ, যদিও তা উম্মতের জন্য ওয়াজিব নয়। অবশ্য তাহিয়াতুল মসজিদ, ইস্তিখারাহ ইত্যাদি নামাজ এই হিসাবের অন্তর্ভূক্ত নয়।

আরও পড়ুনঃ

Leave a Comment